সদ্য নির্বাচিত সাংসদ কঙ্গনা রানায়তকে কষিয়ে থাপ্পড় মারলেন এয়ারপোর্ট এ CISF এর কর্মী কুলবিন্দর কৌর। এ নিয়ে ভারত জুড়ে চলছে বিতর্ক। আসুন, আপনিও এই বিতর্কে অংশ নিন।
লেখক শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ এর একটি লেখা এখানে দিলাম। থাক এই লেখাটা:
“এমন হয় জানেন! এই যে দেখলেন কঙ্গনা রানাউত চড়টা খেয়ে গেলেন সেই চড়টা আসলে অনেকদিন ধরে জমে ছিল। একটু একটু করে। কী বলেছিলেন যেন কঙ্গনা? কৃষকদের প্রতিবাদের সময় বসে থাকা এক বৃদ্ধা নারীকে নিয়ে পোস্ট করেছিলেন। লিখেছিলেন একশো টাকায় এঁকে ‘পাওয়া যায়’ (Available)। সেই কবে। ২০২০ সালে।
কুলভিনদর কাউর, পাঞ্জাবের কৃষক পরিবারের মেয়ে। সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সে কাজ করেন। কত কত দিন ধরে কাজ করছেন। নিরাপত্তা দিচ্ছেন যেখানে যেখানে তাঁর পোস্টিং হয় সেখানেই। দেশকে নিরাপত্তা দিচ্ছেন, দেশের মানুষদের দিচ্ছেন। হ্যাঁ, অবশ্যই তাঁর কাজ ওইটিই। এ কাজ করার জন্য আলাদা করে ধন্যবাদ দেবার মানে নেই। কথাটা হল এতদিন সব শৃঙ্খলা মেনে আজ আর পারলেন না। চণ্ডীগড় বিমানবন্দরে কঙ্গনা রানাউত-কে ২০২০-র সেই নোংরা মন্তব্যটির জন্য চড় মেরে দিলেন। এবার থেকে যখনই কঙ্গনার নাম আসবে কুলভিনদর কাউরের চড় সমেত আসবে। দুটি অস্তিত্ব জুড়ে গেল আজ থেকে।
রেখা শর্মা, যিনি জাতীয় মহিলা কমিশনের মাথা, সেদিন ঐ মন্তব্যের জন্য কঙ্গনার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? না। দলের লোক, মনের কথাই বলেছে বোধ করেছেন সম্ভবত। আজ কিন্তু খুব তৎপর হয়ে কড়া অ্যাকশন নেবার জন্য সিআইএসএফের হেডকোয়ার্টারে বলেও দিয়েছেন। কী আশ্চর্য না? নারী তো ঐ কৃষক মহিলাও ছিলেন। তাঁদের জন্য রেখারা কিছু করেন না কখনো! করেন না বলে দিনে দিনে অনেক অঢেল বারুদ জমা হয়।
অবশ্য বারুদ যে জমে তা ওঁরা জানেন। যেমন কঙ্গনা চড় খেয়ে এখন বলছেন পাঞ্জাবে উগ্রপন্থা যে বাড়ছে তা নিয়ে ভাবা দরকার। একটা চড় উগ্রপন্থা? তাহলে নিজের দলের ‘গোলি মারো শালো কো’ কিম্বা ধরণায় বসা কৃষকদের গাড়িতে পিষে দেওয়া, কিম্বা রাস্তায় লোহার পেরেক লাগিয়ে দেওয়া, কিম্বা যেখানে সেখানে সুযোগ পেলেই দাঙ্গা করিয়ে ভোট আর ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা, এমন শত শত বিষয়গুলো কী?
কুলভিনদর কাউর বলেছেন, কঙ্গনা যখন ঐ মন্তব্য করেছিল তখন তাঁর মা বসেছিলেন ধর্ণায়। তাঁর মা-কে একশো টাকায় কিনে নেবার কথা কেউ বলবে, আর তিনি শুনে নেবেন? এই ক্ষোভ এতদিন জমিয়ে রেখে রেখে আজ শোধ তুলেছেন। তাও খুন-জখম নয়, স্রেফ একটা চড়ে। আর হ্যাঁ, চড়টা কঙ্গনার গালে পড়েছে ঠিকই, বাজছে কিন্তু দিল্লীর মসনদে।
কী যে কাণ্ড হচ্ছে সব! দেখুন দেখি, ভারতবর্ষ একের পর এক চড় মেরেই চলেছে ওদের গালে? এ ভারতবর্ষ অনেক সহ্য করে তারপরে একদিন…।”
আমার মতে কখনোই সমর্থন যোগ্য নয়। বিশেষ করে একটা পদে থেকে। একজন নিরাপত্তা কর্মীই যদি এরম ব্যবহার করে তাহলে একটু শঙ্কার বটেই। এগুলো ভুল বার্তা দেওয়া হয়। যেমন ২০২২ সালে সঞ্চালক, কমেডিয়ান ক্রিস রক-কে সপাটে চড় মারেন অভিনেতা উইল স্মিথ! সেটাও সমর্থন যোগ্যছিল না।
কেউ শুধুমাত্র বিজেপির নীতিকে সমর্থন করে না বলে এই কাজ সমর্থন করবে সেটা ঠিক নয়।
আবার অরিত্র দা লিখল যে ভারত চড় মেরে চলেছে তাদের গালে। সাংবিধানিক উপায়ে চড় মারা আর শারীরিক নিগ্রহ আলাদা জিনিস।
এই তো অভিনেতা ও তৃণমূলের এমএলএ সোহম একজনকে চড় মেরেছে কাল। সে নাকি অভিষেককে নিয়ে খারাপ কথা বলেছিল, যেটা সোহম সহ্য করতে পারেনি। আসলে কী হয়েছিল আমি সেটায় যাচ্ছি না। আমার বক্তব্য সোহমের কাজটা শোভনীয় নয় একটা পদে থেকে।
একজন এমপি কে একটা নিম্নপদস্থ সাধারণ মানুষ চড় মেরেছে শুনে যেটা প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া “বেশ করেছে মেরেছে। খুব ভাল হয়েছে। এদেরকে এরকমই দেওয়া উচিত ‘। এটাই ভারতের অধিকাংশ মানুষের মনে হয়েছে যাদের নিজেদের ইমেজ রক্ষার দায় নেই, বা কোন দলের প্রতি আনুগত্য নেই সেইসব সাধারণ মানুষের কথা বলছি। এই কথারই প্রতিধ্বনি লক্ষ করা গেছে অরিত্রর লেখায়। সংখ্যা হিসেব করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত-ই যাবে (বিশেষ করে নিচের তলার জনগণ) চড়ের পক্ষে।
কিন্তু পরে, ভেবে দেখলে দেখা যাবে, এই পথ কি আমাদের মতো শান্তিপূর্ণ মধ্যবিত্ত পথ? একেবারেই নয়, যে কথার প্রতিফলন রুবাই এর সুচিন্তিত মতামতে লক্ষ করা যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এরকম হলো কেন? একজন CISF এর মত কঠোর অনুশাসনের মধ্যে যাওয়া মানুষ এত বছর কর্তব্যনিষ্ঠ থেকে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? আসলে সহ্যের সীমা এতটাও অসহ্য দূরে নয় যতটা উপর তলার মানুষেরা ভেবে থাকেন। অনেক নিচের তলার মানুষ, প্রতি মুহূর্তে শোষিত, অবহেলিত মানুষ এরকম একটা চড় কষাতে চায় – কিন্তু সে এতটাই অসহায় যে কষাতে পারে না… তাই, সহ্য করে নেয়।
কিন্তু ওই যে বললাম, সহ্যের সীমাও অতটা অসহ্য দূরে নয় – তাই সেইদিন আসন্ন… যখন আমরা, শান্তি প্রিয় মধ্যবিত্ত (যারা নিজের যাপনটুকু নিশ্চিন্তে হয়ে গেলে সব ঠিকঠাক চলছে ভাবে) যতই শান্তিপূর্ণ স্থিতাবস্থা চাই না কেন বিক্ষোভে নিচের তলা ফেটে পড়বেই… সারা দেশ জুড়ে গৃহযুদ্ধ আসন্ন… বছর দশ বা পনেরো বছর পর সেই গৃহ যুদ্ধ এলে এই চড়কে কেউ মনে রাখবে না হয়ত… কিন্তু এই চড় সেদিকেরই ইঙ্গিতবাহী… এবং খুব ভুল না করলে, এরকম চড় আরোও আসছে…
যে কোনো নিগ্রহ কাঙ্খিত নয়। মধ্যযুগীয় চিন্তার ফল। প্রতিবাদের অনেক উপায় আছে।
এই বিষয়ে আর একটি লেখা থাকলো। শুদ্ধসত্ত্বদারই লেখা। কারও ইচ্ছে হলে পড়ে দেখতে পারেন।
“কাল থেকে আজ অবধি অনেক কথা শুনলাম, কুলভিনদার কৌরের থাপ্পড় কেন অনৈতিক তা নিয়ে। অনেক সচেতন সংবেদনশীল কথা শুনলাম। অনেক খিস্তি-খেউড় দেখলাম। আরো দু-একটা কথা লিখেই ফেলি বুঝলেন!
বাল্মিকী দস্যু রত্নাকর থেকে সাধনার জোরে হয়ে উঠেছেন। যখন তিনি জানলেন যে তাঁর দস্যুবৃত্তির হিংসার ‘পাপ’-এর দায় কেউ নেবে না, তখন নিজেকে বদলালেন। এক নিষাদকে, ক্রৌঞ্চমিথুনকে হত্যা করতে দেখে এত বিচলিত হলেন যে বলে ফেললেন এক কবিতা।
“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
যৎক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্।।”
অর্থ হল, নিষাদ তুই চিরকাল প্রতিষ্ঠা লাভ করবি না, কারণ তুই কামমোহিত ক্রৌঞ্চমিথুনদের একটিকে বধ করেছিস। এই যে বাল্মিকীর শোক, এই থেকে আমাদের কাব্যভুবনে এল শ্লোক। এই কাহিনীটি চমৎকার। এবং এও বলার বিষয় যে বাল্মিকী বলে কেউ থাকুন বা না থাকুন, ‘রামায়ণ’ রচয়িতা বলে এই নামটি রামায়ণের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। যতকাল রামায়ণ থাকবে, বাল্মিকীও থাকবেন।
তো এই যে হিংসাতে শোকার্ত বাল্মিকী শ্লোক বানালেন, সেই বাল্মিকী তাঁর মহাকাব্যে কী করলেন! হিংসা বর্জন করালেন চরিত্রদের? একটু ভেবে বলুন তো, গোটা মহাকাব্য জুড়ে প্রাণীহত্যা থেকে মানুষ নামের প্রাণীহত্যা (পক্ষী, বানর, রাক্ষস ইত্যাদি সকলকেই নানা টোটেম অনুসরণ করা মানুষ ধরে) চললো তো চললোই। কেন?
কারণটা হল, কল্পনায় যে অহিংসাকে ভাবা যায়, উন্নত একটি আদর্শ হিসেবে বাস্তবে তার অনুপস্থিতি। বাস্তব জগত হিংসার জগত। মহাকাব্যে তা পাল্টাবে কেমন করে? গৌতম বুদ্ধের কথা বলবেন? তাঁর অনুগামী যাবতীয় রাজা-সম্রাট সব অহিংস ছিলেন? শ্রেষ্ঠীরা ধনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হিংসা করা বন্ধ করে দিয়েছিল?
যাক গে, বড় করব না লেখাটা। সোজা কথায় আসি। হিংসাকে, আমি-আপনি না মানলেও, আমরাই সংবিধানে বৈধতা দিয়েছি। সমাজগুলোতে এবং রাষ্ট্রে তাকে নৈতিক করেছি। পুলিশ থেকে সেনাবাহিনী নইলে কোনো রাষ্ট্রেই তো লাগত না। সবাই গোলাপের তোড়া হাতে কুচকাওয়াজ করত। সেনা এবং অস্ত্রের জন্য রাষ্ট্রের বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় করতে হত না।
কিন্তু হয় এবং হচ্ছে এবং আগামী বহুকাল হবে। কথাটা আসলে হিংসা নিয়ে নয়। কথাটা হচ্ছে কার হিংসা সাংবিধানিক তথা আইনি মতে সঠিক আর কারটা বেঠিক। রাষ্ট্র যারা চালায় তারা প্রশাসন চালায়। তথা পুলিশ থেকে আধা সেনা বা গোটা সেনা চালায়। তাদের আদেশে এইসব বাহিনীকে হিংসা করতে হয় নানাস্থানে। পররাষ্ট্রের নাগরিকদের থেকে নিজরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধেও। শুধু এই ভারত রাষ্ট্রটির ১৯৪৭ পরবর্তী ইতিহাসে হাজারে-লক্ষে এমন হিংসার উদাহরণ আছে। আমি আলাদা করে দিচ্ছি না আর। উদাহরণ আছে নিতান্ত ব্যক্তিগত হিংস্র বাহিনীর। রণবীর সেনা থেকে নানা নামের নানা সেনা কত কত হিংসা করেছে, তা না জানলে আপনি জেনে নিতে পারেন। আর ইচ্ছুক না হয়ে হিংসা নিয়ে কথা বললে ওটা স্রেফ হাস্যকর একটা স্ট্যান্স। ৪৭ পরবর্তী দাঙ্গাগুলো, মণিপুরের সাম্প্রতিক জাতিদাঙ্গা সমেতই, হিংসাই।
বলতেই পারেন আপনি এসবের বিরোধী। বলতেই পারেন যে আপনি চান বিশ্বে হিংসা থাকবে না। পুলিশ থেকে সৈন্য এসব পেশা থাকবে না। মানুষ শান্তিতে, আলোচনায় সব সমাধান করে নেবে। আমি দু’হাত তুলে আপনার এই মনোভাবকে সমর্থন জানাব। কিন্তু সে সব হতে তো অনেক ঢের দেরী আছে, তাই না? মধ্যবর্তী সময়কালে কী হবে?
জওয়ানের চাকরির শৃঙ্খলা ভেঙেছেন কৌর। কারণ তিনি ঐ মধ্যবর্তী সময়কালের বাস্তবতাকে আর সহ্য করতে পারেননি। কৃষকদের প্রতিরোধ ভাঙতে যত সন্ত্রাস যত অকথ্য নোংরামো হয়েছে, তা আর নিতে পারেননি। যে সব বাহিনী দিয়ে এই সব আন্দোলন দমন করা হয়, তেমনই এক বাহিনীর সদস্য হয়েই শৃঙ্খলা ভেঙেছেন। কারণ তিনি সম্ভবত বোধ করেছেন, তাঁর পেশাই তাঁর পরিচয় নয়, তিনি একজন স্বাধীন স্বতন্ত্র মানুষ এবং নাগরিক। রাষ্ট্র যদি অন্যপক্ষের মৌখিক হিংসাকে, শারীরিক হিংস্রতার উস্কানিকে, ইচ্ছামতন আইন ব্যবহার না করার মাধ্যমে প্রয়োগ করতে দিতে পারে, তাহলে মানুষের প্রতিক্রিয়া সব সময় সাংবিধানিক শিষ্টাচার সম্মত থাকবে এ ভাবনাটা বালখিল্য নয়?
যাদের চড় খাওয়ার প্রভুত কারণ আছে তারা এ নিয়ে খুবই আতঙ্কিত। সে আসলে নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য। কিন্তু যাঁরা সংবেদন ব্যবহার করছেন, ভদ্রতার বোধ ব্যবহার করছেন, তাঁদের বোধহয় ভাবা দরকার যে সংবেদন থেকে ভদ্রতা সবই শ্রেণীনির্ভর বিষয়। রিকশাওয়ালাকে তুই বলা বাবুর ভদ্রতা হলে, একদিন বাবুকেও তুই সম্বোধন শুনতে হবে। রিকশাওয়ালা সব সময়েই তাঁর ভদ্রতার খাতিরে বাবুকে খাতির করবে না। তখন নৈরাজ্য নৈরাজ্য বলে চেঁচিয়ে লাভ নেই। অনেক আগে, যখন বাবুকে শিক্ষা দেওয়া যেত সম্বোধনের, সেই কাজটা বাবুর লোকেরা বা অন্য কেউ করেনি। তাই ঐদিনটা এসে পড়ে।
ও হ্যাঁ, অনেকেই ইন্দিরাকে গুলি করা থেকে সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি প্রসঙ্গে এসেছেন। এটা লজিকের ফ্যালাসির চরিত্র। ঐ যে ছিল না, ছাগলের দাড়ি আছে, রবীন্দ্রনাথের দাড়ি আছে, অতএব দাড়ি আছেতে কাটাকুটি হয়ে রবীন্দ্রনাথ ছাগল – এইটা সেই রকম আসলে। মোদ্দা কথাটা হচ্ছে শাসক যদি উদ্ধত থেকে উদ্ধততর হয়, বিরোধীতার সাধারণ জায়গাটুকুও আর অবশিষ্ট না রাখতে চায়, তাহলে এমন তথাকথিত ‘নৈরাজ্য’ জন্মায়।
ভগৎ সিং-রা আইনসভায় ১৯২৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা মেরেছিলেন। সে বোমাতে চাইলে লোক মারতেই পারতেন। তখনকার বোমা বানানোর পদ্ধতি অনেক উন্নত হয়ে গিয়েছিল। ধাতব খোলে বেশী করে স্প্লিন্টার ভরে ফেলাটা মোটেও কঠিন ছিল না। কিন্তু বোমাতে সামান্য আহত হন জনাকয়েক। ব্যস। শব্দ আর ধোঁয়াই বেশী ছিল। কারণ উদ্দেশ্যটা হত্যা করা ছিল না। ছিল একটি প্রতিবাদী নৈতিক অবস্থান প্রকাশ করা। যে কারণে আত্মসমর্পণও করেন তাঁরা না পালিয়ে।
এই নিয়ে ভগৎ সিং-এর কথা দিয়েই শেষ করি লেখাটা।
“শক্তি যখন আগ্রাসীভাবে প্রযুক্ত হয় তা ‘হিংস্রতা’ এবং তাই, তা, নৈতিকভাবে অন্যায়, কিন্তু যখন একটি বৈধ কারণের প্রাগ্রসরতার জন্য তা ব্যবহৃত হয়, তার নৈতিক বৈধতা থাকে।”
-ভগৎ সিং
কৌর একটি ‘চড়’ মেরেছেন কৃষক প্রতিবাদের সময় কঙ্গনার নোংরা কথার বিরোধিতায়। হত্যা করেননি।”
হিংসা ছাড়া পৃথিবী হয়না। মানুষ জন্মগতভাবে হিংস্র। ভদ্র বেশ তো এই কদিন হল নিয়েছে। এটা অস্বীকার করার কোন জায়গাই নেই। হিংসাকে একটা নিয়মে বেঁধেই এই সমস্ত ই জায়গা, আইন। সেখান থেকে এটা বেঠিক। কিন্তু শাসকের এই অত্যাচারে মানুষের মধ্যে এই অস্থিরতার সৃষ্টি হবেই, হয়ত নৈরাজ্যেরও সৃষ্টি হতে পারে। নতুন নিয়ম বানানো যেতে পারে। ততক্ষণ অবধি ঠিক বেঠিক আপেক্ষিক।
মিজানুরবাবু মধ্যযুগের প্রসঙ্গ আনলেন, আমার শুধু একটিই প্রশ্ন মধ্যযুগ বলতে কোন সময় বলছেন? হিংসার বিচারে তো মানুষ যত এগিয়েছে বরং তত বেশি হিংস্র হয়েছে এবং মানুষসহ অন্যান্য জীবজন্তুদের সহজে মারার উপায় বানিয়েছে। এক মুহূর্তে যাতে লাখ লোক মারা যায় সেই ব্যবস্থাও অতি আধুনিক।
আর, অনেক উপায়ের একটি বলুন তো যাতে শান্তিপূর্ণ ভাবে ফল পাওয়া যায়! এই কঙ্গনা তো গত তিন চার বছর ফুর্তিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তাঁর প্রভু ভক্তির জন্য MP মনোনয়ন পেয়েছেন, এবং সর্বোপরি আমাদেরই মত সাধারণ মানুষের ভোটে এমপি হয়েছেন।
এই চড় কিছুক্ষণের জন্য হলেও অসমুদ্র হিমাচলকে ভাবতে বাধ্য করল। একটার বেশি দুটো চড় মারেননি বা গুলি চালাননি, একটা চড় মেরেই কুলবিন্দর যে কাজটা করেছেন তার জন্য আমার তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বেড়েছে। অনুশাসনে মেনে যাকে তাকে স্যালুট করার থেকে এই অনুশাসন ভাঙার প্রয়োজন আছে যাতে যারা স্যালুট প্রত্যাশী তারা একটু সামলে চলে।
@রুবাই “নতুন নিয়ম”!! নিয়ম থাকলেই নিয়মভঙ্গ থাকবে। নিয়ম ভঙ্গ থাকলে শাস্তি থাকবেই, শাস্তি থাকলে হিংসা থাকবে, হিংসা থাকলে প্রতিহিংসা থাকবে। তাই হিংসাবিহীন পৃথিবী সম্ভব নয়।
আর সত্যি কথা বলতে কী এত আলোচনার কারণ আমাদের ওই অভ্যস্ত বস্তাপচা নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে বলেই (একজন সাধারণ লোক উচ্চ কোটির গায়ে হাত তুলেছে), নইলে রোজই তো কতই চড়, থাপ্পড়, মারপিট হচ্ছে। আমরা সেসব স্বাভাবিকভাবেই নিই। আমরা তখন তাকে মধ্যযুগীয় বলি না, কাঙ্খিত নয় বলে প্রতিবাদও করি না।
@সম্বিতদা – ঠিক ভুল সবকিছুই আপেক্ষিক। কিছুদিন আগের অন্য একটি আড্ডায় তা বলছিলাম। আমাদের ইতিহাস ঘাঁটলেই তা দেখা যাবে। একটা সময়ে একটা নিয়ম ঠিক, পরবর্তী সময়ে বা অন্য দেশে সেই নিয়ম বেঠিক। আমায় একজন বোঝাচ্ছিল কিছু জিনিস আছে চিরকালীন ঠিক/ভুল। এরম কখনও হয় না। বিজ্ঞানে যেমন একটা সময় পরম মান বলে কিছু রইল না, সব কিছুই হয়ে গেল এক একটি নির্দেশ তন্ত্রের আভ্যন্তরীণ বিষয়, সব কিছুই আপেক্ষিক। তেমনই জীবনেও। একটি সময়ে দাঁড়িয়ে একটি নিয়মের ভিত্তিতে সেটা ভুল। অন্য দেশে, অন্য আইনে, অন্য সময়ের কথা বললে সেটা ঠিক হতেই পারে। আমি এই সময়ের এই দেশের কথা বলছি।
আর তুমি যেটা বলছ রোজই কতকিছু হচ্ছে, হলে ভুল হচ্ছে। কেউ দেখছেনা সময় নেই। দেখলে বা ভাবলে সেটা ভুল। যেমন এইবারে আমাদের ওখানে হাওড়ায় যিনি জিতলেন, প্রসুনবাবু কয়েক বছর আগে একজন কন্সটেবেলকে চড় মেরেছিলেন। বড় মানুষ। এটাকে অনেকে স্বাভাবিক ও ধরে নিয়েছিল। কিন্তু আইনমতে উনি ভুল ( এই সময়ের নিয়মে) এবং কেসও হয়েছিল। ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা ক্ষমতার প্রভাবে আইনের তোয়াক্কা করেনা সেটা আলাদা আর আইন কোনটাকে ঠিক ভুল বলছে সেটা আলাদা।
তোমরা যেটা বলছ তাহলে আমাদের সমাজে anarchism এর নীতি অনুসরণ করা উচিত। যে যার মত, কোন সরকার নেই, কিছু নেই। যদি কোন নিয়ম মানা হয় তাহলে সেটায় কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল বলতে পারি।
@রুবাই, আমি বুঝলাম না তুই আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এখানেও আমদানি করলি কেন। তুই নতুন নিয়ম বানানো যেতে পারে বলেছিস আগের কমেন্টে।
আমি বলতে চাইছি, নিয়মে বাঁধলেও হিংসা থাকবেই। থাকতে বাধ্য। আমরা নিজেদের ইচ্ছেমতো কোন হিংসাকে ইগনোর করি, কোনটা করি না, তাকে নিয়ে মেতে উঠি।
যেটা তুই নিয়ম বলছিস এবং নিয়ম মানেই ঠিক ধরে নিচ্ছিস সেটাইতো বিশাল আপেক্ষিক ব্যাপার।
আর আমি যেটা বলছি সেই আপেক্ষিকতা ধরে নিয়েও যদি কোন নিয়ম বানানো হয় – সেটা কেউ না কেউ ভঙ্গ করবেই। যদি ভঙ্গ না করে তাহলে সেটা আর নিয়ম বানানোর দরকার হয় না – যেমন কোন দেশে এরকম নিয়ম বানানোর দরকার পড়েনি যে তুমি ভাই কাল থেকে চোখ দিয়ে শুনবে, চোখ দিয়ে দেখব সেটাই স্বাভাবিক।
নিয়ম সেখানেই বানাতে হয় যেখানে কিছু লোক অন্য রকম করে। আর তাই নিয়ম ভঙ্গ নিয়মের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
যেই নিয়ম ভঙ্গ হবে তাকে শাস্তি দিতেই হবে – না হলে যারা নিয়ম মানল তাদের সঙ্গে পার্থক্য রইল না। শাস্তিও এক ধরণের হিংসা সেটা আর্থিক হলে আমরা জরিমানা বলি, সেটা বেশি হলে শারীরিক, মানসিক হয়। এমনকি অন্য দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে যুদ্ধ, মৃত্যু অব্দি হয়। সবই ওই “ঠিক নিয়ম ভঙ্গের ফল।
এবার শাস্তি দিলেই শাস্তিদাতাদের (বা যারা নিয়ম বানাচ্ছে) প্রতি এই নিয়মভঙ্গকারীর বিদ্বেষ জন্মাবেই। তার বহিঃপ্রকাশ প্রতিহিংসা।
এই চেন ভাঙার নয়। সে তুমি এই সিস্টেম সেই সিস্টেম যেই সিস্টেম করে নাও…
আর নৈরাজ্যের কথা বলছিস, আমরা কম বেশি সবাই anarchist … আর যে দেশের শাসক যত বেশি anarchist সেই দেশের প্রজা তত বেশি anarchist হবে – সহ্যের সীমা শাসকদল এবং সেই দলের হয়ে কঙ্গনা অতিক্রম করেছিল বলেই সপাটে জবাব এসেছে…
সম্পূর্ণ সহমত। হয়ত দুজনেই একই কথাই আলাদাভাবে বলছিলাম। প্রশ্নটা যেহেতু ছিল কাজটা ঠিক কি ভুল, তাই আমি ভুল লিখছিলাম এবং ব্যাখা করছিলাম। এবার যদি জিজ্ঞেস কর কঙ্গনা কি মার খাওয়ার মত কাজ করেছে, অবশ্যই করেছে।কিন্তু উর্দিধারি একজন মেরে কি ঠিক করলেন ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়। যেহেতু তার ভুল কাজের জন্য কেউ একশন নেয় নি, তাই এই দিনটা আসতেই হত, আগে বা পরে।
এটাও ঠিক আমরা কম বেশি সবাই anarchist।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
