সববাংলায়

ইন্টারনেট স্পীড কম বেশি হয় কেন?

আমরা প্রায়ই দেখি — একই জায়গায় বসে, একই ডিভাইস ব্যবহার করেও কখনও ইন্টারনেট স্পীড বেশ ভাল, আবার কখনও একটি ওয়েবপেজ লোড হতেও অসহ্য রকম সময় নেয়। অনেকে ভাবেন, “নেটওয়ার্ক নেই” বা “ডেটা শেষ” হয়ে গেছে — কিন্তু বাস্তবে ইন্টারনেট স্পীড ওঠানামার পিছনে কাজ করে একাধিক কারণ যার কিছু প্রযুক্তিগত কারণ আর কিছু পরিবেশগত কারণ।

নেটওয়ার্ক ট্রাফিক ও ব্যবহারকারীর চাপ

প্রথমেই জেনে রাখতে হবে ইন্টারনেট একটি শেয়ারড রিসোর্স। অর্থাৎ আপনি যতই ঘরে ব্যক্তিগত ব্রডব্যান্ড কানেকশন নিন বা মোবাইল রিচার্জ করুন, একই নেটওয়ার্ক বা টাওয়ার বহু মানুষ এক সঙ্গে ব্যবহার করেন। অফিস টাইম, সন্ধ্যায় বা বড় কোনও লাইভ ইভেন্ট (যেমন কোনও জনপ্রিয় খেলা) চলাকালীন একসঙ্গে প্রচুর মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলে নেটওয়ার্কে চাপ পড়ে। এই ঘটনাকে নেটওয়ার্ক কনজেশন (Network Congestion) বলে। এর ফলে ডেটা আদান-প্রদান ধীর হয়ে যায়। গভীর রাতে বা ভোরে তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহারকারী থাকায় ইন্টারনেট তখন দ্রুত মনে হয়।

সার্ভার কোথায় আছে, তার উপর গতির প্রভাব

আপনি যে ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করছেন, তার সার্ভার যদি ভৌগোলিকভাবে আপনার থেকে অনেক দূরে থাকে, তাহলে ডেটা আসতে সময় লাগে বেশি। এই সময় পার্থক্যকে বলা হয় ল্যাটেন্সি (Latency)। এই কারণে বিদেশি ওয়েবসাইট অনেক সময় দেশীয় ওয়েবসাইটের তুলনায় ধীরে লোড হয়।

Wi-Fi সিগন্যাল ও বাধা

Wi-Fi ব্যবহার করলে ইন্টারনেটের গতি অনেকটাই নির্ভর করে সিগন্যালের শক্তির উপর। আমাদের আশপাশে ক্রমবর্ধমান ওয়ারলেস ডিভাইস ব্যবহৃত হওয়ায় Wi-Fi সিগন্যালের ইন্টারফারেন্স (interference) একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। এর ফলে Wi-Fi সংযোগের স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক পারফরম্যান্স খারাপ হতে পারে। তাই এই ইন্টারফারেন্স কী থেকে ঘটছে বোঝা জরুরি, যাতে সেগুলো কমিয়ে বেতার নেটওয়ার্কের কর্মক্ষমতা আরও উন্নত করা যায়। মোটা দেয়াল, ধাতব বস্তু, অন্য Wi-Fi নেটওয়ার্ক, ইলেকট্রনিক যন্ত্র, খোলা ইলেকট্রিক লাইন, মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি ইন্টারফারেন্সের মাধ্যমে Wi-Fi সিগন্যাল দুর্বল করে দিতে পারে।

মোবাইল ইন্টারনেটে টাওয়ার ও সিগন্যালের ভূমিকা

মোবাইল ডেটার ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের গতি নির্ভর করে কাছাকাছি থাকা সেল টাওয়ারের উপর। আপনি যদি চলন্ত অবস্থায় থাকেন বা দুর্বল সিগন্যালযুক্ত এলাকায় যান, তাহলে ফোন বারবার টাওয়ার বদলায়। এই সময় ডেটা স্পিড কমে যেতে পারে।

ডিভাইস ও সফটওয়্যারের প্রভাব

ইন্টারনেট ধীর হওয়ার দায় সবসময় নেটওয়ার্কের নয়। ফোন বা কম্পিউটারের পুরনো হার্ডওয়্যার, কম RAM, ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা অ্যাপ, পুরনো ব্রাউজার বা ভাইরাস থাকলেও ইন্টারনেট ধীর মনে হতে পারে। অনেক সময় ডিভাইস আসলে ডেটা প্রসেস করতে পারছে না, তাই ব্যবহারকারীর কাছে গতি কম মনে হয়।

আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক প্রভাব

বিশেষ করে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে মেঘলা আকাশ, ভারী বৃষ্টি, ঝড় বা বজ্রপাত সিগন্যাল দুর্বল করতে পারে। একে বলা হয় আবহাওয়াজনিত ক্ষয় (Weather Attenuation)। ফলে খারাপ আবহাওয়ায় ইন্টারনেট হঠাৎ ধীর হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ISP–এর নিয়ন্ত্রণ ও ডেটা থ্রোটলিং

অনেক সময় ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা (ISP) নির্দিষ্ট ডেটা ব্যবহারের পর ইচ্ছাকৃতভাবে গতি কমিয়ে দেয়, যাকে বলা হয় ডেটা থ্রটলিং (Data Throttling)। বিশেষ করে ভিডিও স্ট্রিমিং বা বড় ফাইল ডাউনলোডের সময় এটি বেশি লক্ষ করা যায়।

ইন্টারনেট কখনো দ্রুত, কখনো ধীর হওয়ার পেছনে একক কোনও কারণ নেই। নেটওয়ার্ক ট্রাফিক, সার্ভারের দূরত্ব, সিগন্যালের মান, ডিভাইসের সক্ষমতা, আবহাওয়া এবং ISP–এর বিধিব্যবস্থা — সব মিলিয়েই ইন্টারনেটের গতি নির্ধারিত হয়। তাই হঠাৎ ইন্টারনেট ধীর হলে সেটিকে শুধুই “নেটওয়ার্ক নেই” বলে ধরে নেওয়ার আগে এই বৈজ্ঞানিক কারণগুলো মাথায় রাখা জরুরি। আর এই কারণগুল জানা থাকলে হয়ত কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনার ইন্টারনেট স্পীড বাড়াতেও সক্ষম হতে পারেন।

আশা করি বোঝা গেল ইন্টারনেট স্পীড কম বেশি হয় কেন? বিজ্ঞানের এই ধরণের কার্য-কারণ সম্পর্ক বা “কেন” বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর জানতে এখানে দেখুন। আর আপনার মাথায় এরকম কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানান, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading