ইতিহাস

এক জার্মান যিনি হিটলারকে অবজ্ঞা করার সাহস দেখিয়েছিলেন

ছবিটা ১৯৩৬ সালের। পুরনো মলিন সাদা-কালো ছবি। অথচ তার মধ্যেই এককভাবে ভাস্বর হয়েছেন এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ। শত-সহস্র হাতের বাহু সামনে প্রসারিত, সামান্য উঁচুতে উঠে সেই সব হাত ‘হাইল হিটলার!’ ধ্বনিতে সম্ভাষণ জানাচ্ছে জার্মানির একনায়ক ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলারকে। আর সেইসব অনুগামীদের মধ্যে হাত নামিয়ে নির্লিপ্তভাবে কঠোর মুখভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন সেই ব্যক্তি – একাকী অকুতোভয় এক জার্মান। নাৎসিবাহিনীর সদস্য হয়েও যিনি সেদিন নাৎসি নেতা হিটলারের প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করেননি। ইতিহাসবিখ্যাত হয়ে আছে সেই সাদা-কালো ছবি আর সেই ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে আছে একদা নাৎসি সমর্থক সেই একাকী অকুতোভয় জার্মান অগাস্ট ল্যাণ্ডমেসার -এর নাম যিনি হিটলারকে অবজ্ঞা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন।

১৯৩৬ সালের সেই ছবিতেই বিশ্ব তাঁকে চিনেছে, নাৎসি কায়দায় হিটলারকে অভিবাদন জানাননি তিনি। কিন্তু একসময় কিশোর বয়সের শুরুতে ১৯৩১ সালে নিছক চাকরি পাওয়ার সুবিধে হবে ভেবেই নাৎসি পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন অগাস্ট ল্যাণ্ডমেসার। ১৯১০ সালে তাঁর জন্ম হয় জার্মানির মুরেজে। নাৎসি ক্ষমতায়ন এবং হিটলারের প্রবল-প্রতাপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ছোটোবেলা থেকেই। নাৎসি পার্টিই তখন জার্মানিতে একমাত্র প্রভুত্বকারী দল, ফলে সেখানে কাজ করতে করতে নাৎসি-মহলে তাঁর বেশ সুনাম হয়েছিল। কিন্তু ১৯৩৬ সালের একটি অনুষ্ঠানের প্রামাণ্য ঐ ছবি তাঁর জীবনটাই বদলে দিয়েছিল। কীভাবে? চলুন জেনে নিই।

নাৎসি পার্টিতে কাজ করতে করতেই ১৯৩৩ সাল নাগাদ জনৈক ইহুদি মহিলা ইরমা একলারের প্রেমে পড়েন ল্যাণ্ডমেসার এবং তীব্র ভালোবাসা থেকে ১৯৩৫ সালে তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। যথাসময়ে তাদের বিবাহের দিন স্থির হয়। কিন্তু এর পরিণাম খুব একটা ভালো হয়নি। একটি ইহুদি নারীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে থাকার দরুণ নাৎসি পার্টি থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। ইরমা একলার এবং অগাস্ট ল্যাণ্ডমেসার ঠিক করলেন তাঁরা হামবুর্গে বিবাহের জন্য আবেদন করবেন কিন্তু ইউনিয়নে সেসময় নতুন ন্যুরেমবার্গ আইন পাশ হওয়ার দরুণ বিবাহের স্বীকৃতি মিললো না। চারিদিকে হিটলারি সন্ত্রাস এবং গোয়েব্‌লসের নজরদারি। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিবাহ না করে উভয়েই একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন এবং ১৯৩৫ সালের অক্টোবর মাসে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে যার নাম দেন তারা ইরগ্রিড। এর পরের বছরই অগাস্ট ল্যাণ্ডমেসারের জীবনের এক ফ্রেমবন্দি সাদা-কালো দিন, অকুতোভয় জার্মান নাগরিকের প্রতিবাদ জ্ঞাপনের দিন। ১৯৩৬ সালের ১৩ জুন হামবুর্গের ব্লোম + ভস্‌ জাহাজ-বন্দরে ২৯৫ ফুট দীর্ঘ একটি নৌকোর (Sailing Vessel) উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল। সেই অনুষ্ঠানেই বার্ক হর্স্ট ওয়েসেল নামের সেই নৌকার উদ্বোধনের মাধ্যমে নাৎসি পার্টির প্রচার চলে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ডেপুটি ফুয়েরার রুডলফ হেস এবং জার্মানির একনায়ক নেতা অ্যাডলফ হিটলার। উৎসাহে-আগ্রহে সমস্ত ভিড়ের মধ্য থেকে নাৎসি অভিবাদনের কায়দায় শয়ে শয়ে হাত এগিয়ে উঠে আসছিল শূন্যের দিকে। একজন ছাড়া। অগাস্ট ল্যাণ্ডমেসার। ২৬ বছর বয়সী ল্যাণ্ডমেসার একেবারে প্রতিবাদী ভঙ্গিতে হাত দুটিকে স্পষ্টভাবে একটা অপরটার উপর ক্রসের ভঙ্গিতে রেখে দাঁড়িয়েছিলেন। মনে রাখতে হবে, এর আগের বছরই তিনি নাৎসি পার্টি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। হয়তো সেই ক্ষোভেই হিটলারকে অবজ্ঞা করার সাহস দেখিয়েছিলেন ল্যাণ্ডমেসার।

১৯৩৭ সালে নাৎসি-অধিকৃত জার্মানি ছেড়ে পরিবারকে নিয়ে তিনি ডেনমার্কে পালিয়ে যেতে চাইলে সীমান্তরক্ষীদের হাতে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ন্যুরেমবার্গ আইনের ভিত্তিতে জাতিগত অসম্মান প্রদর্শনের ধারায় কারাবাসের দণ্ড দেওয়া হয়। এক বছর পরেই ১৯৩৮ সালে যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, কিন্তু ইরমা একলারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বিষয়ে তাঁকে পুনরায় সচেতন ও সতর্ক করে দেওয়া হয়। কিন্তু ল্যাণ্ডমেসার কিছুতেই চাননি তাঁর সন্তানের মাকে পরিত্যাগ করতে, নাৎসি উপদেশ তিনি তাই অগ্রাহ্য করলেন এবং তার ফলে ১৯৩৮ সালে আবার গ্রেপ্তার হলেন। এবারে তিন বছরের জন্য বর্জারমুর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি হন তিনি। নিজের সন্তান, প্রাণপ্রিয় স্ত্রী কাউকেই আর তিনি দেখতে পাবেন না। এদিকে জার্মানির গুপ্ত পুলিশবাহিনী একলারকেও গ্রেপ্তার করে। ইরমা একলার তখন সাত মাসের গর্ভবতী। কনসেণ্ট্রেশন ক্যাম্পের মধ্যেই তিনি প্রসব করেন এবং তাঁদের দ্বিতীয় কন্যা ইরিনের জন্ম হয় ফুহ্‌লসবুতেল বন্দিশালায়। পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ওরিয়েনবার্গ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে এবং সেখান থেকে প্রথমে লিকটেনবার্গ ক্যাম্প ও পরে র‍্যাভেনশ্‌ব্রুকের মহিলাদের পৃথক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় ইরমা একলারকে। মনে করা হয় ১৯৪২ সালে ইরমা একলারকে বার্নবার্গে নাৎসি ইউথানেসিয়া সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে আরো চোদ্দো হাজার ইহুদির সঙ্গে তাঁকেও গ্যাস চেম্বারে মেরে ফেলা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে যুদ্ধ শেষের গবেষনা এবং তদন্তের ফলে জানা যায় ১৯৪২ সালের ২৮ এপ্রিল মারা যান ইরমা একলার। তাঁর দুই কন্যা ইরগ্রিড ও ইরিনকে প্রথমে শহরের একটি অনাথ-আশ্রমে পাঠানো হয়। সেখানে কিছুদিন থাকার পরে ইরগ্রিডকে তাঁর দিদার কাছে থাকতে অনুমতি দেওয়া হয় এবং ১৯৪১ সাল নাগাদ ইরিনকে পাঠানো হয় পালক বাবা-মায়ের কাছে। দিদার মৃত্যুর পরে ইরগ্রিডও ইরিনের সঙ্গে একত্রে থাকতে শুরু করে।

জেল থেকে বেবোবার পরে কিছুদিন ল্যাণ্ডমেসার ‘হলেজ কোম্পানি পুস্তে’-এ জমাদারের কাজ করতেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৯৯৯তম ফোর্ট ইনফ্যাণ্ট্রি ব্যাটেলিয়ানের হয়ে ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধে প্রাণ হারান অগাস্ট ল্যাণ্ডমেসার।

নাৎসি-সমর্থক হয়েও ১৯৩৬-এর বিপুল সমাবেশে একাকী হিটলারকে অবজ্ঞা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন যিনি, সেই অগাস্ট ল্যাণ্ডমেসারের ব্যক্তিগত জীবনটাও নাৎসিতন্ত্রের কাঁটাতারে রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর প্রেয়সী, তাঁর পরিবার, সন্তান কোনোকিছুই দেখে যেতে পারেননি তিনি। অগাস্টও মারা গিয়েছেন, ইরমাকেও হত্যা করেছে নাৎসিরা। অপূর্ণ প্রেমের মায়ায় দুজনে বদ্ধ থাকলেও তাঁদের দেখা হয়নি আর কখনোই। জ্যেষ্ঠ কন্যা ইরগ্রিড অগাস্টকে দেখলেও, ইরিনের স্মৃতিতে সেটুকুও নেই। এমনই হতভাগ্য একাকী ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল অগাস্ট ল্যাণ্ডমেসারের জীবন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।