বিজ্ঞান

মহাকাশে মহাকাশচারীরা ভাসে কেন

আমরা সকলেই জানি মহাকাশে বা মহাকাশযানে মহাকাশচারী বা যেকোন বস্ত ভেসে বেড়ায়। অনেকে ভাবেন পৃথিবী থেকে যত দূরে যাওয়া হয় অভিকর্ষের টান তত কম হয় বলে ওজন শূন্য অবস্থার সৃষ্টি হয় তাই এরকম ভাসমান অবস্থার তৈরি হয়। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এখানে আমরা মহাকাশে মহাকাশচারীরা ভাসে কেন তার সঠিক কারণ জেনে নেব।

প্রথমে আমরা জেনে নেব, আমাদের প্রচলিত ধারণা যে পৃথিবী থেকে দূরে যাওয়ার ফলে ওজন শূন্য অবস্থা তৈরি হয় তার জন্য মহাকাশে ভাসমান অবস্থার সৃষ্টি হয় এই ধারণা ভুল কেন। একথা ঠিক যে পৃথিবী থেকে যতদূরে যাওয়া হবে তা কম হবে, এবং সেটা দূরত্বের বর্গের অনুপাতে কমবে। তাই যদি কোন বড় মহাজাগতিক বস্তু থেকে বহু বহু দূরে যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে হয়ত 'ওজন শূন্য' অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে কিন্তু বাস্তবে এই মহাবিশ্বে এরকম কোন জায়গা নেই যেখানে কোনো মহাজাগতিক বস্তুর আকর্ষণ বল নেই। এরপর আসি, 'স্পেস স্টেশন' যে উচ্চতায় অবস্থিত সেখানে ঠিক কতটা অভিকর্ষজ বল কাজ করে। আমাদের 'স্পেস স্টেশন' পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি ৩৫০ কিমি দূরে অবস্থিত। এই দূরত্বের জন্য অভিকর্ষজ বল মোটামুটি ১০-১১% কমতে পারে - অর্থাৎ আপনার ভর ভূপৃষ্ঠে ১০০ কেজি হলে যে টান অনুভব করবেন, স্পেস স্টেশনে তুলনায় ৯০ কেজি ওজন অনুভব করবেন। এই সংক্রান্ত গাণিতিক হিসেব লেখার শেষে দেওয়া হল, যারা পদার্থবিদ্যার ছাত্র তাদের সুবিধার জন্য।

তাহলে মহাকাশযানে মহাকাশচারীরা ভাসে কেন ? এটা বোঝার জন্যে প্রথমে গ্যালিলিওর সেই পতনশীল বস্তুর পরীক্ষার কথা ভাবতে বলব - যেখানে বস্তুর পতনের সাথে বস্তুর ভরের (ওজনের) কোন সম্পর্ক নেই। বায়ুশূন্য স্থানে একটি কয়েন ও পালক একই সাথে পড়বে। একে মুক্তপতন বা ফ্রী ফল (Free Fall) বলে। অর্থাৎ, মুক্ত পতনের সময় পতনশীল বস্তুগুলির ত্বরণ সমান হয় তাই একে অপরের প্রেক্ষিতে ওজনশূন্য বা ভাসমান মনে হবে। ইদানিং কোন কোন বিনোদন পার্কে 'ফ্রী ফল' এর ব্যাবস্থা আছে - এবং এই ফ্রী ফল রাইডের শুরুতে কিছু বস্তু ফেলে দিলে সেই ভাসমান অবস্থার কথা বোঝা যাবে। ঠিক একই ভাবে স্পেস স্টেশন, মহাকাশচারী, সেখানকার বিভিন্ন বস্ত সবই একই সাথে পৃথিবীকে ঘিরে পতনশীল (মুক্ত পতন) তাই সব কিছু ভাসমান মনে হয়। এই ওজনশূন্য অবস্থাকে মাইক্রো গ্র্যাভিটি কন্ডিশন বলে (জিরো গ্রাভিটি নয়)।

এখন প্রশ্ন  উঠবে, স্পেস স্টেশন, মহাকাশচারী, সেখানকার বিভিন্ন বস্তর যদি মুক্ত পতন হয় তাহলে সেসব পৃথিবীতে ফিরে আসে না কেন? হ্যাঁ, একথা ঠিক ঐ সব বস্তুই পৃথিবীর আকর্ষণে পৃথিবীর দিকে দ্রুত পড়ছে কিন্তু সেই একই সঙ্গে স্পেস স্টেশন প্রায় ২৮০০০ কিমি বেগে ছুটে চলেছে। এই গতিবেগটা এমন ভাবেই স্থির করা যে স্পেস স্টেশনের পতনের বক্রতা পৃথিবীর বক্রতার সাথে মিলে যায় ফলে স্পেস স্টেশন কখনোই মাটিতে নেমে আসে না। এই ব্যাপারটা এই ভাবে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। কামান দাগলে তার গোলা বক্রপথ অতিক্রম করে একটু দূরে গিয়ে পড়ে,  আরেকটু শক্তিশালী কামান হলে সেটি আরও একটু দূরে গিয়ে পড়ে। এই ভাবেই স্পেস স্টেশনের ক্ষেত্রে (বা বিভিন্ন উপগ্রহের ক্ষেত্রেও) তা যে কক্ষপথে স্থাপন করা হয় সেই মত গতিবেগ দেওয়া হয় যাতে তার নিচে পড়ার বক্রতা পৃথিবীর সমান হয় ও কোনদিন নেমে না আসে। ঠিক এভাবেই চাঁদ পৃথিবীকে ঘিরে ঘোরে ও কোনদিন পৃথিবীর বুকে এসে ধাক্কা মারে না, আবার পৃথিবীও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে একই কারণে।

মহাকাশে মহাকাশচারীরা ভাসে কেন সে তো বোঝা গেল, এবার সেই গাণিতিক হিসেবটা একটু দেখানো যাক যার ভিত্তিতে নিশ্চিত বলা যায় যে 'জিরো-গ্রাভিটি'  তৈরি হতে পারে না  বা আকর্ষণ বল কম হওয়ায় ওজনশূন্য হয় না।

 

আমরা জানি, দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বলের পরিমাপ - La te xi t 1

৭৫ কেজি ওজনের ব্যক্তির উপর  ভূপৃষ্ঠে অভিকর্ষজনিত আকর্ষণ বল -La te xi t 1 5

৭৫ কেজি ওজনের ব্যক্তির উপর  ৩৬০ কিমি দূরের কক্ষপথে অভিকর্ষজনিত আকর্ষণ বল -La te xi t 1 6

 

 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!