পূর্বজন্মের জীব
রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
।।২।।
কলকাতার অফিসে চাকরি করে জয়। কাজের চাপে শেষ দুমাস চোখের পাতা কতক্ষণের জন্য যে এক করতে পেরেছিল, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কাজের চাপ হাল্কা হতেই তিনদিনের ছুটি নিয়ে জয় এখানে এসেছে। তিনদিনের ছুটিতে কোথায় যাওয়া যায় একদিন ইন্টারনেটে সেটার খোঁজ করছিল। সেই সূত্রেই আরও অনেক জায়গার সাথে সে জয়পুরের জঙ্গলেরও খোঁজ পায়। ইন্টারনেটে ছবিগুলো দেখেই তার ভালো লেগে যায়। ভালো লেগেছিল নাকি চেনা লেগেছিল সেটা অবশ্য বুঝতে পারেনি সে।
যা আশঙ্কা করেছিল তাইই হল। প্রচণ্ড জোরে বৃষ্টি নেমে এলো এবার। সঙ্গে তো ছাতাও আনেনি সে, তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে হল তাকে। এমন সময় তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলা হরিণটাকে সে দেখতে পেল। হরিণটার চোখে যেন অনুশোচনার ভাব। এই দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে আবার যেন মোহিত হয়ে গেল সে। এই চোখদুটো তার খুব চেনা লাগছে। অবশ্য চেনা লাগছে না ভালো লাগছে বুঝতে পারল না সে। হরিণটার দিকে এক পা এগোতেই, সামনেই একটা বড় গর্ত ছিল, যেটা সে দেখতে পায়নি, সেটাতে পড়ে গেল সে। যন্ত্রণায় প্রায় চিৎকার করে উঠল জয়, প্রায় কোমর অবধি গর্তটায় পড়ে গিয়ে ডান পায়ে বেশ জোরে লাগল তার। উঠবার জন্য যখন সে কাছের কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে যাচ্ছিল, তখনই একটা হাত এসে তার হাতটা আঁকড়ে ধরল। তাকিয়ে দেখল মায়া।
“তুমি?” জিজ্ঞেস করল জয়।
“হ্যাঁ! বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। আপনি আসছেন না দেখে আমি এলাম।”
মুখে এটা বললেও তার চোখে কেমন অনুশোচনার ভাব।
রিসর্টটা এখানে অনেকটা এলাকা জুড়ে। ভেতরে আলাদা আলাদা অনেক রুম। অন্যান্য রুমের সাথে এখানে আছে মাড হাউস। মেইন বিল্ডিং থেকে বেশ কিছুটা দূরে সম্পূর্ণই মাটির তৈরী বড় বড় আলাদা কিছু ঘর। মাথায় খড়ের অনেকখানি ছাউনি হলেও ভেতরে পাঁচতারা হোটেলের সুবিধা। জয় চারজনের থাকার জন্য যে মাড হাউসটা আছে সেটা নিয়েছিল। মাড হাউসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এটা। বাথরুমটাই কতখানি বড়। যথেষ্ট বড় বেডরুমে দুটো খাট, বড় একটা সোফা, তার সামনে কাঁচের টেবিল, অন্যদিকে কাঠের একটা টেবিলের সামনে রাখা দুটো কাঠের চেয়ার এবং একটা আলনা; সোফা আর কাঁচের টেবিলের পাশে একটা ছোট ডাইনিং রুম আর তাতে রাখা একটা বড় টেবিল আর বেশ কয়েকটা চেয়ার। তার রুমের বাইরেটায় বড় দালানে দুটো চেয়ারের সাথে একটা বড় টেবিল রাখা। বেশ কিছুটা দূরে আবার একটা রুম অর্থাৎ আরেকটা মাড হাউস। এইভাবে একটা রুম অনেকটা জায়গা নিয়ে বেশ নিরিবিলি পরিবেশ তৈরী করেছে। জয়ের মাড হাউসটা গেট থেকে অনেকটা ভিতরে, তাই মায়াকে অনেকটা পথ আসতে হল তাকে নিয়ে। কিন্তু এখানে গোটা রিসর্টটাই এমন নিরিবিলি যে আসবার পথে কাউকেই দেখতে পেল না জয়। শুধু নিজের রুমে ঢোকার মুখে একজনের সাথে তাদের দেখা হল। জয়ের সামনের রুমের সেই ট্যুরিস্টটা। অন্ধকারে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছিল। তার চোখে চোখ পড়তেই আগের মতই অজানা ভয় আর রাগ জেগে উঠল জয়ের মনে, সঙ্গে সেই পুরনো অস্বস্তি।
“তাড়াতাড়ি চলো!” মায়াকে বলল জয়।
মায়া বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি জয়ের রুমের দরজাটা খুলে জয়কে নিয়ে ঢুকল। বৃষ্টির জলে ভিজে গেছে দুজনেই। মায়া জয়কে নিয়ে বাথরুমে এলো। তারপর জয়কে সাওয়ারের নীচে এনে সাওয়ারটা চালিয়ে দিল।
এই প্রথম মায়াকে ভালোভাবে খেয়াল করল জয়। বাথরুমের এই কমলাটে আলোয় কেমন মায়াবী লাগছে তাকে। মায়ার উজ্জ্বল কৃষ্ণবর্ণের চেহারার মধ্যে একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য। একটা শান্ত, মিষ্টি অথচ রহস্যময়ী আভা তার মুখমন্ডলে। আর বৃষ্টিতে ভিজে মায়ার গা দিয়ে একটা গন্ধ আসছে। গন্ধটা চেনা লাগছে না ভালো লাগছে সেটা আর বোঝার চেষ্টা করল না, শুধু সেই ঘ্রাণ নিতে থাকল সে। সব মিলিয়ে মায়া তার কাছে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে যেন। তার বারবার মনে হচ্ছে মায়া কোনও মানবী নয়, অন্য কিছু।
সাওয়ারটা চালিয়ে দিয়েই মায়া বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেল।, “চান করে নিন তাড়াতাড়ি, নাহলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে।”
জয় তার হাতটা ধরতে যাচ্ছিল, কিন্তু ভদ্রতাবোধে সেটা পারল না। মায়া যাবার সময় ঘুরে দেখল একবার, তারপর বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করে চলে গেল। জয় তার পরনের ভিজে জামাকাপড়গুলো খুলে বাথরুমের হ্যাঙ্গারে টাঙিয়ে রাখল। তারপর সাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে রইল একভাবে।
একটা হরিণ গুলির আঘাতে ছিটকে পড়ল দূরে। এখনও সে পুরোপুরি মারা যায়নি, ছটফট করছে। তার সঙ্গীটা ভয় পেয়ে লুকিয়ে পড়েছে জঙ্গলের ভেতর, দূর থেকে দেখছে তাকে। হরিণের বাকি দলটাও এদিক ওদিক ছুট লাগিয়েছে। গলায় আঘাত লাগা হরিণটা ছটফট করছে এখনও।
সাওয়ারটা বন্ধ করে একবুক নিঃশ্বাস নিল জয়। হরিণের এই দুঃস্বপ্ন বা স্মৃতি যাই হোক না কেন, তার মনে পড়ে গেছে আবার। কেমন যেন শ্বাসরোধ হয়ে আসছে তার। বহুদিন আগে এসব স্বপ্নে দেখত সে। সে অনেক ছোটবেলায়, তারপর বড় হয়ে খুব একটা বেশি এরকম কিছু দেখেনি সে। কিন্তু এখানে আসবার পর থেকে আবার টানা এইগুলো তার মাথায় ভিড় জমাচ্ছে। হঠাৎ আয়নার দিকে চোখ পড়তেই ভয়ে চমকে উঠল সে। তার সারা গা জুড়ে কেমন গোল গোল সাদা সাদা ছোপ। জঙ্গলে কোনও কিছুর ছোঁয়ায় কি চর্মরোগ হল তার? কিন্তু এত তাড়াতাড়ি? ছোপগুলোয় হাত দিয়ে দেখল কোনও জ্বালা, ব্যথা বা এতটুকু অস্বস্তি কিছুই নেই। ভালো করে বডি ওয়াশ দিয়ে সে শরীর ধুল। কিন্তু তাতে তার চামড়ার কিছু এলো গেলো না। ছোপগুলো আগের মতই আছে। দেখে মনে হচ্ছে তার চামড়ায় যেন এগুলো শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু মনে হলেই তো হবে না। সে তো জানে তার চামড়ায় এরকম কিছু ছিল না। সারা শরীর জুড়ে তার এইরকম ছোপ, বিশেষ করে পিঠেতে। বাথরুমের ঐ বিশাল আয়নাটায় আবার নিজেকে দেখল সে, দেখল পিঠের ছোপগুলো। এগুলোকে চেনা চেনা লাগলেও তার শরীরে এরকম ছোপ তার একদমই ভালো লাগছে না।
এরপর থেকে জয় আর রুমের বাইরে বেরোয়নি। চাদর চাপা দিয়ে সে বিছানাতেই শুয়ে ছিল। রাতে সে নিজে থেকে ফোন না করলেও মায়া নিজে থেকে তার জন্য খাবার নিয়ে এলো।
“জ্বর হয়েছে নাকি?” জিজ্ঞেস করল মায়া। মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল জয়। মায়া এগিয়ে এসে কপালে হাত দিল, “কই জ্বর?”
মায়ার স্পর্শটা তার ভালও লাগল, আবার চেনাও লাগল। আস্তে আস্তে নিজেকে যেন চিনতে পারছে জয়। কিন্তু মেনে নিতে পারছে না। মায়া খাবার নিয়ে চলে গেলে সে উঠে খাবার খেতে এলো। হাতের ওপরে ছোপগুলো এই কয়েক ঘণ্টায় আরও বেড়েছে। অথচ এর জন্য তার শারীরিক কোনও অস্বস্তি নেই, যত অস্বস্তি তার মনে। তার এই পরিবর্তন, তার অনেক কিছু মনে পড়া স্মৃতি তার ভাল লাগছে না। কোনওরকমে যেটুকু পারল খেয়ে আলো বন্ধ করে শুয়ে পড়ল সে।
মাঝরাতে দরজা খোলার শব্দে জয় তার ঘুমজড়ানো চোখদুটো একটু তুলে তাকাল। অর্ধচেতন অবস্থায় তার মনে হল একটা প্রাণী তার রুমের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। তার নিজের রুমের আলো বন্ধই করা ছিল, রুমের বাইরেও সমান অন্ধকার। দূরের কোনও রুম থেকে আসা যেটুকু আলো তার ঘরে ঢুকেছে, সেই আলোতে প্রাণীটার ছায়া দেখে তাকে যেন হরিণ বলে মনে হল। প্রাণীটা চারপায়ে এসে তার বিছানার কাছে থামল। চাদর থেকে জয়ের যেটুকু পা বেরিয়ে আছে, সেই পায়ের ছড়ে যাওয়া ক্ষতবিক্ষত জায়গাগুলো সোহাগভরে চাটতে থাকল প্রাণীটা।
“কে?” পায়ের কাছে ভিজে স্পর্শে জয় উঠে বসল।
“আমি! মায়া!” মায়ার হাতে ভেজানো একটা স্পঞ্জ। বিছানায় জয়ের পায়ের কাছে মেঝেতে বসে তার পায়ের ক্ষততে মায়া স্পঞ্জটা বোলাচ্ছিল। তার পাশে বাটিতে রাখা তরল কোনও ওষুধ।
জয় উঠে বসল। কোনওকিছু আলাদাভাবে চেনার দরকার নেই তার। সব কিছুই তার চেনা লাগছে এখন, সব চেনা কিছুই তার ভালও লাগছে এখন। সে জানতে পেরেছে নিজেকে, সে চিনতে পেরেছে নিজেকে, চিনতে পেরেছে মায়া কে! মায়াকে সে তুলে আনল বিছানাতে। কেন এই বর্ষাকালে, তার এই জঙ্গলে আসতে ইচ্ছে হল, কেন বিকেলবেলায় সে জঙ্গলে ছুটে গেল, কেন এখান কার সব রাস্তা তার চেনা লাগছিল, জঙ্গলের মধ্যে ঐ হরিণটার চোখের সাথে আসলে যে মায়ার চোখেরই মিল ছিল, সবকিছু এখন পরিষ্কার তার কাছে। সে মানুষের জন্য বানানো সব কাপড়চোপড় খুলে নিল মায়ার পিঠ থেকে। বাইরের থেকে আসা ক্ষীণ আলোয় সে দেখল একইরকম সাদা ছোপ মায়ার কালো পিঠ জুড়ে। এই জঙ্গলে যে চিতল হরিণ আছে, তাদের পিঠেও একই রকম ছোপ। এই আবছা আলোয় মায়াকে আরও মায়াবী লাগছে। বিছানা থেকে নেমে জয় দরজাটা বন্ধ করে এলো।
মৃত হরিণটাকে যে লোকটা এসে কাঁধে তুলে নিল, সে আর কেউ না, জয়ের সামনের রুমের সেই ট্যুরিস্টটা, যাকে দেখে কেমন অজানা অস্বস্তি হচ্ছিল জয়ের। লোকটা এককালে প্রচুর পশুপাচারকারী সংস্থার সাথে যুক্ত ছিল। এখন আগের মত অবৈধভাবে পশুহত্যা না করলেও অন্যান্য এইরকম বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার সাথে সে যুক্ত আছে। হরিণটাকে তুলে নিয়ে চলে যাবার পর অন্য হরিণটা বেরিয়ে এল গাছের আড়াল থেকে। তার চোখে কি দুফোঁটা জল? ঠিক বোঝা গেল না।
পরদিন সকালে জয়ের রুমে জয়কে পাওয়া গেল না। সারা রিসর্টের কোথাও মায়াকেও পাওয়া গেল না। শুধু জয়ের রুমে বিছানার সামনে মেঝেতে জয় আর মায়ার কাপড়চোপড়গুলো পাওয়া গেল। অবশ্য জয় বা মায়ার কারও জিনিসপত্রের কিছুই কিন্তু নিখোঁজ ছিল না। আর পাওয়া গেল জয়ের সামনের রুমের সেই ট্যুরিস্টটার রক্তমাখা লাশ।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান