আমরা জানি, প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমরা অক্সিজেন গ্রহণ করি ও নিঃশ্বাসের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, জল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে গঠিত হলেও আমরা জলের তলায় শ্বাস নিতে পারি না কেন? অথবা এই প্রশ্নও আসতে পারে যে, মাছ পারলেও আমরা জলের তলায় শ্বাস নিতে পারি না কেন? এই প্রশ্ন দুটো অনেকটা একই রকম হলেও উত্তর কিন্তু আলাদা। এখানে আলাদাভাবে প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়া হল।
জল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে গঠিত হলেও আমরা জলের তলায় শ্বাস নিতে পারি না কেন?
প্রথমেই যে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার তা হল, প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমরা বায়ু গ্রহণ করি যার মধ্যে বায়ুমন্ডলে অবস্থিত সব ধরণের গ্যাসই মিশ্রিত থাকে, তবে আমাদের ফুসফুস এর থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। আর নিঃশ্বাসের সময় দেহের ভিতরের কার্বন ডাই অক্সাইড বের হয় তবে নিঃশ্বাস বায়ুতেও কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়া অন্যান্য গ্যাস থাকে। এবার আসি প্রথম প্রশ্নে, অর্থাৎ জল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে গঠিত হলেও আমরা জলের তলায় শ্বাস নিতে পারি না কেন? হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরণের যৌগিক পদার্থ জল তৈরি হয় যেখানে অক্সিজেনের আলাদা ভাবে কোন উপস্থিতি থাকে না। অন্যদিকে বায়ু একটি মিশ্র পদার্থ যেখানে অক্সিজেন মুক্ত ভাবে থাকে এবং তার কোন রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে না। ফলে বাতাসে উপস্থিত অক্সিজেন আমাদের শারীরবৃত্তীয় কাজে লাগে।
মাছ পারলেও আমরা জলের তলায় শ্বাস নিতে পারি না কেন?
এবার আসা যাক দ্বিতীয় প্রশ্নে, মাছ পারলেও আমরা জলের তলায় শ্বাস নিতে পারি না কেন? এক্ষেত্রে মাছ কিন্তু জলের মধ্যে দ্রবীভূত অক্সিজেন শ্বাসক্রিয়ার জন্য গ্রহণ করে, জলে দ্রবীভূত সেই অক্সিজেন মানুষ কেন ব্যবহার করতে পারে না সেই বিষয়ে আমরা আলোচনা করব। এটা মূলত আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রক্রিয়া ও শারীরবৃত্তীয় গঠনের সাথে সম্পর্কিত। মানুষের শ্বাস নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে তৈরি শ্বাসযন্ত্র বা ফুসফুস আছে, যা বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে কিন্তু জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন শোষণ করতে পারে না। নিচে এই বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হল:
ফুসফুসের গঠন এবং কার্যকারিতা
মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রধান অঙ্গ হল ফুসফুস। আমাদের ফুসফুস গ্যাসীয় অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং তা রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে সরবরাহ করে। কিন্তু জলের মধ্যে অক্সিজেন গ্যাসের মতো উপস্থিত থাকে না; বরং তা জলে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। আমাদের ফুসফুস এই দ্রবীভূত অক্সিজেন শোষণ করতে পারে না, কারণ এটি শুধুমাত্র বাতাসের অক্সিজেন গ্রহণের উপযোগী। বাতাসে জলের তুলনায় ২০ গুণ বেশি অক্সিজেন থাকে যা ফুসফুস সহজে গ্রহণ করতে পারে।
মাছ এবং মানুষের পার্থক্য
মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীদের শরীরে ফুলকা (gills) নামে বিশেষ অঙ্গ থাকে, যা জল থেকে অক্সিজেন শোষণ করতে সক্ষম। ফুলকার মাধ্যমে তারা দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দেয়। কিন্তু আমাদের ফুলকা নেই, তাই আমরা এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারি না।
এছাড়াও মাছ সাধারণত শীতল রক্তের প্রাণী তাই তাদের অক্সিজেন কম প্রয়োজন হয় ফলে জলের থেকে যে অল্প পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়া যায় তাই তাদের জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট। তিমি, ডলফিন ইত্যাদির মতো উষ্ণ রক্তের সামুদ্রিক প্রাণীরা ওই জন্য জলের উপরিতলে উঠে এসে বায়ুমন্ডল থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে যাতে বেশি পরিমাণে অক্সিজেন পেতে পারে।
জলের ঘনত্ব এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের বাধা
জল বাতাসের তুলনায় অনেক বেশি ঘন (প্রায় ৮০০ গুণ বেশি ঘন), যার ফলে এটি ফুসফুসে প্রবেশ করলে শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। যদি আমরা জলের নিচে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে আমাদের ফুসফুসে বাতাসের পরিবর্তে জল প্রবেশ করবে, যা আমাদের দম বন্ধ করে দিতে পারে এবং ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
ফুসফুসের জন্য বাতাসের প্রয়োজন
ফুসফুসে শ্বাস নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত বাতাসের প্রবাহ দরকার, যা শুধুমাত্র বায়ুমণ্ডলে পাওয়া যায়। যখন আমরা শ্বাস নিই, তখন বাতাস নাক বা মুখ দিয়ে প্রবেশ করে শ্বাসনালী (trachea) হয়ে ফুসফুসে পৌঁছায়। সেখানে অক্সিজেন রক্তে মিশে যায় এবং শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছায়। কিন্তু জলের মধ্যে এই পুরো প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়, কারণ বাতাসের পরিবর্তে জল আমাদের শ্বাসনালী ও ফুসফুসে প্রবেশ করে।
ডুবুরিরা কীভাবে শ্বাস নেয়?
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে ডুবুরিরা কীভাবে শ্বাস নেয়? ডুবুরিরা জলের নিচে শ্বাস নিতে পারে কারণ তারা অক্সিজেন ট্যাংক এবং বিশেষ ধরণের মাস্ক (scuba gear) ব্যবহার করে। এই অক্সিজেন ট্যাংক তাদের ফুসফুসে সরাসরি গ্যাসীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে, যা তারা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে।
সব শেষে, সংক্ষেপে বললে, শ্বাস প্রক্রিয়ার জন্য আমাদের মুক্ত অক্সিজেন প্রয়োজন, অক্সিজেনের কোন যৌগ যেমন জল কাজে লাগে না। আর আমরা জলের নিচে শ্বাস নিতে পারি না কারণ আমাদের ফুসফুস বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করার জন্য তৈরি, কিন্তু জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন শোষণ করতে পারে না। তাছাড়া, আমাদের ফুলকা নেই, যা জলজ প্রাণীদের জলের অক্সিজেন গ্রহণ করতে সাহায্য করে। তাই, আমরা কেবল তখনই জলের নিচে দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারি যখন আমাদের কাছে অক্সিজেন সরবরাহের কৃত্রিম ব্যবস্থা থাকে, যেমন অক্সিজেন ট্যাংক বা স্কুবা ডাইভিং সরঞ্জাম। এই প্রসঙ্গে, আমরা জলের তলায় কথা বললে ভাল বুঝতে পারি না কেন সেটাও এখানে ক্লিক করে জেনে নিতে পারেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান