বিজ্ঞান

সকল প্রাণীর ঘুম পায় কেন

সকল প্রাণীর ঘুম পায় কেন

আমরা আমাদের আয়ুর এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশ সময় কাল ঘুমিয়ে কাটাই। মানুষের মতো অন্য সকল প্রাণীই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমায়। ঘুম ছাড়া কোনো প্রাণীই বাঁচতে পারবে না। কারণ মানুষের মতো সকল প্রাণীদেহের নির্দিষ্ট কিছু জৈবিক কাজকর্মের জন্য ঘুমের প্রয়োজন রয়েছে। দেহের অবসন্নতা কাটাতে ঘুমের বিকল্প কিছু নেই। তবে এক এক প্রাণীর ঘুমের ধরন এক এক রকম। আসুন জেনে নেওয়া যাক, সকল প্রাণীর ঘুম পায় কেন?

১৯৫০ সালের পূর্বে আমাদের ধারণা ছিল ঘুম একটি নিষ্ক্রিয় দশা যেখানে আমাদের দেহ ও মন একেবারে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। কিন্তু পরবর্তীকালে গবেষণায় দেখা গেছে জীবনকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য নানা প্রয়োজনীয় কাজ এই ঘুমের সময়েই হয়ে থাকে। মানুষ সহ সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর, কয়েক প্রজাতির মাছ, পতঙ্গ, এমনকি নিম্নগোত্রীয় প্রাণী নিমাটোডের ঘুমের (অথবা নিদ্রা-সদৃশ অবস্থার) প্রয়োজন হয়। দেহ অভ্যন্তরস্থ ‘সার্কাডিয়ান ক্লক’ দ্বারাই ঘুম নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ক্লক অর্থাৎ ঘড়ির নিয়ন্ত্রণেই দিবাচর (Diurnal) প্রাণীরা রাতে এবং নিশাচর (Nockturnal) প্রাণীরা দিনে ঘুমায়। মানুষের ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই দেখেছি, রাতের ঘুম ভালো না হলে আমাদের কেমন যেন গা ম্যাজম্যাজ করে, মাথাটা ভার লাগে। আসলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা, নমনীয়তা এবং কোনো উদ্দীপনায় সাড়া দেবার ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের খুব প্রয়োজন। যদি আমাদের ঘুম কম হয় তাহলে আমরা সারাদিন ধরে কী কাজ করলাম তা ঠিক মতো মনে রাখতে পারি না।

ঘুম পায় কেন ও তার বিবর্তন সম্পর্কে জানার আগে আমাদের ঘুমের পদ্ধতিটা জেনে নেওয়া দরকার। আমাদের ঘুমের চক্রটি দুটি ভাগে বিভক্ত – রেম স্লিপ (REM Sleep) অর্থাৎ র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (Rapid Eye Movement Sleep) এবং নন-রেম (Non REM) অর্থাৎ নন র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ (Non Rapid Eye Movement Sleep)। নন-রেম ঘুমের আবার তিনটি দশা আছে। অর্থাৎ ঘুম আসে ধীরে ধীরে, নির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমে।
প্রথম দশা (N1): শোয়ার সময় থেকে ঘুম আসার ঠিক আগের সময়।
দ্বিতীয় দশা (N2): হালকা ঘুমের দশা। এই দশায় হৃদগতি ও শ্বাস গতি নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং দেহের তাপমাত্রা হ্রাস পায়।
তৃতীয় দশা (N3) : এই দশাটি হলো গভীর ঘুমের দশা।

রেম স্লিপে চোখের পাতা বন্ধ থাকলেও চোখের পাতার নিচে অক্ষিগোলক দ্রুত নড়াচড়া করতে থাকে। মস্তিষ্কের তরঙ্গের প্রকৃতি জাগরণের মতোই হয়, শ্বাস-গতি বৃদ্ধি পায়, দেহ সাময়িকভাবে শিথিল (Paralysed) হয়ে যায়। আমরা স্বপ্ন দেখি এই দশাতেই। নন-রেম স্লিপ ও রেম স্লিপ চক্রাকারে চলতে থাকে যার প্রতিটি চক্র গড়ে ৯০ মিনিট ধরে চলে। তবে একটি নির্দিষ্ট রাতে সর্বাধিক ৪-৫ বার এই চক্র চলতে পারে। ঘুমের দশাটি এইভাবে চলতে থাকে – N1—N2—N3—N2–REM।

যখন মানুষ গভীর ঘুম থেকে দ্বিতীয় বা প্রথম দশায় ফেরে তখন তাদের রেম স্লিপ হয় আর রাতের প্রথম দিকে N3 দশায় গভীর ঘুম হয়।

এখন যেকোনো প্রজাতির বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত হল ঘুম। দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সকল প্রাণীরই ঘুম পায় এবং এর মধ্যে নিম্নশ্রেণির প্রাণীদের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় অবস্থা বা নিদ্রা-সদৃশ অবস্থা দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চশ্রেণির প্রাণী অর্থাৎ স্তন্যপায়ী ও পাখিদের মধ্যে REM ঘুম দেখা যায়। তাই ঘুমের বিবর্তন (evolution) নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন REM ঘুম হয়ত পক্ষী ও স্তন্যপায়ী শ্রেণির কোনও সাধারণ পূর্বপুরুষ (common anncestor) থেকে এসেছে বা সুদূর অতীতেই আলাদা আলদা ভাবে পক্ষীশ্রেণি ও স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এই REM ঘুমের উদ্ভব হয়েছে। তবে বিবর্তনের পথে সরীসৃপ থেকে স্তন্যপায়ী ও পক্ষীর সৃষ্টি হলেও সরীসৃপদের মধ্যে REM ঘুম দেখা যায় না। গুহাবাসী মানুষের পূর্বপুরুষরা সরীসৃপদের মতো দিনে ঘুমাতো ও রাতে সক্রিয় থাকতো। শীতল-শোণিত প্রাণী সরীসৃপদের দিনের মধ্যে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় এই দুই ধরণের আচরণগত দশা দেখা যায়। নিষ্ক্রিয় দশায় এরা ঘুমায় ও দেহকে গরম করে আর সক্রিয় দশায় এরা শিকার করে, শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করে, বংশবিস্তার করে। তাই বলা যায় নন-রেম স্লিপ সরীসৃপদের নিষ্ক্রিয় দশা ও রেম স্লিপটি সরীসৃপদের সক্রিয় দশা থেকে পরবর্তীকালে উন্নত জীবজগতের মধ্যে এসেছে। গুহামানব থেকে আধুনিক মানবের সৃষ্টি। গুহামানবেরা সরীসৃপদের মতো আচরণ করত। পরবর্তীকালে যখন মানুষের বিবর্তন হয় সেই সময় তাদের মস্তিষ্কের কিছুটা অংশ সরীসৃপদের মতো থেকে যায়। রেম ও নন রেম স্লিপ উভয়ই তাই মানুষের মধ্যে দেখা যায়।

পড়াশোনা, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রথমে রেম স্লিপ দশাই দায়ী ভাবা হতো। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, নন-রেম স্লিপই এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়াও দেহের বিশ্রাম, বলবৃদ্ধি এবং পুনরুদ্ধার (Restorative) দশার কারণ। বিশেষত নন-রেম ঘুমের সময় মস্তিস্ক সবচেয়ে কম শক্তি ব্যয় করে। এই সময় কোশের এনার্জি কারেন্সি হিসাবে পরিচিত এডিনোসিন ট্রাই ফসফেটের (ATP) ব্যবহার খুব কম করে মস্তিষ্ক এবং শক্তি সাশ্রয় করে। এই উদ্বৃত্ত শক্তি দেহের অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়।

আমাদের মানবদেহের ঘুম নিয়ন্ত্রণের এক অদ্ভুত নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে, প্রকৃতির সঙ্গে যার নিবিড় যোগ রয়েছে। প্রথমত, সার্কাডিয়ান রিদ্‌মের (Circadian Rthym) কথা বলতে হয় যা দেহের স্বাভাবিক আভ্যন্তরীণ পদ্ধতি। প্রতি ২৪ ঘন্টায় এই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম পাওয়া বা, ঘুম থেকে উঠে পড়া এই চক্রের মাধ্যমেই হয়। আলোক ও অন্ধকার এই দুটি প্রধান শর্ত সার্কাডিয়ান রিদ্‌মকে প্রভাবিত করে। মস্তিষ্কে অবস্থিত বায়োলজিক্যাল ক্লক (Biological Clock) বা জৈবিক ঘড়ির মাধ্যমে সার্কাডিয়ান রিদ্‌ম নিয়ন্ত্রিত হয়। বায়োলজিক্যাল ক্লকের প্রধান কাজ হল, আলোক-সংকেতে সাড়া দেওয়া। রাতের অন্ধকারে মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, আমরা তখন ঘুমাই। আবার দিনের আলোয় মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, আমরা তখন ঘুম থেকে উঠে পড়ি। পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটোনিন নিঃসৃত হয়। সম্পূর্ণ অন্ধ মানুষরা আলোক সংকেত বুঝতে পারে না। তাই তাদের ঘুমানোর সময় বেশ অসুবিধা হয়।

দ্বিতীয় নিয়ন্ত্রক বলা যায় স্লিপ ড্রাইভকে (Sleep Drive)। আমাদের দেহে যেমন খাদ্যের চাহিদা আছে, তেমনি আবার ঘুমেরও চাহিদা আছে। সারাদিন ধরে আমাদের দেহে ঘুমের ইচ্ছা বা চাহিদা তৈরি হয়। যখন এই চাহিদা একটি বিশেষ মাত্রায় পৌঁছায়, তখন আমরা ঘুমাতে বাধ্য হই। আমাদের যখন খিদে পায়, খাওয়ার জন্য আমাদের দেহ বাধ্য করে না। কিন্তু আমরা যখন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি, আমাদের ঘুমাতেই হয়। শরীর যখন খুব ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে যায়, দিনের অন্য সময়ও আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। তবে এই অসময়ের ঘুম রাতের ঘুমের মতো অতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দিনের বেলায় ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমালে রাতের সাধারণ স্লিপ ড্রাইভটি ব্যাহত হয়, অর্থাৎ রাতের ঘুমের সময়সীমা কমে যায়।

গবেষকরা মনে করেন ঘুমের সময়ই আমাদের মস্তিষ্কের কোষ থেকে বর্জ্য পদার্থের অপসারণ বেশি ঘটে। জাগ্রত অবস্থায় এই প্রক্রিয়া খুব মন্থর গতিতে চলে। আমরা জানি দুটি স্নায়ু কোষের সংযোগস্থলকে বলে সাইন্যাপ্স। একটি স্নায়ু কোষ থেকে যখন আর একটি স্নায়ু কোষে কোনো সংকেত যায় তখন সাইন্যাপ্সের মধ্যে থাকা নিউরো-ট্রান্সমিটারের একটি প্রবাহ চলতে থাকে। একটি কোষ থেকে আর একটি কোষে সংকেত পৌঁছে যায়। একসময় দেখা যায় সাইন্যাপ্সে এত বেশি নিউরো-ট্রান্সমিটার জমে গেছে যে, সাইন্যাপ্সের কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। ঘুমের সময় গ্লিম্‌ফ্যাটিক সিস্টেমের (Glymphatic System) মাধ্যমে এই অতিরিক্ত নিউরো-ট্রান্সমিটারগুলির অপসারণ হয়।

ঘুমের সময় দেহের্ বিভিন্ন তন্ত্রগুলি উপচিতি দশায় (Anabolic Stage) থাকে। অনাক্রম্যতা তন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, কঙ্কাল ও পেশিতন্ত্রের মেরামতি ও পুনরুদ্ধার এই উপচিতি দশাতেই হয়। স্মৃতি, চিন্তা, বুদ্ধি, উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ এবং ইমিউন ও এন্ডোক্রিন সিস্টেমের কার্যকারিতার জন্য এই দশার খুব প্রয়োজন।

শুধু মস্তিষ্ক নয়, শরীরের অন্যান্য অংশের জন্যও ঘুম খুব প্রয়োজনীয়। ঘুম যখন পর্যাপ্ত পরিমাণে হয় না, তখন তা শরীরে নানা হানিকারক প্রভাব নিয়ে আসে। মানসিক অবসাদ, খিঁচুনি (Seizures), উচ্চ রক্তচাপ, মাইগ্রেনের (Migraine) মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, দেহে রোগ সংক্রমণের হার বেড়ে যায়, ঘন ঘন শরীর খারাপ হতে থাকে। বিপাকের ক্ষেত্রেও ঘুমের ভূমিকা আছে। এক রাতও ঘুম কম হলে সুস্থ মানুষের হজমের সমস্যা হয়।

একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক মোটামুটি ৭-৮ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। শিশুদের প্রায় ১৬ ঘন্টা ও কিশোর -কিশোরীদের ৯ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা প্রায় ১৪-১৮ ঘণ্টা ঘুমায়। এই সময় তাদের মস্তিষ্কের আকার বিকশিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষের মস্তিষ্কের আকারের প্রায় ৯০% হয়ে যায়। মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বুদ্ধির বিকাশের জন্য এই প্রলম্বিত ঘুমের পর্যায়টির খুব প্রয়োজন।

অর্থাৎ সকল প্রাণী সহ মানবদেহের বেঁচে থাকা ও নানান শারীরবৃত্তীয় কাজের জন্য সকল প্রাণীর ঘুম পায়।

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঘুম পাতলা হয়ে যায় এবং ঘুমের সময়সীমাও কমে যেতে থাকে। যদিও ঘুমের চাহিদা পূর্বের মতোই থাকে। এর ফলে শরীরে ঘুমের একটা ঘাটতি (Sleep Debt) তৈরি হয়। দেখা গেছে, দূরপাল্লার ট্রেনের ড্রাইভাররা একনাগাড়ে ট্রেন চালাতে চালাতে পরিশ্রান্ত হয়ে অনেক সময় ঘুমিয়ে পড়েন ফলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভবনা বাড়ে। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে বহু সড়ক ও রেল দুর্ঘটনার কারণ চালকের পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব।

পানীয় জল, খাদ্য, অক্সিজেনের মতোই প্রাণীদের জীবনে ঘুম খুবই প্রয়োজনীয়। এইজন্যই কোনো প্রাণীকে যদি জোর করে বেশ কিছুদিন জাগিয়ে রাখা হয় তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। শরীরে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্য প্রতি বছর ১৯ মার্চ ওয়ার্ল্ড স্লিপ সোসাইটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘ওয়ার্ল্ড স্লিপ ডে’ পালন করা হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়