সববাংলায়

বাঙালির বোরোলিন

বিভাগঃ ,

এমন কিছু কিছু পণ্য আছে, যেগুলি সুদূর অতীতকাল থেকে একইরকম জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এই বর্তমানকাল পর্যন্তও। আজকের বাজারেও তাদের চাহিদার দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়, এই পণ্যের আয়ু আরও অনেক দীর্ঘ। পুরোনো দিনের এইসমস্ত পণ্যগুলিকে কেবলই একটি ভাল ও উপকারী পণ্য হিসেবেই গুরুত্ব দেওয়া হয় না, এরা মানুষের গৌরবময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ হিসেবে মর্যাদা পায়। এমনই একটি বহু প্রচলিত এবং জনপ্রিয় পণ্য হল বোরোলিন (Boroline), যেটি মূলত একটি অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম। ১৯২৯ সালে ভারতবর্ষ জুড়ে যখন স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছে, তখন এক বাঙালি এই স্বদেশী পণ্যটিকে যেন ভারতবাসীর আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এই পণ্যটির সঙ্গে ক্রমে জড়িয়ে গিয়েছে বহু খ্যাতনামা বাঙালির নামও। লোশন, ক্রিম ইত্যাদি অনেক কিছুরই উদ্ভব ঘটেছে যত দিন গেছে, কিন্তু বাংলার ঘরে ঘরে বোরোলিনের মর্যাদা আজও অমলিন।

বোরোলিন মূলত একটি সুগন্ধী অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম। বোরোলিন নামটির উদ্ভব এই ক্রিমে ব্যবহৃত উপকরণগুলির মধ্যেই নিহিত রয়েছে। এতে ব্যবহৃত বোরিক পাউডার থেকে ‘বোরো’ কথাটি এসেছে এবং ‘ওলিন’ হল ল্যাটিন শব্দ ‘ওলিয়াম’-এর বিকল্প, যার অর্থ হল তেল। এই ক্রিমটি আসলে কিছু প্রয়োজনীয় তৈল, মোম এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিসেপ্টিক উপাদান বোরিক পাউডার ও জিঙ্ক অক্সাইডের মিশ্রণে তৈরি। এই কারণে বোরোলিন চামড়ার ওপর কাটাছেঁড়ায় ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এমনকি শীতকালে বা অন্য কোন কারণে চামড়া খসখসে হয়ে গেলে, টান ধরে ফেটে গেলে এই বোরোলিন অব্যর্থ ওষুধের মতো কাজ দেয়। তাছাড়াও সূর্যের তাপে চামড়া জ্বালা করলে, বিষাক্ত কিছুর প্রভাবে চামড়ায় র‍্যাশ বেরোলেও বোরোলিন খুবই উপকারী।

বোরোলিনের লোগো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল একটি হাতি। কেন হাতিকেই লোগো হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল তার পিছনেও রয়েছে একটি দর্শন। আসলে এখানে হাতির চিত্র হল স্থায়িত্ব এবং শক্তির প্রতীক। তবে হাতির সঙ্গে ভগবান গণেশেরও একটি সংযোগ রয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সিদ্ধিদাতা গণেশ হলেন একজন প্রধান উপাস্য দেবতা। এতকিছু ভেবেই বোরোলিনে হাতির ছবি রাখাই স্থির হয়েছিল।

এই বোরোলিনের উদ্ভবের পিছনের ইতিহাসটুকুর দিকে একবার তাকানো যাক। ব্রিটিশ পদানত ভারত তখন জেগে উঠেছিল। চতুর্দিকে স্বদেশী আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তখন। ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ততদিনে মহাত্মা গান্ধীরও আবির্ভাব ঘটে গেছে। গান্ধীজীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন ভারতবাসীকে প্রতিবাদের অন্য এক দিশা যেমন দেখিয়েছে তেমনি চৌরিচৌরার ঘটনায় সেই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে চুড়ান্তভাবে। মহাত্মা তাতে দমে যাননি। আবারও নতুন উদ্যমে আইন অমান্য আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন পুরোদমে। এরই মধ্যে পাশাপাশি চরমপন্থাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। গুপ্তহত্যা, অস্ত্রের দ্বারা ব্রিটিশনিধন চলছিল সমান তালে। সেইসময় গৌরমোহন দত্ত নামে এক বাঙালি ব্যবসায়ী যিনি মূলত বিদেশি পণ্য আমদানি করতেন, তিনি উপলব্ধি করেছিলেন দেশকে আর্থিক দিক থেকে স্বনির্ভর করতে পারলে তা এই জাগরণের লড়াইকে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করতে পারবে। এই চিন্তাকেই বাস্তবে রূপায়িত করতে তিনি নেমে পড়েন কোমর বেঁধে। ঠিক করেন এমন এক পণ্য বানাতে হবে যা বিদেশি দ্রব্যের সঙ্গে সেয়ানে-সেয়ানে টক্কর দিতে পারে। এখানে আরও একটি ব্যাপার উল্লেখ্য, ততদিনে বিদেশি পণ্য বয়কটের চিত্রও দেখেছে বঙ্গবাসী। এমনকি বিদেশি বস্ত্র ছেড়ে দেশীয় কাপড় ব্যবহারের আবেদন নিয়ে বিখ্যাত গীতিকার রজনীকান্ত সেন গানও বেঁধেছিলেন ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’। এই পুরোমাত্রায় আত্মনির্ভর ও স্বদেশী হয়ে ওঠার তাগিদ সঞ্চারিত হয়েছিল পরবর্তী সংগ্রামীদের মধ্যেও এবং গৌরমোহন দত্তের মতো মানুষেরা স্বদেশী দ্রব্যের বাজারকে বাড়িয়ে বিদেশিদের আর্থিক দিক থেকে পরাস্ত করার কাজে নেমেছিলেন। তবে কাজটা অতখানি সহজ ছিল না। অনেকেই তাঁর এই কাজের বিরোধিতা করলেও তিনি দমে যাননি এবং থেমে থাকেননি। এই স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে নিজের দেশকে স্বনির্ভর করে তোলার স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেই এগিয়ে চলেন তিনি। গৌরমোহন দত্ত ঔষধ তৈরির কথা চিন্তা করলেন এবং গড়ে তুললেন জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস। অবশেষে ১৯২৯ সালে বাংলার বাজারে সবুজ রঙের টিউবে একটি ঔষধিপণ্য ছড়িয়ে যায়, যার প্যাকেটের উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘বোরোলিন’।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট অর্থাৎ ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আগের দিন ক্যালকাটা সংবাদপত্রে একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল যে, যারা বোরোলিন চাইবে শহরের দুটি বিশেষ আউটলেট থেকে তাদেরকে ১৫ আগস্ট ফ্রীতে বোরোলিন দেওয়া হবে। এই ঘোষণা যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছিল পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অংশ ছিল বোরোলিন। স্বাধীনতার দিনে গৌরমোহনবাবু প্রায় এক লক্ষ বোরোলিন বিনামূল্যে বিতরণ করেছিলেন।

বাঙালি ব্যবসা বোঝে না, সফলভাবে ব্যবসা করতে অক্ষম, এমন অনেক অপবাদ বহুদিন থেকেই প্রচলিত রয়েছে বাঙালির নামে। কিন্তু কলকাতার বণিক সমাজেরই একজন বাঙালি ব্যবসায়ী গৌরমোহন দত্ত যেন বাঙালির দীর্ঘদিনের এই অপবাদ কিঞ্চিৎ ঘুচিয়ে দিতে পেরেছিলেন। বোরোলিনের জনপ্রিয়তা নিঃসন্দেহে যে-কোনো বিদেশি কোম্পানির ক্রিমকে দশ গোল দিতে সক্ষম, তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। বাঙালির ব্যবসায় নবজাগরণের প্রতীক বলা চলে বোরোলিনকে।

বোরোলিনের এই জনপ্রিয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেড়ে গিয়েছিল যখন বাঙালির প্রিয় শিল্পীরা এই পণ্যটির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়-এর মতো দিগগজ বাঙালি ব্যক্তিত্বরাও এই বোরোলিন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন।  বোরোলিনের জিঙ্গেলটির জন্য যে গান রচনা করা হয়েছিল তার গীতিকার ছিলেন সঙ্গীতজগতের বিশিষ্ট নাম পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং গেয়েছিলেন বিখ্যাত গায়িকা শ্রাবন্তী মজুমদার। জিঙ্গেলটির মিউজিক কম্পোজ করেছিলেন ভি.বালসারা। এই জিঙ্গেলের একটি লাইন ‘সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম বোরোলিন’ বাঙালির মুখে মুখে ঘোরে আজও। অনেক পরে আরেক কৃতি বাঙালি পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ বোরোলিনের ট্যাগলাইন হিসেবে লিখেছিলেন ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’। তবে অনেকে মনে করেন জে. ওয়াল্টার টমসন নামক বিজ্ঞাপন সংস্থা এটি লিখেছে। তবে যেই লিখুন না কেন, এই ট্যাগলাইনটি থেকেই বাঙালির কাছে আজও বোরোলিনের জনপ্রিয়তা যে কতটা তার আঁচ পাওয়া যায়। এছাড়াও এই ঋতুপর্ণ ঘোষ-ই বোরোলিন-এর জন্য আরও একটি যে ট্যাগলাইন লিখেছিলেন, সেটি হল, ‘জীবনের নানা ওঠাপড়া যেন সহজে গায়ে না লাগে’। বোরোলিনকে জীবন সংগ্রামে সবচেয়ে ভরসাযোগ্য একটি পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। বর্তমানে এই বোরোলিনের অ্যাম্বাসাডার হলেন বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিদ্যা বালান।

বোরোলিনের জনপ্রিয়তা বুঝতে পারা যায় যখন দেখা যায় যে, ২০১৫-১৬ সালের আর্থিক বর্ষে জিডি ফার্মাসিউটিক্যালসের বার্ষিক টার্ন ওভার যে ১৫০ কোটি টাকা ছিল, তার ৬০ শতাংশই এসেছিল বোরোলিন থেকে। বোরোলিনকে ভারতের ‘মোস্ট অ্যাডমায়ার্ড ব্র্যান্ড’-এর খেতাব দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও ২০০৩ সাল থেকে একটানা ইন্ডিয়ান সুপার ব্র্যান্ডের খেতাবও পেয়ে আসছে এই কোম্পানিটি। অতএব বুঝতেই পারা যাচ্ছে আজ প্রায় একশো ছুঁইছুঁই (৯৪ বছর) একটি পণ্য কীভাবে নিজের সম্মান, মর্যাদা এবং জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রমাণ করে দিয়েছে বাঙালিরও সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠবার পর্যাপ্ত ক্ষমতা রয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading