ইতিহাস

মাতঙ্গিনী হাজরা

মাতঙ্গিনী হাজরা (Matangini Hazra) একজন স্বনামধন্যা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন যিনি তাঁর অকুতোভয় সাহস ও অসামান্য দেশপ্রেমের বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন বলে তাঁকে “গান্ধী বুড়ি” নামেও ডাকা হত। মহাত্মা গান্ধীর পরিচালনায় ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় পুলিশের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হন।

১৮৭০ সালে ১৯ অক্টোবর অধুনা পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুকের কাছে হোগলা গ্রামে মাতঙ্গিনী হাজরার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ঠাকুরদাস মাইতি ও মায়ের নাম ভগবতী দেবী। গরিব চাষী পরিবারের জন্মের কারণে তিনি প্রথাগত শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিতই ছিলেন। মাতঙ্গিনীর অল্প বয়সেই তাঁর বাবার মৃত্যু হলে তিনি তাঁর মামার বাড়ি চলে আসেন। মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় ত্রিলোচন হাজরা নামের ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির সাথে এবং বিয়ের চার বছরের মাথায় মাতঙ্গিনী বিধবা হন। মাতঙ্গিনী নিঃসন্তান ছিলেন।

স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ি থেকে একরকম পরিত্যাজ্য হয়েই মাঠের ধারে একটি কুঁড়েতে আশ্রয় নেন তিনি। ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি। যখনই বাংলায় বসন্ত রোগ মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে তখনই তিনি বসন্ত রোগীদের আপ্রাণ সেবা করেছেন। এই সময়ে কংগ্রেস নেতা গুণধর ভৌমিক তাঁকে দলের বরিষ্ঠ নেতা সতীশ সামন্ত ও অজয় মুখোপাধ্যায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর তিনি ভারতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। চরকায় সুতো কাটা এবং খদ্দরের কাপড় তৈরিতে নিজের ধ্যান-জ্ঞান অর্পণ করেন তিনি।

১৯০৫ সাল থেকে মাতঙ্গিনী সক্রিয়ভাবে ভারতের স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত হন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন বলে তাঁকে “গান্ধী বুড়ি” নামেও ডাকা হত।১৯৩২ সালে গান্ধীজীর ডাকে তিনি আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করেন। লবণ আইন অমান্য করার জন্য তাঁকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং শাস্তিস্বরূপ তাঁকে দীর্ঘ পথ হাঁটতে বাধ্য করা হয়। এরপর মাতঙ্গিনী চৌকিদারি কর বন্ধের জন্য আন্দোলনে যোগদান করেন। এই সময় তাঁকে পুলিশ আবার গ্রেফতার করে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়ে বহরমপুর জেলে পাঠিয়ে দেয়। ১৯৩৩ সালে তিনি শ্রীরামপুরে কংগ্রেসের সম্মেলনে যোগদান করেন। এই সভা বানচাল করার জন্য ব্রিটিশ পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করলে লাঠির আঘাতে মাতঙ্গিনী গুরুতর আহত হন। এই বছরেই বাংলার গভর্নর স্যার জন অ্যাণ্ডারসন তমলুক পরিদর্শনে এলে মাতঙ্গিনী হাজরা জনস্রোতের সামনে সমস্ত নিরাপত্তারক্ষীদের এড়িয়ে গিয়ে কালো পতাকা প্রদর্শন করেন।

বর্তমান আই.আই.টি খড়গপুরের একটি অংশ ব্রিটিশ আমলে হিজলি বন্দী শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হত যেখানে মহিলা বন্দীদের রাখা হত। এই জেলেই মাতঙ্গিনী বন্দী ছিলেন বেশ কিছুকাল।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের রেশ সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। মাতঙ্গিনীও সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। সেই সময় কংগ্রেসের সদস্যরা পরিকল্পনা করে যে মেদিনীপুর জেলার সব থানা তারা দখল করবে যাতে জেলা থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করা যায়। এই বছরই ২৯ সেপ্টেম্বর তমলুকে হওয়া একটি মিছিলে তিনি প্রথম সারিতে থেকে ভারতের তেরঙ্গা পতাকা হাতে নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সেই মিছিলটির মূল উদ্দেশ্য ছিল তমলুক থানা দখল করা। সেই মিছিলে প্রায় ছয় হাজার মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের থানার দিকে অগ্রসর হতে দেখে পুলিশ তাঁদের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। প্রথম গুলিটি তাঁর বাঁ হাতে লাগে। তা সত্ত্বেও তিনি পতাকা হাতে এগিয়ে যেতে থাকেন। এরপর তাঁর ডান হাত লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন মাতঙ্গিনী তবু পতাকা ছাড়লেন না হাতের মুঠো থেকে। অপ্রতিরোধ্য মাতঙ্গিনীর কপাল লক্ষ্য করে পরের গুলিটি চালালেন বাঙালি পুলিশ অফিসার অনিল ভট্টাচার্য এবং মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

১৯৭৭ সালে প্রথম কোন মহিলা হিসেবে মাতঙ্গিনীর মূর্তি বসে কলকাতায়। এছাড়াও তমলুকের বানপুকুর পাড়ে যেখানে তিনি গুলিবিদ্ধ হন সেখানে তাঁর মূর্তি বসানো হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরে তাঁর নামে তৈরি হয়েছে শহীদ মাতঙ্গিনী হাজরা গার্লস কলেজ ফর উইমেন। ভারতের ডাক বিভাগ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০২ সালে মাতঙ্গিনী হাজরার ছবি দেওয়া ৫ টাকার স্ট্যাম্প প্রকাশ করে। দক্ষিণ কলকাতার হাজরা রোডের নামকরণ হয়েছে এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামের অনুসরণে। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে মাতঙ্গিনী হাজরার অবদান অনস্বীকার্য।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন