সববাংলায়

মণিলাল ভৌমিক | মণি ভৌমিক

বিভাগঃ , ,

যে সমস্ত বাঙালি ব্যক্তি আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁদের কৃতিত্বের জন্য সম্মানিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক (Mani Lal Bhaumik) বা সংক্ষেপে মণি ভৌমিক অন্যতম একজন। তিনি মূলত একজন প্রথিতযশা পদার্থবিদ। প্রথম জীবনে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন এবং মহাত্মা গান্ধীর সান্নিধ্যলাভেরও সুযোগ হয়েছিল তাঁর। ছাত্রাবস্থায় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর উৎসাহ পেয়েছিলেন। এক্সাইমার লেজার (Excimer Laser) প্রযুক্তির গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন তিনি। কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে দীর্ঘ চর্চা করেছেন। আধ্যাত্মিকতা এবং বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতু গড়বারও প্রয়াস করেছেন মণিলাল। ইংরেজি এবং বাংলা ভাষায় তাঁর রচিত গ্রন্থগুলিও ভীষণই জনপ্রিয়। এছাড়াও বেশ কিছু সমাজসেবামূলক কাজও করেছেন তিনি। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারের পাশাপাশি ২০১১ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

১৯৩১ সালের ৩০ মার্চ তমলুকের একটি ছোট গ্রামে এক বাঙালি পরিবারে মণিলাল ভৌমিকের জন্ম হয়৷ খুবই দরিদ্র এক পরিবার ছিল তাঁদের। মোট ছয় ভাইবোনের সঙ্গে একটি কুঁড়ে ঘরে দিনযাপন করেছেন। এমনকি ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত একজোড়া জুতোও জেটেনি তাঁর ঠিকভাবে। প্রায় চার মাইল রাস্তা অতিক্রম করে প্রত্যহ স্কুলে যেতে হত তাঁকে। তাঁর পিতা গুণধর ভৌমিক ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। পরিবারের সেইরকম পরিবেশে বেড়ে ওঠায় মণিলালের মধ্যেও দেশের জন্য কাজ করবার তাগিদ গড়ে ওঠে। কিশোর বয়সেই মহিষাদল ক্যাম্পে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল তাঁর। আরও পরে, বাল্যের শেষদিকে মণি ভৌমিক স্বাধীনতা সংগ্রামী মাতঙ্গিনী হাজরার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।

এক নজরে মণি ভৌমিক:

  • জন্ম: ৩০ মার্চ, ১৯৩১
  • মৃত্যু: – (জীবিত)
  • কেন বিখ্যাত: প্রথিতযশা বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী যিনি এক্সাইমার লেজার ও কোয়ান্টাম ফিজিক্সের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
  • পুরস্কার: ‘প্রবাসী ভারতীয় সম্মান’, ‘মহাত্মা গান্ধী মানবিক পুরস্কার ‘, ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার ইত্যাদি।

মণি ভৌমিকের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়েছিল কোলা ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। বিদ্যালয় স্তরের পড়াশোনা সফলভাবে সম্পন্ন করবার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কলকাতার নামকরা স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি.এসসি ডিগ্রি লাভে সক্ষম হন তিনি। এরপর স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ এবং বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যয়নের জন্য প্রসিদ্ধ রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেও সফলভাবে এম.এসসি ডিগ্রি লাভ করেন। এই সময়তেই তিনি বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন। পড়াশোনার প্রতি মণি ভৌমিকের অদম্য কৌতুহল ছিল বলে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁকে আরও বেশি উৎসাহ দিতেন। এই সাহচর্য মণি ভৌমিকের জীবনের অন্যতম সম্পদ।

স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করবার পর মণি ভৌমিক গবেষণার জন্য গিয়েছিলেন খড়গপুরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে। কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করে ১৯৫৮ সালে তিনি সেখান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। মণি ভৌমিক সেই ইন্সটিটিউট থেকে প্রথম ডক্টরেট উপাধি পাওয়া ব্যক্তি। তাঁর গবেষণা ছিল রেজোন্যান্ট ইলেকট্রনিক এনার্জি ট্রান্সফারের উপর, যা পরবর্তীকালে লেজার সংক্রান্ত গবেষণায় তাঁকে সাহায্য করেছিল।

১৯৫৯ সালে পোস্ট ডক্টরালের জন্য স্লোন ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ পেয়ে মণি ভৌমিক ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলেসে চলে যান। পোস্ট ডক্টরাল সম্পন্ন করবার পর ১৯৬১ সালে তিনি পাসাডেনার জেরক্স ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সিস্টেমের কোয়ান্টাম ইলেকট্রনিক্স বিভাগে যোগদান করেন এবং লেজার বিজ্ঞানী হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তারই পাশাপাশি তিনি লং বিচে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে কোয়ান্টাম ফিজিক্স এবং জ্যোতির্বিদ্যা পড়াতেন। ১৯৬৮ সালে মণি ভৌমিক নর্থরপ কর্পোরেট রিসার্চ ল্যাবরেটরি দ্বারা তালিকাভুক্ত হন এবং সেখানে লেজার টেকনোলজি ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর হয়ে লেজার প্রযুক্তির উপর গবেষণারত একটি দলের নেতৃত্ব দেন। এই গবেষণা সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র ১৯৭৩ সালের মে মাসে ডেনভারে অপটিক্যাল সোসাইটি অব আমেরিকার সভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। ব্যবহারিক বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে লেজার যে খুবই দক্ষ এবং শক্তিশালী হতে পারে মণি ভৌমিক এই সভাতেই প্রথম নানারকম প্রমাণাদিসহ ডেমনস্ট্রেট করে তা দেখিয়েছিলেন। চোখের সার্জারিতে এই এক্সাইমার লেজার ব্যবহারের ফলে অনেক মানুষের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক হয়েছে। এক্সাইমার লেজার সোরিয়াসিস এবং ভিটিলিগোর মতো কঠিন সব চর্মরোগের জন্যও ব্যবহৃত হয়। এই লেজারের সবচেয়ে ব্যাপক প্রয়োগ হয়েছে ফটোলিথোগ্রাফিতে। নতুন এবং উচ্চশক্তিসম্পন্ন একটি লেজারের উন্নয়নে মণি ভৌমিকের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁর সহকর্মীরাই তাঁকে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি এবং ইন্সটিটিউট অফ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স-এর একজন কর্মী হিসেবে কাজ করবার জন্য নির্বাচন করেছিলেন।

মণিলালের আগ্রহ এরপর অবশ্য কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার দিকেই ধাবিত হয়েছিল। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের শতাব্দী প্রাচীন রহস্যের পাঠোদ্ধার এবং কোয়ান্টাম ফিজিক্স ও সৃষ্টিতত্ত্বের অগ্রগতি এবং আমাদের জীবন, কর্ম, প্রযুক্তি ও আধ্যাত্মিক বিকাশে তার প্রভাবের ধারণাকে আলোচনার মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরন্তর প্রয়াস করে গেছেন মণিলাল। এরজন্য বক্তৃতা দিয়েছেন, প্রবন্ধ রচনা করেছেন, ‘কোড নেম গড’ ও ‘দ্য কসমিক ডিটেকটিভ’-এর মত বই লিখেছেন এবং ‘কসমিক কোয়ান্টাম রে’-এর মতো টিভি প্রোগ্রামও করেছেন। মণিলাল তাঁর ‘কোড নেমমগড’ বইতে বিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন করবার প্রয়াস করেছিলেন। আধ্যাত্মিকতার ভিত্তি যে নিছক অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা সেই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতা ও পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের মধ্যে একটি ‘কমন স্পেস’ খুঁজে বের করবার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। আবার ‘দ্য কসমিক ডিটেকটিভ’ গ্রন্থে আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্বের আবিষ্কারকে যেভাবে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি তা বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। বইটি মোট সাতটি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাতেও বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন মণিলাল। তাঁর লেখা সেই বাংলা বইগুলি হল, ‘বিশ্বজীবনী : মহাবিশ্বের জীবনী’, ‘ব্রহ্ম সত্য জগৎ সত্য : উপনিষদ-বিজ্ঞান-রবীন্দ্রনাথ’, ‘বিজনে ঈশ্বরের সংকেত’ (কোড নেম গড-এর অনুবাদ), ‘আমি নরেন : বিদেশে বিবেকানন্দ’, ‘হ্যালো আইনস্টাইন : চেনা নাম অচেনা গল্প’।

এমনকি চেতনার উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে অনুসন্ধান করে তা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান কীভাবে আমাদের অস্তিত্বের মনোন্নয়ন ঘটাতে পারে, সেই সংক্রান্ত গবেষণাতেও আগ্রহী ছিলেন মণিলাল।

বিভিন্ন পেশাদার জার্নালে তাঁর অনেকগুলি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। লেজার সংক্রান্ত প্রায় এক ডজন মার্কিন পেটেন্টেরও অধিকারী তিনি। ইতালি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ইত্যাদি বিভিন্ন দেশ থেকে লেজার সংক্রান্ত বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছেন তিনি। এছাড়াও ২০০১ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলাতেও বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ২০২০ সালের বিজ্ঞান উৎসবেও একটি বক্তৃতা দেন।

বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন মণিলাল। লস এঞ্জেলেস-এর থালিয়ানস-সহ বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় অর্থদান করেছেন তিনি। কলকাতায় ভৌমিক এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং আর্থিকভাবে দুর্বল অথচ মেধাবী ছাত্রছাত্রী যারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির জন্য কাজ করবার স্বপ্ন দেখে, তাদের জন্য সম্পূর্ণ বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থাও করেছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার একটি ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করবার জন্য ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলেসকে ১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছিলেন।

বিজ্ঞানের জগতে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য এবং আরও নানা কর্মকাণ্ডের জন্য মণি ভৌমিক বিভিন্ন সময়ে নানা পুরষ্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০১০ সালে পেয়েছেন প্রবাসী ভারতীয় সম্মান, ইন্ডিয়ান আমেরিকান হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে মহাত্মা গান্ধী মানবিক পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৫ সালে এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, ২০১১ সালে বিজ্ঞানে অবদানের জন্য ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন তিনি।

এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অসাধারণ প্রতিভাবান বৈজ্ঞানিক মণিলাল ভৌমিকের বর্তমান বয়স ৯৩ বছর।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading