বাংলার বুকে বহু প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তির নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে ইতস্তত। সেগুলির মধ্যে বেশিরভাগই ধর্মীয় স্থাপত্য, যথা মন্দির, মসজিদ কিংবা গির্জা। মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত নিজামত ইমামবাড়া (Nizamat Imambara) তেমনই পুরাতন একটি স্থাপত্যকীর্তি, যেটি মূলত শিয়া মুসলমান সম্প্রদায়ের একটি ধর্মসভাগৃহ। এটি আবার নিজামত কিল্লা নামেও পরিচিত। মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত হাজারদুয়ারীর ঠিক বিপরীতে এবং ভাগিরথী নদী থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে এই বিশালাকার নিজামত ইমামবাড়ার অবস্থান। ইমামবাড়াটির সঙ্গে কিন্তু আবার নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার সরাসরি সংযোগ রয়েছে। যদিও বর্তমানে ইমামবাড়ার যে কাঠামোটি আমরা দেখতে পাই তা নবাবের তৈরি ইমামবাড়া নয়, এটি পরে নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে কিছু কারণ। এই নিজামত ইমামবাড়ার স্থাপত্যশৈলীটি প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করে দিতে সক্ষম পর্যটকদের। সম্পূর্ণ সাদা রঙের পৃথিবীর এই বৃহত্তম ইমামবাড়া বহুদিন ধরেই একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটনস্থল হিসেবে খুবই জনপ্রিয়।
নিজামত ইমামবাড়ার বর্তমান যে কাঠামোটি আমরা দেখি, একেবারে প্রথমে তা ছিল না। সেই নেপথ্যের ইতিহাসটির দিকে তাকালে দেখা যাবে সেখানে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার উপস্থিতি। পুরাতন নিজামত ইমামবাড়া ১৭৪০ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। সিরাজ ইট ও মর্টার ক্রয় করে এনে নিজে হাতেই এর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তবে পুরনো এই নিজামত ইমামবাড়াটি মূলত কাঠের তৈরি ছিল। যেখানে এই ইমামবাড়াটি নির্মিত হয়েছিল, সেখানে ৬ ফুট গভীর ভূমি খনন করা হয়। সেই গর্ত ভরিয়ে দেওয়া হয়েছিল মক্কা থেকে আনা পবিত্র মাটি দিয়ে। আসলে যেসব গরীব মুসলমানেরা আর্থিক কারণে হজ করতে যেতে পারেন না, তাঁরাও যাতে মক্কার পবিত্র মাটি স্পর্শ করে পূণ্য অর্জন করতে পারেন, সেই কারণেই এমন ব্যবস্থা করেছিলেন নবাব।
তবে ১৮৪২ সালে এই ইমামবাড়াটিতে আগুন লেগে যায়। যেহেতু এটির অধিকাংশটাই কাঠের তৈরি ছিল, সেই কারণে আগুন লাগা আরও সহজ হয়েছিল। এই আগুনে ইমামবাড়াটি আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। ১৮৪৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর পুনরায় ইমামবাড়াতে নিদারুণভাবে আগুন লাগার ফলে পুরো স্থাপত্যটাই প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। এই দ্বিতীয়বার আগুন লাগার দিনটিতে পাঁচ বছর বয়সী হাসান আলী মির্জার অন্নপ্রাশন উপলক্ষে নবাবদের আয়োজন করা একটি পার্টি ছিল, যাতে ইউরোপিয়ানরাও নিমন্ত্রিত ছিলেন। সেই আনন্দ অনুষ্ঠানে উদযাপনের জন্য আতশবাজি ফাটানোর বন্দোবস্তও করা হয়েছিল। উৎসব শেষে কিছু আতশবাজী নবাবেরা ফেলে গিয়েছিলেন, যেগুলিতে কোনভাবে আগুন লেগে গিয়েছিল। সেই বিধ্বংসী আগুনেই অবশিষ্ট নিজামত ইমামবাড়া ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পুরাতন মদিনা মসজিদটি ছাড়া আর কিছুই আগুনের করাল গ্রাস থেকে বাঁচেনি।
এই ঘটনার পর ১৮৪৭ সালে নবাব নাজিম মনসুর আলী খান হাজারদুয়ারী প্রাসাদের ঠিক বিপরীতে সাদেক আলী খানের তত্ত্বাবধানে এবং নির্দেশনায় ছয় লক্ষ টাকারও বেশি ব্যয় করে নতুন নিজামত ইমামবাড়াটি নির্মাণ করেছিলেন। রাজমিস্ত্রীদের নাকি মাত্র ১১ মাস সময় লেগেছিল এটি শেষ করতে, কারণ মজুরির সঙ্গে তাঁরা খাবারও পেত এবং দিনরাত কাজ করতে হয়েছিল তাঁদের।
নিজামত ইমামবাড়া স্থাপত্যের দিক দিয়েও বেশ আকর্ষণীয়। সাদেক আলী খানের তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশনায় হাজারদুয়ারীর ঠিক বিপরীতে অবস্থিত বর্তমান ইমামবাড়াটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৬৮০ ফুট লম্বা। উত্তরে পুরনো ভবনের জায়গাটি থেকে কিছু দূরে এই নতুন ইমামবাড়াটি তৈরি হয়েছিল। ভাগীরথী নদীর তীর এবং ইমামবাড়ার পশ্চিম দেওয়ালের ব্যবধান কয়েক ফুটের মাত্র। পুরনো ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইমামবাড়ার অক্ষত মদিনা মসজিদটি আগের মতোই রেখে দেওয়া হয়েছে এবং নবনির্মিত এই ইমামবাড়ায় একটি নতুন মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। পুরনো মদিনা মসজিদটি ইমামবাড়া ও হাজারদুয়ারীর মাঝে বিখ্যাত বাচ্চাওয়ালি টোপ এবং ক্লক টাওয়ারের কাছে অবস্থিত।
বর্তমান ইমামবাড়াটির অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যশৈলীর দিকে তাকালে দেখা যাবে এটি মোট তিনটি বড় বড় চতুর্ভুজে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় চতুর্ভুজটিতে রয়েছে নতুন মদিনা এবং মেম্বার দালান। পূর্বদিকের চতুর্ভুজে রয়েছে নওবত খানা এবং পশ্চিম চতুর্ভুজে রয়েছে একটি দ্বিতল মসজিদ। এই মসজিদটির দিকেই ভাগীরথী নদীর অবস্থান। মসজিদটি টাকশাল ঘাটের ওপরেই অবস্থিত। মসজিদের চারদিকে চারটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। কেন্দ্রীয় চতুর্ভূজে যে মেম্বার দালান রয়েছে তা হল আসলে সদস্যদের মিলিত হওয়ার হলঘর, যা মদিনার একেবারে পাশেই অবস্থিত। মদিনার ভিতরে চারশ বছরের পুরনো কোরাণ আজও রাখা রয়েছে সযত্নে। এখানকার হলঘর, বারান্দা এবং মেঝে সবই মার্বেল দ্বারা নির্মিত। হলটিতে মহিলাদের জন্যেও একটি প্রশস্ত কক্ষ রয়েছে। এই হলঘর ও মদিনা মসজিদের মধ্যবর্তী স্থানে আবার একটি রূপালি মাথাযুক্ত ফোয়ারা ছিল। পূর্বদিকে নওবত খানার যে বিশাল দ্বার রয়েছে সেটি ইমামিয়া রীতিতে নির্মিত। অন্যদিকে পশ্চিম চতুর্ভুজে যে দোতলা মসজিদটি রয়েছে সেটিতে দেখা যায় সুসজ্জিত স্তম্ভ এবং মার্বেলের প্রশস্ত মেঝে। এই মসজিদটিতে বেশ কিছু চমৎকার ঝাড়বাতিও লক্ষ করা যায়, যেগুলির অধিকাংশই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফ থেকে নবাবদের উপহার দেওয়া হয়েছিল।
নিজামত ইমামবাড়ায় ধুমধাম করে নানারকম উৎসব, অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মহরম পালিত হয়ে থাকে। মহরমের সময় প্রায় দশদিন ধরে নানারকম উৎসব চলে এখানে। একমাত্র এই সময়তেই টানা দশদিন সাধারণ মানুষের জন্য মসজিদের দ্বার খোলা থাকে। ফলত, অসংখ্য মানুষ এসময়ে ইমামবাড়ার ভিতরে ঘুরে দেখার জন্য এসে ভিড় জমান। মহরমের দিন চারেক আগে থেকে আবার ইমামবাড়ার মাঠে জাঁকজমকপূর্ণ মেলা বসে যায়। প্রচুর মানুষের ভিড়ে মেলা গমগম করে। উৎসবের দশদিন সকালে এবং সন্ধ্যায় মসজিদের ভিতরে নানারকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, মজলিশ বসে, ইমাম-সহ ধর্ম বিষয়ে পন্ডিত অনেক ব্যক্তির সমাগম হয় এবং তাঁরা ধর্ম নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠেন। উল্লেখ্য যে, অন্যান্য ধর্মের মানুষও কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করেন এই মজলিশে। মহরমের আগের দিন সারারাত ধরে ধর্মীয় আলোচনা চলে এবং মহরমের দিন সকালবেলা ইমামবাড়া থেকে বের হয় শোকমিছিল। মিছিলটি যায় কারবালা হিসেবে চিহ্নিত স্থানে৷ সেই স্থানে শোকজ্ঞাপনের পাশাপাশি নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানও হয়। মহরম উপলক্ষে নানা জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষ ছাড়াও, বিভিন্ন দেশের মানুষও সমবেত হন এই নিজামত ইমামবাড়ায়, যোগদান করেন উৎসবে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান