উত্তর-পূর্ব ব্রিটিশ ভারতে কোহিমা ছিল অসম প্রদেশের নাগা হিলস জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই নাগাল্যান্ডেই ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে জাপানি বাহিনীর কোহিমার যুদ্ধ (Battle of Kohima) সংঘটিত হয়েছিল। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ জাপানিদের ‘ইউ-গো’ অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এই অভিযানের মাধ্যমে তারা মিত্রবাহিনী-নিয়ন্ত্রিত ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতে প্রবেশ করতে চেয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনী জাপানিদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ব্রিটিশরা ইম্ফলে অবরুদ্ধ বাহিনীকে মুক্ত করতে পেরেছিল। অন্যদিকে, জাপানি বাহিনীর এই পরাজয় ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের অন্যতম বৃহত্তম পরাজয়। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে জাপানিদের ভারত আক্রমণের পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। তবে মনে করা হয়, জাপানিরা যদি ভারতে একটি শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করতে পারত, তাহলে হয়তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের লক্ষ্যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠত। এই যুদ্ধ ভারত ও বার্মা ফ্রন্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়। অনেক বিশ্লেষক কোহিমা ও ইম্ফলের যুদ্ধকে ‘প্রাচ্যের স্তালিনগ্রাদ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
১৯৪৪ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২২ জুন পর্যন্ত ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে ইম্পেরিয়াল জাপানি বাহিনীর ৩১তম ডিভিশনের মধ্যে কোহিমার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে জাপানি সেনারা কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল রেন্যা মুতাগুচির (Renya Mutaguchi) নির্দেশে কোটোকু সাতোর (Kotoku Sato) নেতৃত্বে কোহিমা আক্রমণ করেছিল। জাপানিদের ৩১তম ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত ছিল ৫৮তম, ১২৪তম ও ১৩৯তম পদাতিক রেজিমেন্ট এবং ৩১তম মাউন্টেন আর্টিলারি রেজিমেন্ট। অন্যদিকে, ব্রিটিশদের পক্ষে ২য় ব্রিটিশ ডিভিশন, ১৬১তম ইন্ডিয়ান ব্রিগেড এবং আসাম রাইফেলসের সেনারা এই যুদ্ধে মূল প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাপানিরা পূর্ব এশিয়া জুড়ে ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোতে আক্রমণ শুরু করেছিল। তারা জাপানকে ঘিরে এমন একটি সুরক্ষিত বলয় তৈরি করতে চেয়েছিল, যাতে বিশ্বযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য জাপানি সেনাদের রসদের কোনও অভাব না হয়। এই উদ্দেশ্যে জাপানিরা ভারতের দিকে অগ্রসর হয় এবং একসময় রেঙ্গুন দখল করে নেয়।
তবে জাপানি কমান্ডার কোটোকু সাতো এই আক্রমণাত্মক অভিযানের সাফল্য নিয়ে শুরু থেকেই সন্দিহান ছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল রেন্যা মুতাগুচির একগুঁয়েমি ও জেদের কারণেই ইউ-গো অভিযান শুরু হয়। ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে জাপানি বাহিনী মণিপুর ও নাগা পাহাড় অঞ্চলে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়। তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ইম্ফল ও কোহিমা শহর। জাপানিদের উদ্দেশ্য ছিল ইম্ফলে অবস্থিত ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলো দখল করা এবং ডিমাপুর-ইম্ফল সংযোগকারী সড়কটি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। সেই সময় ডিমাপুর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলকেন্দ্র, যেখানে মিত্রবাহিনীর রসদ মজুত রাখা হতো। তারা চেয়েছিল ডিমাপুর দখল করে ব্রিটিশদের সেনা ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে। এছাড়াও তাদের পরিকল্পনা ছিল আকাশপথে চিনে মিত্রবাহিনীর সাহায্য পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া। অন্যদিকে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও সেনাকর্তারা প্রাথমিকভাবে মনে করেছিলেন যে দুর্গম জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকা পেরিয়ে জাপানিরা কোহিমা বা ডিমাপুরে বড় ধরনের আক্রমণ চালাতে পারবে না। এই কারণে ব্রিটিশরা কোহিমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুব একটা শক্তিশালী করেনি।
কোহিমার যুদ্ধ ১৯৪৪ সালের ৪ এপ্রিল শুরু হলেও ৬ এপ্রিল জাপানিরা কোহিমায় ব্রিটিশ ও ভারতীয় বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালায় এবং চারদিক থেকে অবরোধ শুরু করে। জাপানি বাহিনী ডিমাপুরের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য কোহিমার ছোট গ্যারিসনটি দ্রুত দখল করতে চেয়েছিল। সেই সময় ওই গ্যারিসনের দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল হিউ রিচার্ডস (Colonel Hugh Richards)। তাঁর অধীনে শুরুতে প্রায় ১,৫০০ সৈন্যের একটি সাময়িক বাহিনী মোতায়েন ছিল। এই বাহিনী মূলত আসাম রেজিমেন্ট এবং দ্য কুইন্স ওন রয়্যাল ওয়েস্ট কেন্ট রেজিমেন্টের চতুর্থ ব্যাটালিয়নকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। এই বাহিনীর মধ্যে বহু অসামরিক ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে সাহায্যকারী দল এসে পৌঁছালেও এই গ্যারিসনকে জাপানের ৩১তম ডিভিশনের প্রায় ১৫,০০০ অভিজ্ঞ ও যুদ্ধংদেহী সেনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
১৯৪৪ সালের এপ্রিল মাসে জাপানি সেনারা চারদিক থেকে ব্রিটিশ বাহিনীকে ঘিরে ফেলে ক্রমাগত গোলাবর্ষণ শুরু করে এবং কোহিমা-ইম্ফল সড়ক সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয়। এরপর বিমান ও কামানবাহিনীর সহায়তায় জাপানিরা জেলা প্রশাসকের বাংলো এলাকাটি দখল করতে উদ্যত হয়। সংখ্যায় অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনারা মাত্র কয়েক গজ দূরত্ব থেকে জাপানিদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এই সময় ডিসি বাংলোর টেনিস কোর্ট ও আশপাশের এলাকায় উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি লড়াইসহ পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর সংঘর্ষ হয়েছিল, যা ‘টেনিস কোর্টের লড়াই’ (Battle of the Tennis Court) নামে পরিচিত। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনী দক্ষতার সঙ্গে লড়াই করে কোহিমার গ্যারিসন হিলে জাপানিদের আটকে রাখতে সক্ষম হয়।
তবে এই সময় ক্ষুধা, মহামারি ও একটানা সংঘর্ষের ফলে উভয় পক্ষের অবস্থাই শোচনীয় হয়ে পড়ে। এরপর ব্রিটিশ ২য় ডিভিশন ওই অবরুদ্ধ বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে। এছাড়াও জটসোমায় অবস্থানরত ১৬১তম ভারতীয় ব্রিগেডের সেনারা কোহিমা গ্যারিসনকে কার্যকর সহায়তা প্রদান করে। এরপর তারা জাপানিদের দখল করা এলাকাগুলো পুনর্দখলের জন্য পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের প্রবল পালটা আক্রমণের মুখে জাপানিরা গ্যারিসন হিল দখল করতে ব্যর্থ হয়। জাপানিরা যদি এই গ্যারিসন হিল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারত, তাহলে তারা অনায়াসে ডিমাপুরের কেন্দ্রীয় সাপ্লাই লাইনে পৌঁছে যেতে পারত। যদিও তারা ওই শৈলশিরা ছেড়ে দেয়, তবুও কোহিমা-ইম্ফল সড়ক অবরোধ করে রাখে। অবশেষে ২২ জুন ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্যরা পশ্চাদপসরণকারী জাপানি সেনাদের বিতাড়িত করে সড়কটি পুনরায় মুক্ত করে। এরপর কোহিমা ও ইম্ফলের ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনারা পরস্পর মিলিত হলে এই ঐতিহাসিক অবরোধের অবসান ঘটে।
কোহিমার যুদ্ধে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী ৩.৭ ইঞ্চি মাউন্টেন হাউইটজার, ২৫-পাউন্ডার ফিল্ড গান এবং ৫.৫ ইঞ্চি মাঝারি কামান ব্যবহার করেছিল। অন্যদিকে, ১৫,০০০-এর বেশি সৈন্য, গোলাবারুদ ও হালকা মাউন্টেন গান নিয়ে জাপানিরা আক্রমণ চালিয়েছিল।
কোহিমার যুদ্ধে জাপানিদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল উপযুক্ত রসদ ও লজিস্টিকসের অভাব। জাপানি ৩১তম ডিভিশন মাত্র তিন সপ্তাহের খাবার নিয়ে ইউ-গো অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সেই রসদ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। মে মাসের মাঝামাঝি নাগাদ জাপানি সৈন্যরা তীব্র অনাহারের মুখে পড়ে। মুতাগুচি ও জাপানি সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে ৩১তম ডিভিশনকে কোহিমায় অবস্থান ধরে রাখার অবাস্তব নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে, জেনারেল কোতোকু সাতো বুঝতে পেরেছিলেন যে পর্যাপ্ত খাবার ও গোলাবারুদ ছাড়া এই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মানে আত্মহত্যা। সেই সময় অধিকাংশ জাপানি সেনা অনাহার, বেরিবেরি, কলেরা ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে শুরু করে। এই কারণে সাতো তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য করে নিজের অবশিষ্ট সৈন্যদের বাঁচানোর জন্য পিছু হটার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন।
এই যুদ্ধে একদিকে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেছিল, অন্যদিকে স্থানীয় নাগা জাতিগোষ্ঠীর অসংখ্য মানুষও মিত্রবাহিনীকে অসামান্য সাহায্য করেছিল। তারা ব্রিটিশদের গাইড হিসেবে কাজ করেছিল, স্ট্রেচারে করে আহতদের নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিল। পার্বত্য অঞ্চল সম্পর্কে তাদের গভীর জ্ঞান না থাকলে এই যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর জয় পাওয়া অসম্ভব ছিল।
কোহিমার পরাজয় ইম্ফলের যুদ্ধের ওপরও অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। এই পরাজয়ের ফলে ইম্ফলে অবরুদ্ধ মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের মুক্ত করা আরও সহজ হয়ে যায়। বলা যায়, কোহিমার যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে জাপানিদের ভারত জয়ের স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই যুদ্ধে জাপানিদের প্রায় ৭,০০০ এবং মিত্রবাহিনীর প্রায় ৪,০০০ সৈন্য হতাহত হয়েছিল।
সেনাবাহিনীর আদেশ অমান্য করার কারণে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসের শুরুতে সাতো কোটোকুকে জাপানের ৩১তম ডিভিশনের কমান্ড থেকে অপসারণ করা হয়। অন্যদিকে, কোহিমার যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য জন হারম্যান (John Harman) এবং ক্যাপ্টেন জন র্যান্ডল (John Randall)-কে মরণোত্তর ভিক্টোরিয়া ক্রস প্রদান করা হয়েছিল।
১৯৪৪ সালের কোহিমার যুদ্ধে নিহত মিত্রবাহিনীর সেনাদের স্মরণে কোহিমা রিজের ওপর একটি বিখ্যাত সমাধিক্ষেত্র নির্মাণ করা হয়, যা ‘কোহিমা ওয়ার সেমেট্রি’ নামে পরিচিত। এখানে প্রায় ১,৪২০ জন কমনওয়েলথ সৈনিকের সমাধি এবং প্রায় ৯১৭ জন হিন্দু ও শিখ সৈনিকের স্মারক রয়েছে। এই সমাধিক্ষেত্রের একটি পাথরের স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা আছে সেই বিশ্ববিখ্যাত কোহিমা এপিটাফ— “যখন তোমরা বাড়ি ফিরবে, তাদের আমাদের কথা বোলো; বোলো— তোমাদের সুন্দর আগামীকালের জন্য আমরা আমাদের আজকের দিনটি উৎসর্গ করেছি।”
বর্তমানে এই স্থানটি কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন দ্বারা অত্যন্ত যত্নসহকারে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। ২০১৩ সালে লন্ডনের ন্যাশনাল আর্মি মিউজিয়াম (National Army Museum) দ্বারা আয়োজিত একটি বিশেষ প্রতিযোগিতামূলক ভোটে ইতিহাসবিদ ও বিশেষজ্ঞদের প্যানেল কোহিমা ও ইম্ফলের যুদ্ধকে ‘ব্রিটেনের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধ’ (Britain’s Greatest Battle) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান