জন মুনিষ। জনমজুরদের যাপনের জ্যান্ত আখ্যান! আনসারদার লেখার মধ্যে দিয়ে ঢুকে পড়া তাঁদের দৈনন্দিনতার হেঁশেলে; ক্রমশ জড়িয়ে পড়ি মুনিষ-জীবনের দুঃখ-সুখ, আশা-আকাঙ্খা, যন্ত্রনা-বঞ্চনায়।
জলের ভারে জলঙ্গীর নাভিশ্বাস উঠছে, গদাখালির বাঁধ কোনও মতে ঠেকিয়ে রেখেছে সেই বিপুল জলোচ্ছ্বাস। মঞ্জিলপুরের মানুষের প্রতিটা আতঙ্কিত মুহূর্তের আশ্রয় আদাপির। মাঠ ভরা আউশ ধানে। বাঁধ ভাঙ্গলে ধানে-বানে একাকার হয়ে যাবে। ভরসা তাই গদাখালির দুপাশে টাঙ্গানো আদাপিরের দোয়া দরুদের বাণী। জলঙ্গীর সাধ্যি কী আদাপির কে টপকায়! মানুষ বাঁচে এই বিশ্বাসে। বিপন্নতার কালোমেঘের কোলে একচিলতে আশার কিরণ আদাপির!
বাঁধ ভাঙ্গার আগে ফসল গোলায় তুলতে হবে। সম্পন্ন কৃষিজীবী আমিনুদ্দিন তাই হাজির পেটান্তিপুরে ডাঙালি-মুনিষের খোঁজে। দাউলে (ডাঙালির মুনিষ) দের জলের ভয় নেই, রুখুশুখু মাঠের মতো শুকিয়ে গেছে তাঁদের জীবন। “কচিকাঁচা ছেলেমেয়েদের খিদের কান্না নিয়ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে”। উনুনে হাঁড়ি চড়ে না দিনের পর দিন, পেটে হাজার বছরের খিদে। দীর্ঘদিনের উপবাসী উনুন বেড়ালের নিশ্চিন্ত আশ্রয়! আমিনুদ্দিনের পেটান্তিপুর আসা যেন আশার দমকা বাতাস লালচাঁদ, কালাচাঁদ, ছব্দুল, আব্দুলদের ভুখা-জীবনে। কাজের আশা, একমুঠো ভাতের আশা, বাঁচার আশ্বাস। “উনুনে আগুন আর আশমানে ধোঁয়া” – নিত্যদিনের হা-অন্ন জীবনে এই তো সবচেয়ে মধুর স্বপ্ন। এই স্বপ্ন পূরণের জন্যই কাস্তেতে শান পড়ে, দৈনন্দিনতার যন্ত্রণা ভুলে, জলঙ্গীর ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে ডাঙালির মুনিষদল পাড়ি জমায় মঞ্জিলপুরে – আমিনুদ্দিনের গেরস্তশালায়। আনসারদার সাবলীল লেখনীতে কাহিনী এগোয়। আমরাও ক্রমে ক্রমে ঢুকে পড়ি জনজীবনের অন্দরমহলে। নতুন ফসলের গন্ধ ভেসে আসে, কানে বাজে ঢেঁকির নোট থেকে উঠে আসা গুবগুব শব্দ। গুবগুব শব্দ ঘষ ঘষ হলে তবেই ধান চালের দিকে পা বাড়ায়। আহা! গ্রামজীবনের খন্ড মুহূর্তের এ এক অপূর্ব কথাচিত্র। পুরো উপন্যাস জুড়ে আপাত-সরল পল্লীজীবনের অন্তঃপুরের দরজা খুলে আশা-আকাঙ্খা, প্রেম-যন্ত্রণার এরকমই অসংখ্য ছবি এঁকে গেছেন আনসারদা, অনায়াস দক্ষতায়।
অগণিত প্রান্তিক মানুষ-মানুষীর অভাব-অভিযোগ সামলে ফি বছর উদ্দাম জলঙ্গীকে সামলানো বুঝি আদাপিরের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে পড়ে! বাঁধ ভাঙ্গে। ভাঙ্গে আশা,আকাঙ্খা, স্বপ্ন। সাঙ্গ হয় পার্থিব হিসেব-নিকেশ। “ভয়ঙ্কর ধূসর জল প্রবাহ” যবনিকা টানে জনজীবনের, উপন্যাসেরও। পুরো উপন্যাসের টান টান বাঁধন একটু যেন শিথিল লাগে শেষ পর্বে এসে – সেও বোধহয় জঙ্গী জলঙ্গীর জলোচ্ছাসে খানিকটা বেসামাল।
“কচিকাঁচা ছেলেমেয়েদের খিদের কান্না নিয়ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে”। উনুনে হাঁড়ি চড়ে না দিনের পর দিন, পেটে হাজার বছরের খিদে। দীর্ঘদিনের উপবাসী উনুন বেড়ালের নিশ্চিন্ত আশ্রয়! আমিনুদ্দিনের পেটান্তিপুর আসা যেন আশার দমকা বাতাস লালচাঁদ, কালাচাঁদ, ছব্দুল, আব্দুলদের ভুখা-জীবনে। কাজের আশা, একমুঠো ভাতের আশা, বাঁচার আশ্বাস। “উনুনে আগুন আর আশমানে ধোঁয়া” – নিত্যদিনের হা-অন্ন জীবনে এই তো সবচেয়ে মধুর স্বপ্ন।
খুব সুন্দর রিভিউ। এরকম আরও রিভিউর অপেক্ষায় রইলাম।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
