মাংস
ইচ্ছেমৃত্যু
‘মা আমি সব বিষয়ে A পেয়েছি… আজ কিন্তু মাংস খাবো… মাটন’, স্কুল ব্যাগ নামাতে নামাতে বলল ছ’ বছরের ছোট্ট রিয়া। একাধারে বাবা ও মায়ের দায়িত্ব পালন করতে থাকা দেবলীনা বলল, ‘তুমি তো প্রায়ই মাংস খাও, রিয়া’। ‘না আজ তুমিও আমার সাথে খাবে, আর আজকের মাংস রান্নাটা মীনুমাসি নয়, তুমি করবে’। …মেয়ের আবদারে হ্যাঁ-না বলার আগেই কুড়ি বছর আগে ফিরে গেল দেবলীনা।
‘বৌদি ও বৌদি… আমাদের দেবী তো দারুণ রেজাল্ট করেছে… স্টার পেয়েছে স্টার’ দরজা ধাক্কা দিতে দিতে বলেছিল বাপিকাকা। দেবলীনার মা জয়িতাদেবীর মুখে একটা খুশির ঝলক বয়ে যায়, যদিও সেই খুশির ঝলক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, ধীর পায়ে গিয়ে দরজা খুলে দেন। অবশ্য, বছর ষোলর দেবী মায়ের মুখের এই অভিব্যক্তির পরিবর্তন তখন বুঝতে পারেনি – স্টার পাওয়ার খবরে তার বুকটা আনন্দে নেচে উঠেছিল। বাপিকাকার চিৎকারে আশেপাশের লোকজনও জড়ো হয়ে যায়… পাড়ার মুখ উজ্জ্বল করেছে দেবী – শুধু স্কুলেই প্রথম নয়, এই এলাকার মধ্যে প্রথম স্টার। আশেপাশের লোকজন মিলে ঘন্টাখনেকের হৈ-হুল্লোড় মিটলে আবার বাড়ির আবহাওয়াটা গুমোট হয়ে ওঠে। আসলে ৯ মাস ধরে লক-আউট হয়ে থাকা কারখানার মেকানিকের বাড়ি আবার স্বাভাবিকতা ফিরে পায়।
তবু দুপুরে শুকনো ভাতের ডেলা জল দিয়ে গিলতে গিলতে দেবলীনা আবদারের সুরে মাকে বলেছিল, ‘মা, ভাল রেজাল্ট করলাম, একদিন মাংস খাওয়াবে?’ ‘সে হবে ’খন’, বলে ঠক করে হাতাটা ভাতের হাঁড়ির উপরে রাখেন জয়িতাদেবী – আসলে সে শব্দ দিয়ে চেপে দিতে চান অভাবী মায়ের বুকফাটা নীরব আর্তনাদকে।
ইদানিং কারখানার দরজায় বাকি লেবারদের সাথে সারাদিন হত্যে দিয়ে পড়ে থেকে সন্ধ্যার সময় ঘরে ফেরেন দেবাঞ্জনবাবু – দেবীর বাবা। মেয়ের দারুণ রেজাল্টের কথা লোকমুখে দুপুরেই শুনেছেন – সকলের সামনে গর্বে বুক ফুলে উঠেছে ঠিকই কিন্তু সকলের আড়ালে মনের গোপনে চলছে চিন্তা – মেয়েটাকে পড়াবেন কি ভাবে! ছেলেটার কলেজ আর টিউশনের খরচ জোগাতেই মাসে মাসে এদিক ওদিক ধার করতে হয় চড়া সুদে। মেয়েটার পড়ার ব্যাপারে কোনদিনই যত্নবান না হওয়াতেও মেয়েটা এত ভাল রেজাল্ট করবে ভাবতেই পারেননি। ভেবেছিলেন মাধ্যমিক পাশ করে গেলে টেলারিংয়ে ঢুকিয়ে দেবেন – দু’ পয়সা আয় হবে। কিন্তু এখন সে উপায় রইল না; এখন কি যে করবেন ভেবেই পান না দেবাঞ্জনবাবু! তবুও পিতৃত্বের দায় থেকেই হোক বা আনন্দের জন্য, সন্ধ্যার একটু আগে বাড়ি ফিরলেন দুটাকায় চারটে মিস্টি নিয়ে।
দিন কয়েক পরে, দেবীর জ্যাঠা নিরঞ্জনবাবু হঠাৎই এসে হাজির হন দেবীদের বাড়িতে। নিরঞ্জনবাবু কলেজে অধ্যাপনা করেন। দেবীর রেজাল্ট শুনে নিজেই প্রস্তাব দিলেন কলকাতায় তাঁর বাড়িতে রেখে পড়ার কথা; দেবাঞ্জনবাবু যেন হাতে চাঁদ পেলেন। দাদার সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক না থাকলেও রক্তের সম্পর্কজনিত সদ্ভাব আছেই। জয়িতাদেবী একটু আপত্তি করেছিলেন, তিনি নিরঞ্জনবাবু নিয়ে কিছু রটনা শুনেছেন – ব্যাচেলর নিরঞ্জনবাবুর বাড়ির পরিবেশ নাকি ভাল না। তবে আর্থিক অনটনের সংসারে মেয়েটার পড়াশোনা ও থাকা খাওয়ার একটা হিল্লে হয়ে যাবে ভেবেই রাজি হয়ে যান দোলাচলতা কাটিয়ে। দু’দিন পরে নিরঞ্জনবাবু এসে দেবীকে নিয়ে যাবেন স্থির হয়।
যাবার দিন, স্বভাবতই মন খারাপ হয় দেবীর। বুকের বাঁদিকটা টনটন করতে থাকে দেবাঞ্জনবাবু, জয়িতাদেবীর। কারখানাটা খোলা থাকলে মেয়েকে কাছ-ছাড়া করতে হত না। তবুও বয়স পারে অনুভূতি চেপে দিতে, তাই মুখে হালকা হাসি ঝুলিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন তাঁরা; দেবী পারেনি – তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল বিদায়বেলায়। মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে জয়িতাদেবী বলেছিলন, ‘দেখিস জেঠু খুব ভাল রাখবেন। তোর মাংস খাওয়ার আব্দারটা তো আমরা রাখতে পারলাম না, জেঠুর বাড়িতে খাবি’। নিরঞ্জনবাবুও বললেন, ‘এই তো কাছেই, মাঝে মাঝে আসবি, তোর বাবা মা যাবে। চল এবার, দেরি হয়ে যাচ্ছে’। ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে’ – তাই মাকে একটু আঁকড়ে ধরে আঁচলে চোখ মোছা হয়নি দেবীর, বাঁহাত দিয়ে চোখদুটো ঘষে নেয় শুধু। গাড়ি রওনা দেয় কলকাতার পথে।
একা মানুষ নিরঞ্জনবাবুর পক্ষে বাড়িটা বাড়াবাড়ি রকমের বড়। বাড়িতে দুজন কাজের লোক, দুজনেই মেয়ে। একজন রান্নাবান্না করে, আরেকজন ঘরদোর পরিষ্কার রাখে। তাদের বয়স খুব বেশি না, দেবীর থেকে বড় জোর সাত-আট বছরের বড়। তাই সহজেই দেবীর সাথে ভাব হয়ে যায় তাদের, অবশ্য ভাব করার মত আর কেউ ছিলও না। পড়াশোনায় বরাবরের মনোযোগী দেবী দিন কয়েকের মধ্যেই বাড়ির কথা ভুলে পড়ায় মন বসায়। আর মাঝে মাঝে চামেলিদি ও রেণুদির সাথে গল্প করে। বেশ হাসি খুশি সহজ সরল মনের মানুষ ওরা। শুধু মাঝে মাঝে খটকা লাগে যখন দেখে – হঠাৎ সে এসে পড়লে ওরা নিজেদের মধ্যে কোন কথা বললে সেটা ঘুরিয়ে নেয় বা চুপ করে যায়। একদিন সে তার নিজের নামটা ওদের আলোচনায় শুনেছিল – কিন্তু বারবার জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না তারা।
দেবী স্কুলে ভর্তি হয়েছে – সায়েন্সে। ভাল রেজাল্ট করতে হবেই – এই জেদ নিয়ে প্রথম থেকেই একটু রাত অব্দি পড়াশোনা করে। জেঠু খুব ভাল ব্যবহার করেন, অংক আর ফিজিক্সটা বুঝিয়ে দেন নিজের ঘরে ডেকে। এই ভাবেই কেটে গেল কয়েকটা সপ্তাহ। একদিন বিকেল বিকেল জেঠু বাড়ি ফিরলেন খাসির মাংস কিনে; ‘চামেলি; আজ বেশ কষা করে রান্না করিস; দেবী মাংস খুব ভালবাসে। আর সন্ধ্যেতে তোদের বিধানদা আসবে – সব ব্যবস্থা রাখবি। গত মাসে তোদের যে ড্রেসগুলো কিনে দিয়েছিলাম সেগুলো পরিস’।
জেঠু চলে যেতেই দেবী চামেলিকে প্রশ্ন করে, ‘বিধানদা কে?’
‘দাদাবাবুর পেয়ারের ছাত্তর। মাঝে সাঝে আসে…’ – চামেলি কথা শেষ করার আগেই রেণু পাশ থেকে দেবীকে বলে, ‘আজ তুমি সন্ধ্যে সন্ধ্যে খেয়ে নিও। বেশি দেরি করোনি; আর বেশি রাতও জেগোনি বাপু’।
‘কেন?’
থতমত খেয়ে যায় রেণু। চামেলি সামাল দিতে বলে, ‘না, না এমনি বলছে – গরম গরম ভাল লাগবে এই আর কি…’
‘না, আমি যখন খাই তখনই খাব; নইলে ঘুম চলে আসে; পড়ার ক্ষতি হবে’।
তারপর এদিক-ওদিক কথা হয়ে, সন্ধ্যে নামার আগেই অভ্যাস মত পড়তে বসে যায় দেবী। চামেলি রান্না করছে, হাত লাগাচ্ছে রেণু। সারা ঘর মাংসের গন্ধে ম-ম করছে। প্রাণ ভরে গন্ধটা নিতে থাকে দেবী – ‘উফফ, কত্ত দিন পর মাংস খাব। বোধ হয় এক বছর পর… মা-বাবা, নিদেন দাদা থাকলে বেশ হত’। বাড়ির কথা মনে পড়তে মনটা ভার হয়ে আসে। জোর করে পড়ায় মন বসায় – কিন্তু মাংসের গন্ধটা আজ তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ কেউ একজন আসে, উপরের পড়ার ঘর থেকেই বুঝতে পারে এই হয়ত জেঠুর সেই স্টুডেন্ট। নীচের ঘর থেকে ওদের গল্পের আওয়াজ মাঝে মাঝে ভেসে আসে। দেবীর মন উসখুস করে – ‘কখন খেতে ডাকবে! বেশ প্রাণ ভরে মাংস খাবে আজ’।
রাত নটা নাগাদ খাওয়ার টাইমে রেণু ডাকতে আসে; রেণুকে দেখে অবাক হয় – একদম অন্য রকম লাগছে। কত সেজেছে, পরেছে সিফনের পাতলা শাড়ি, বুকের উপর দিয়ে সরু করে আঁচল গেছে – বুকের অনেকখানি উন্মুক্ত রেখে। ব্লাউজের পিঠের দিকটা প্রায় পুরো খোলা। কেমন একটা লাগে সরল, নিষ্পাপ দেবীর। খেতে যাওয়ার পথে, ড্রয়িং রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জেঠু জড়ানো গলায় হাঁক পারে, ‘রেণু দেবীকে এখানে নিয়ে আয়, বিধানের সাথে আলাপ করিয়ে দিই’।
ঘরে ঢুকেই অবাক হয়ে যায় দেবী, টেবিলে মদের গ্লাস, বোতল, মাংসের প্লেট। চামেলিদি বিধানদার গায়ে লেপ্টে বসে গ্লাসে করে মদ খাইয়ে দিচ্ছে তাকে, পোশাক রেণুর মতই – তবে আরও অবিন্যস্ত। ব্লাউজের হুক খোলা। রেণুকে ডেকে নিরঞ্জনবাবু বললেন, ‘ডার্লিং আমাকে আরেকটা পেগ বানিয়ে দে, ততক্ষণ দেবীর সাথে বিধানের পরিচয় করিয়ে দিই’। রেণু কাছে যেতেই তার কোমর বাঁহাতে জড়িয়ে ধরে, জড়ানো গলায় বললেন, ‘দেবী ও হল বিধান, আমার ছাত্র, এবার এম টেক কমপ্লিট করল। আর বিধান এ হল দেবী; মাধ্যমিক পাস করেছে। ভাল পড়াশোনায়, এখানে থেকেই পড়ছে’।
বিধান হাত তুলে হাই বলে বলল, ‘দাঁড়িয়ে কেন, এখান এসে বস। জয়েন আস’ ।
দেবী আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার অবস্থা দেখে চামেলি ঈষৎ জড়ানো গলায় বলে, ‘ওকে এখন ছাড়ো; আমি ওকে খেতে দিই, ওকে পড়তে বসতে হবে আবার’।
বলেই চামেলি দেবীকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায়; ততক্ষণে দেবী ঘামতে শুরু করেছে, কোনরকমে এসে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ে। গল্পের বইতে যেসব দুনিয়ার কথা সে পড়েছে, সে সবই চাক্ষুষ দর্শন হয়ে গেল আজ। চামেলি খাবার বেড়ে দেয় টেবিলে, ‘আজ একটু একা খেয়ে নাও, বুঝতেই পারছ… খেয়ে চুপচাপ উপরে চলে যেও। লক্ষী বোনটি আমার’। দেবীর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে চামেলি চলে যায়।
আপনার গল্পটিও এখানে প্রকাশ করতে ইমেইল করুন editor@sobbanglay.com
টেবিলে সামনে রাখা খাসির মাংস, ভাত, আরও দুয়েকরকম ভাজাভুজি। সে তাকিয়ে থাকে তার প্রিয় মাংসের দিকে অথচ চোখে ভাসতে থাকে ছাত্র ও শিক্ষকের একযোগে মদ-মাংস-মেয়ে নিয়ে ফূর্তি। দেবীর বমি পায় – অথচ সে নড়তে পারছে না যেন! তার পা আটকে গেছে। সে চাইছে বেসিনে গিয়ে বমি করতে কিন্তু নড়বার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে – কিছুতেই সেই দৃশ্য চোখের সামনে থেকে সরছে না। হঠাৎ এক দমকে অনেকটা বমি হড়হড় করে বেরিয়ে আসে। সে মাংস ভাতের উপরেই বমি করে ফেলে।
টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে আছে দেবী। ছ বছরের রিয়া উত্তরের অপেক্ষায়। – না সেদিনের পর থেকে আর মাংস খেতে পারেনি দেবী; মাংস দেখলেই বমি পায়। অথচ মেয়েটা বড় বায়না করছে। সে কি মেয়ের আব্দার রাখতে আজ তাকে রান্না করে খাওয়াবে, সঙ্গে নিজেও খাবে – মাংস?
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান