সববাংলায়

গী দ্য মপাসাঁ

বিশ্ব সাহিত্যের ভান্ডারকে যাঁরা নিজেদের অসামান্য সাহিত্যিক প্রতিভা দ্বারা সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন ফরাসি লেখক গী দ্য মপাসাঁ (Guy de Maupassant)। তিনি মূলত একজন কথাসাহিত্যিক। ছোটগল্প এবং উপন্যাসে ব্যস্ত জীবনচিত্রকে অসাধারণ উপস্থাপনার মাধ্যমে পাঠকের সামনে হাজির করেছিলেন তিনি। ১৮৭০ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লিখিত গল্পগুলিতে তিনি যুদ্ধের নিরর্থকতা এবং যুদ্ধ থেকে দূরবর্তী নিরীহ মানুষদের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন নিপুণ দক্ষতায়৷ তাঁর সাহিত্যকে প্রকৃতিবাদ এবং বাস্তববাদী ঘরানার অন্তর্ভুক্ত করা চলে। মপাসাঁ বিশেষত তাঁর ছোটগল্পের জন্য জগদ্বিখ্যাত। প্রায় তিনশোটি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন তিনি। এছাড়াও ভ্রমণের গ্রন্থও লিখেছিলেন। ‘বুলে দে সুইফ’, ‘দ্য নেকলেস’ ইত্যাদি রচনাগুলি মপাসাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির অন্তর্ভুক্ত।

১৮৫০ সালের ৫ আগস্ট ফ্রান্সের দিয়েপে কমিউনের ট্যুরভিল-সুর-আর্কসের অন্তর্গত শ্যাটেউ দে মিরোমেসনিয়েলে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে হেনরি রেনে আলবার্ট গী দ্য মপাসাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা গুস্তাভ দ্য মপাসাঁ ১৮৪৬ সালে লরে লে পোয়েটিভিনকে বিবাহ করেছিলেন। গুস্তাভ এবং পোয়েটিভিনের সন্তানদের মধ্যে মপাসাঁ ছিলেন বড় ছেলে। তাঁর অনুজরা হলেন ক্রেগ দ্য মপাসাঁ এবং হার্ভে দ্য মপাসাঁ।

গী দ্য মপাসাঁর যখন মাত্র এগারো বছর বয়স তখন তাঁর মা এবং বাবা পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তারপর থেকে মপাসাঁ এবং তাঁর অনুজেরা মায়ের তত্ত্বাবধানেই বেড়ে ওঠেন। লরে লে পোয়েটিভিন নিজে একজন স্বাধীনচেতা মহিলা ছিলেন এবং ধ্রুপদী সাহিত্যের বিশেষত শেক্সপিয়ারের একজন মুগ্ধ পাঠিকা ছিলেন। ফলে অল্প বয়স থেকেই সাহিত্য চর্চার এক আবহের মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ হয়েছিল মপাসাঁর।

তেরো বছর বয়স পর্যন্ত মপাসাঁ তাঁর মায়ের সঙ্গে নরম্যান্ডির ইট্রেটাতে আনন্দে দিনযাপন করেছিলেন। ভিলা দেস ভার্গুইসে সমুদ্র এবং বিলাসবহুল গ্রামাঞ্চলের মধ্যে মাছ ধরা-সহ আরও নানারকম শৌখিন ক্রিয়াকলাপ করে দিন কাটাতেন। সমুদ্র উপকূলের জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরতে যেতেন তিনি এমনকি কৃষকদের সঙ্গেও কথাবার্তা বলতেন। মায়ের প্রতি মপাসাঁর গভীর অনুরাগ ছিল।

যখন মপাসাঁর বয়স তেরো বছর হয়েছিল, তখন প্রথমে অল্প সময়ের জন্য ইভেটট সেমিনারীতে শাস্ত্রীয় অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। এই প্রাথমিক শিক্ষার সময় থেকেই ধর্মের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাবের জন্ম হয়েছিল। এই সময়ের কিছু পরে রচিত কিছু শ্লোকে ধর্মীয় পরিবেশ, আচার-অনুষ্ঠান এবং শৃঙ্খলার নিন্দা করেছিলেন তিনি। কিছুকাল পরে রুয়েনের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউশন লেরয়-পেটিট-এ প্রবেশ করেন পড়াশোনার জন্য।

এরপর ১৮৬৭ সালে জুনিয়র হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং এই সময়তেই মায়ের পীড়াপীড়িতে তিনি ক্রসেটে গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। মপাসাঁর ওপর এই ফ্লঁবেয়ার দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। পরের বছর মপাসাঁকে যেতে হয় রুয়েনের লাইসি-পিয়েরি-কর্নেইল স্কুলে। সেই স্কুলে থাকাকালীন নাটকে অংশগ্রহণ করেন তিনি এবং কবিতার প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। ১৮৬৮ সালের অক্টোবর মাসে যখন মপাসাঁর আঠারো বছর বয়স, তখন একদিন তিনি ইট্রেটাট উপকূলে বিখ্যাত কবি অ্যালগারনন চার্লস সুইনবার্নকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন।

১৮৭০ সালে কলেজ থেকে মপাসাঁর স্নাতক হওয়ার পর সেই বছরেই ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। সেই সময় তিনি একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৭১ সালে নরম্যান্ডি ছেড়ে তিনি চলে আসেন প্যারিসে এবং যোগ দেন নৌবাহিনী বিভাগে ক্লার্ক হিসেবে। দশ বছর এই কাজে অতিবাহিত করেন মপাসাঁ। এই সময় বিনোদন হিসেবে তিনি রবিবার এবং ছুটির দিনগুলিতে সেইন নদীতে বোটিং করতেন মনের আনন্দে।

গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় ছিল। ফ্লবেয়ার নিজেই মপাসাঁর ভিতরকার সাহিত্যিক প্রতিভাকে চিনতে পেরে তাকে যথাযথভাবে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। মপাসাঁর সাহিত্যিক অভিভাবকেরই দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি একপ্রকার। ফ্লবেয়ারই মপাসাঁকে সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যে আত্মপ্রকাশের পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন। ফ্লবেয়ারের বাড়িতেই মপাসাঁ বিখ্যাত সাহিত্যিক এমিল জোলা এবং রাশিয়ান ঔপন্যাসিক ইভান তুর্গেনেভের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। এভাবেই সাহিত্যে ন্যাচারালিজম এবং রিয়্যালিজমের যে ঘরানা তার প্রবক্তাদের সঙ্গে মিশে মপাসাঁও সেই স্রোতের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছিলেন।

১৮৭৮ সালে মপাসাঁকে পাবলিক ইনস্ট্রাকশন মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সেই সময় তিনি ‘লে ফিগারো, গিল ব্লাস’, ‘লে গৌলইস’ এবং ‘ল’ইকো দে প্যারিস’ ইত্যাদি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় কর্মের একটি অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং অবসর সময়ে সাহিত্যচর্চা করতেন।

১৮৮০ সালটির একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে মপাসাঁর সাহিত্যিক জীবনের নিরিখে। এই বছরেই তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘বুলে দে সুইফ’ প্রকাশিত হয়েছিল এবং তা সারস্বত সমাজের উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছিল। ফ্লবেয়ার এই গল্পটিকে একটি ‘মাস্টারপিস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন নির্দ্বিধায়। এই গল্পটির প্রেক্ষাপট ছিল সদ্য ঘটে যাওয়া ১৮৭০ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ। এরপর একের পর এক রচনা করেন ‘ডিউক্স অ্যামিস’, ‘মাদার স্যাভেজ’, ‘মাদমোয়াজেল ফিফি’র মত অত্যাশ্চর্য সব ছোটগল্প।

১৮৮১ সালে ‘লা মেসন টেলিয়ার’ নামে মপাসাঁর প্রথম ছোটগল্পের গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। ছোটগল্প লেখার পাশাপাশি উপন্যাস রচনার দিকেও ঝুঁকেছিলেন তিনি। তারই ফলস্বরূপ ১৮৮৩ সালে তিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘উনে ভি’ (আ ওম্যান’স লাইফ) রচনা সমাপ্ত করেছিলেন যার পঁচিশ হাজার কপি এক বছরে নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল। সাহিত্যিক প্রতিভা এভাবেই তাঁকে ক্রমে ধনবান করে তুলেছিল। ১৮৮৪ সালে তাঁর ‘লা মেরে সাউভেজ’ এবং ‘লা পারুরে’ (দ্য নেকলেস) নামক ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছিল। এই দুটির মধ্যে প্রথম গল্পটিতেও ১৮৭০ সালের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট রয়েছে। ‘লা পারুরে’ ছোটগল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘লে গৌলইস’ পত্রিকায়। ১৮৮৫ সালে মপাসাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বেল-আমি’ প্রকাশিত হয়েছিল। মাত্র চার মাসে এই উপন্যাসের ৩৭টি মুদ্রণ হয়েছিল। এটি প্যারিসের এক সাংবাদিকের আখ্যান।

মপাসাঁর সম্পাদক হাভার্ড তাঁকে আরও বেশি গল্প লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ফলে, এই সময়ে প্রচুর গল্প-উপন্যাস রচনা করতে থাকেন তিনি। ১৮৮৭ সালে মপাসাঁ ‘লে হরলা’ নামের একটি ভৌতিক গল্প পাঠকের দরবারে এনে হাজির করেন। গল্পটি জার্নাল আকারে লেখা হয়েছিল। সেই বছর ‘লে রোজিয়ার দে মাদাম হুসন’ নামে তাঁর একটি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৮৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘পিয়েরে এট জিন’ উপন্যাসটিকে অনেকে মপাসাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলে মনে করে থাকেন। এই উপন্যাসটিকে প্রকৃতিবাদী ঘরানার উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।

সমাজের প্রতি এক স্বাভাবিক ঘৃণাবশত মপাসাঁ একাকীত্বই পছন্দ করতেন বেশি। তিনি আলজেরিয়া, ইতালি, ইংল্যান্ড, ব্রিটানি, সিসিলি এবং অভারগেনে ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেন এবং প্রতিটি সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতাকে অত্যাশ্চর্য একেকটি ভ্রমণগ্রন্থের মধ্যে ধরে রেখেছিলেন। তাঁর একটি ভ্রমণ গ্রন্থের নাম হল ‘লা ভি ইরান্টে’। এই জীবন এবং অসাধারণ সাহিত্যিক প্রতিভার কারণে অন্যান্য অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ এবং ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। আলেকজান্ডার ডুমা জুনিয়র তাঁকে পুত্রের মতো স্নেহ করতেন। এছাড়াও বিখ্যাত ফরাসি ইতিহাসবিদ এবং দার্শনিক হিপোলাইট টাইনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি এবং দার্শনিক-ইতিহাসের প্রতি অনুগত হয়ে ওঠেন। চার্লস গাউনড, আলেকজান্ডার ডুমা, ফিলস, চার্লস গার্নিয়ার প্রমুখের সঙ্গে মপাসাঁও আইফেল টাওয়ার নির্মাণের বিরূদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন এবং এক প্রতিবাদের চিঠিতে উক্ত ব্যাক্তিদের সঙ্গে তিনি নিজেও স্বাক্ষর করেছিলেন।

মপাসাঁ বিভিন্ন সময়ে নানারকম ছদ্মনাম ব্যবহার করে সাহিত্য রচনা করেছিলেন। কখনও হয়েছেন ‘জোসেফ পুর্নিয়ার’, কখনও আবার ‘গী দ্য ভ্যালমন্ট’। ১৮৮১ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করেছিলেন ‘মাওফ্রিগনিউস’ ছদ্মনামটি। এছাড়াও আরও কয়েকটি ছদ্মনামে লিখেছিলেন তিনি।

মনে করা হয় যে, মপাসাঁ ১৮৮০ থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত জিসেল এস্টক নামে এক মহিলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন। পরবর্তীকালে জোসেফাইন লিটজেলম্যান নামে এক মহিলার সাথেও সম্পর্কে ছিলেন তিনি। যে তিন সন্তানের পিতা হলেন মপাসাঁ তাদের নাম, অনার লুসিয়েন লিটজেলম্যান, জিন লুসিয়েন লিটজেলম্যান এবং মার্থে মার্গুয়েরিট লিটজেলম্যান।

সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন মপাসাঁ। মনে করা হয় যৌবনেই এই রোগ সংক্রমিত হয়েছিল তাঁর শরীরে। পরবর্তীকালে মানসিক নানা সমস্যায় ভুগতে শুরু করেছিলেন তিনি। ১৮৯২ সালে নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করবারও চেষ্টা করেছিলেন। পরে তাঁকে প্যারিসের প্যাসিতে এসপ্রিট ব্লাঞ্চে নামক এক মানসিক চিকিৎসা সংস্থায় ভর্তি করা হয়েছিল। অবশেষে ১৮৯৩ সালের ৬ জুলাই সেই মানসিক চিকিৎসালয়েই মাত্র ৪২ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি সাহিত্যিক গী দ্য মপাসাঁর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading