বিজ্ঞান

সমুদ্র উপকূলে বালি থাকে কেন

সমুদ্র উপকূলে ঘুরতে যেতে সবাই ভালোবাসে। ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে দেওয়া, বালিতে ছোটাছুটি করা বা বালি নিয়ে খেলা করা….সবই আমাদের খুব প্রিয় কাজ। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, এতো বালি কোথা থেকে আসে? আশেপাশের জায়গায় যেখানে স্বাভাবিক মাটি, সেখানে সমুদ্রের ধারে বা উপকূলে এতো বালি কেন? আসুন জেনে নিই সমুদ্র উপকূলে বালি থাকে কেন ।

প্রথমে জেনে নেওয়া যাক, ‘বালি’ বা ‘sand’ শব্দটি কী অর্থে ব্যবহৃত হয়। বালি বলতে মরুভূমি বা উপকূলের বিশেষ প্রকারের মাটিকে বোঝায়, যাতে ভরের সাপেক্ষে ৮৫% মাটির কণা থাকে ও বাকিটা থাকে জৈব পদার্থ। ভূতত্ত্ব অনুযায়ী, একটি বালির দানার আকার ০.০৬২৫-২ মিলিমিটারের মধ্যে থাকে। নুড়ি (২ মিমি – ৭৫ মিমি) ও পলি (০.০০২ মিমি – ০.০৫ মিমি) -এর মধ্যবর্তী প্রকারের মাটিই হল বালি। বালির প্রধান উপাদান হল ‘সিলিকা’ বা ‘সিলিকন ডাইঅক্সাইড’ (SiO2)। এছাড়াও আর এক প্রকারের বালিতে ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3) থাকে। এই প্রকারের বালির উদাহরণ হল ‘অ্যারাগোনাইট’ (aragonite), যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়।

ভূমিক্ষয়ের প্রধান কারণ হল ‘আবহবিকার’ নামক ভৌগোলিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা নদীর জলে বাহিত হয়ে সমুদ্রে এসে পড়ে এবং সমুদ্র উপকূলে জমা হতে থাকে। যে প্রক্রিয়ায় আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান যেমন, উষ্ণতা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত প্রভৃতির সংস্পর্শে এসে ভূত্বকের শিলাস্তর ধীরে ধীরে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মূল শিলাস্তরের উপরেই পড়ে থাকে, তাকে আবহবিকার বা weathering বলে। নিম্নলিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করে আবহবিকার ঘটে —

• যান্ত্রিক আবহবিকার:- এই আবহবিকারের বিভিন্ন প্রকারগুলি হল-

১. তাপের কারণে:- শিলা তাপের সুপরিবাহী নয়। এই জন্য উন্মুক্ত স্থানে দিনে এবং রাতে শিলার ভিতরের ও বাইরের অংশে উষ্ণতার যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটে। এই তারতম্যের কারণে শিলাস্তরে ক্রমাগত সঙ্কোচন ও প্রসারণ চলতে থাকে। ফলে শিলার সন্ধিস্তরগুলি আলগা হয়ে যায় ও ধীরে ধীরে শিলা ভেঙে পড়ে।

২. জলের কারণে:- বৃষ্টির জলের আঘাতে কোমল শিলা ভেঙে যায়। এছাড়াও ছিদ্রযুক্ত রূপান্তরিত শিলা বা কোমল পাললিক শিলার অভ্যন্তরে জল প্রবেশ করলে শিলাস্তর আর্দ্র হয়ে ওঠে। আর্দ্রতা বৃদ্ধির জন্য কালক্রমে শিলাস্তর ভেঙে যায়। আবার নদীর জল যখন দ্রুতগতিতে শিলাস্তরের মধ্যে প্রবেশ করে, তখন জলপ্রবাহের মধ্যবর্তী বায়ুর চাপে শিলাস্তর ভেঙে যায়।

৩. বরফের কারণে:- শীতল জলবায়ু অঞ্চলে শিলাস্তরের মধ্যে গ্রীষ্মকালে বা দিনের বেলায় আটকে পড়া জল শীতকালে বা রাতের বেলায় বরফে পরিণত হয়। জল বরফে পরিণত হলে তার আয়তন ১০% বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শিলাস্তরে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয় ও ধীরে ধীরে শিলা ভেঙে পড়ে।

• রাসায়নিক আবহবিকার:– বিভিন্ন রাসায়নিকের কারণে যে আবহবিকারগুলি দেখা যায় সেগুলি হল-
১. অঙ্গারযোজন:- বৃষ্টির জল বায়ুমন্ডলের মধ্য দিয়ে ভূপৃষ্টে পতিত হওয়ার সময় কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) সঙ্গে মিলিত হয়ে কার্বনিক অ্যাসিড (H2CO3)-এ পরিণত হয়। এই কার্বনিক অ্যাসিড চুনাপাথরের উপর পতিত হয়ে যে বিক্রিয়া ঘটায় তাতে চুনাপাথরের মধ্যস্থিত ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3) ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেট Ca(HCO3) -এ পরিণত হয় এবং তা সহজেই দ্রবীভূত হয়ে অপসারিত হয়।

(১) H2O+CO2=H2OCO3
জল + কার্বন ডাই-অক্সাইড = কার্বনিক অ্যাসিড

(২) H2CO3+CaCO3=Ca(HCO3)2
কার্বনিক অ্যাসিড + চুনাপাথর = ক্যালসিয়াম বাই কার্বনেট

২ জারণ:- যেসব শিলায় লোহার পরিমাণ বেশি থাকে জারণের ফলে সেইসব শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় । জারণের ফলে মূল খনিজ ‘ফেরাস অক্সাইড’ ফেরিক অক্সাইড পরিণত হয়ে ‘লিমোনাইট’ -এর সৃষ্টি করে, যা সহজেই ভেঙে যায় । একই কারণে লোহার জিনিসে মরচে ধরলে তা সহজেই নষ্ট হয়ে যায়,

যথা—4FeO+3H2O+O2=2Fe2O33H2O

অর্থাৎ লোহা + জল + অক্সিজেন = লিমোনাইট

৩. জলযোজন:- শিলাস্তরের মধ্যে অবস্থিত কোনো খনিজ পদার্থের সঙ্গে জল যুক্ত হলে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে তার ফলে খনিজ পদার্থটির আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং রাসায়নিক ধর্মের পরিবর্তন হয়ে খনিজটি বিয়োজিত হয়। যেমন- উৎকৃষ্ট লৌহ আকরিক ‘হেমাটাইট’(2Fe2O3)পাথরের সঙ্গে জলযুক্ত হলে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, তার ফলে ‘লিমোনাইট’ (2Fe2O33H2O) নামে নিকৃষ্ট লোহার সৃষ্টি হয়, যা অতি সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়,

যথা— 2Fe2O3+3H2O=2Fe2O33H2O
অর্থাৎ হেমাটাইট + জল = লিমোনাইট

৪. সৈন্ধব লবণ, জিপসাম প্রভৃতি কয়েকটি খনিজ পদার্থ জলের সংস্পর্শে দ্রবীভূত হয়ে তার নিজস্ব আকার হারিয়ে ফেলে। এই বিশেষ প্রক্রিয়াকে দ্রবণ [Solution] বলে । দ্রবণের ক্ষেত্রে, যতবেশি পরিমাণ জল খনিজে প্রবিষ্ট হয়, খনিজ পদার্থটি তত তাড়াতাড়ি দ্রবীভূত হয়ে যায়, যথা—

১) সৈন্ধব লবণ + জল = সৈন্ধব লবণের দ্রবণ

২) জিপসাম+ জল=জিপসামের দ্রবণ

• জৈবিক আবহবিকার:– উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের ফলে শিলাস্তরে ভাঙনের সৃষ্টি হলে তাকে জৈবিক আবহবিকার বলে।

এই পদ্ধতিগুলি অনুসরণ করে ভূমি ক্ষয় হয়। ক্ষয়প্রাপ্ত কাদা, বালি, নুড়ি, পাথর প্রভৃতি বৃষ্টির জলে ধুয়ে নদীতে এসে পড়ে এবং নদীর জলধারার সঙ্গে প্রবাহিত হয়। নদী এসে সমুদ্রে মিশলে এগুলি সমুদ্রের ধারে ধারে জমা হয়। এই সাগরের পলির মধ্যে প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ থাকে বালি। এর কণাগুলির আকার ১/২ মিলিমিটার থেকে ২ মিলিমিটারের মধ্যে হয়। এই কণাগুল গভীর সমুদ্রে প্রবাহিত হওয়ার পক্ষে বেশি বড় হওয়া বালির কণাগুলি সমুদ্রের উপকূলেই জমা হতে থাকে। কিন্তু সমুদ্র সৈকতই বালির জন্য শেষ জায়গা নয়। বড় ঢেউগুলি এদের সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং ছোট ঢেউগুলি পুনরায় ফিরিয়ে আনে। তাই সৈকতকে বালুকাময় রাখার জন্য নিরন্তর বালির সরবরাহ একান্ত জরুরি।

কিন্তু এই নিয়মের ব্যতিক্রমও আছে। পৃথিবীর সব সৈকতে বালি থাকে না। কোথাও কোথাও নুড়ি আবার কোথাও বড় বড় পাথরের আধিক্যও দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, সমুদ্র সৈকতের মাটির আকার প্রধানত নির্ভর করে সৈকতের বয়স এবং সমুদ্র তরঙ্গের উচ্চতা বা শক্তির উপরে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, নুড়ি, পাথর বা মোটা বালিযুক্ত উপকূলগুলির বয়স অনেক কম, যেখানে সূক্ষ্ম বালি দ্বারা গঠিত সৈকতগুলি অনেক প্রাচীন।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন