সববাংলায়

সুনন্দা পুষ্কর মৃত্যুরহস্য

অভিজাত মহলে রহস্যমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অসংখ্য। তার মধ্যে একাধিক মৃত্যুর নিশ্চিত কূলকিনারা করা সম্ভব হয়নি পুলিশ কিংবা তদন্ত বিভাগের পক্ষে। সেইসব অমীমাংসিত মৃত্যুরহস্যকে কেন্দ্র করে নানারকম জল্পনা ও তত্ত্ব উপস্থাপনের অভাব ঘটেনি। সুনন্দা পুষ্কর মৃত্যুরহস্যটিও (Sunanda Puskar Death Mystery) সেই অমীমাংসিত রহস্যের তালিকা অন্তর্ভুক্ত। বিখ্যাত ভারতীয় কূটনীতিক, লেখক ও রাজনীতিবিদ শশী থারুরের স্ত্রী এবং রাঁদেভু স্পোর্টস ওয়ার্ড-এর সহ-মালিক সুনন্দা পুষ্করের আকস্মিক মৃত্যু মানুষকে কৌতুহলী করে তুলেছিল। এই মৃত্যুকে ঘিরে আরও বেশি সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয়েছিল তার কারণ মৃত্যুর একদিন পূর্বেই টুইটারে ঘটেছিল ত্রিকোণ সম্পর্কের ইঙ্গিতপূর্ণ বাগবিতন্ডা। তার জের ফেসবুক পোস্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তের পরই মৃত্যুটিকে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। এমনকি শশী থারুরকেও সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছিল। যদিও অবশেষে তিনি মুক্তি পেয়ে গেলেও তাঁর স্ত্রী সুনন্দা পুষ্করের মৃত্যুটি আজও রহস্যাবৃত রয়ে গেছে এবং শশী থারুরের জীবনে তা যেন লেগে রয়েছে কলঙ্কের মতোই।

২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি নয়াদিল্লির চাণক্যপুরীতে অবস্থিত লীলা প্যালেস হোটেলের ৩৪৫ নম্বর ঘরে সুনন্দা পুষ্করের মৃতদেহ পাওয়া যায়। নিজেদের বাড়িতে সেই সময় সংস্কার এবং রঙের কাজ চলছিল বলে শশী থারুর এবং তাঁর স্ত্রী সুনন্দা পুষ্কর তখন ওই হোটেলে অস্থায়ীভাবে বাস করছিলেন। সন্ধ্যাবেলায় যখন ঘুম থেকে উঠছিলেন না সুনন্দা তখন তাঁকে ডাকতে গিয়ে শশী থারুর স্ত্রীকে মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। সঙ্গে সঙ্গেই থারুর দিল্লি পুলিশকে জানান এবং পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে তড়িঘড়ি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেয়।

সুনন্দা পুষ্কর মৃত্যুরহস্য তদন্তের গভীরে যাওয়ার আগে এই ঘটনার পূর্বে ঘটে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দিকে তাকানো যাক, যার সঙ্গে এই মৃত্যুর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে বলে সন্দেহ হতে পারে।

মৃত্যুর একদিন আগে অর্থাৎ ১৫ জানুয়ারি শশী থারুরকে এক পাকিস্তানি সাংবাদিক মেহের তারারের পাঠানো কিছু অন্তরঙ্গ মেসেজ থারুরের টুইটার অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হয়েছিল। এই পোস্ট স্বাভাবিকভাবেই জনতার মধ্যে একটা কৌতুহল ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। মেসেজগুলিতে থারুরের প্রতি তারারের ভালবাসার ইঙ্গিত অনেকটাই স্পষ্ট ছিল। সেইসময় এই ঘটনার গুরুত্বকে ছোট করে দেওয়ার জন্য তারার জানিয়েছিলেন যে, তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে নেওয়া হয়েছে। তবে সুনন্দা পরে জানিয়ে দেন যে তারার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি বরং তিনি নিজেই তারারের মেসেজগুলি জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিয়েছেন। সুনন্দা এমনকি তারারকে আইএসআই এজেন্ট বলেও অভিযোগ করেছিলেন। মেহের আবার এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে অযৌক্তিক বলেছিলেন। এর কয়েক ঘন্টা পরে টুইটগুলি সুনন্দার টাইমলাইন থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। পরে নিজেই তিনি বলেন এই বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনের বছরে খুব গভীরে তিনি যেতে চান না। পরদিন অর্থাৎ ১৬ তারিখ শশী থারুর তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে সুনন্দা ও শশী থারুরের যৌথ বিবৃতি (‘Joint statement by Sunanda and Shashi Tharoor’) শিরোনামে একটি পোস্ট দেন, যার মূল কথা হল তাঁরা দুজন সুখী দম্পতি এবং টুইটারের মন্তব্যগুলিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই পোস্টে আরও বলা হয় যে, সুনন্দা থারুরের লুপাস এরিথেমাটোসাস (Lupus erythematosus) নামে একটি মারাত্মক রোগের চিকিৎসা চলছিল।

এই ঘটনার পরে ১৭ তারিখ সুনন্দা পুষ্করের আকস্মিক মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে সুনন্দা আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হলেও দিন দুয়েক পর এইমস-এর ডাক্তাররা ময়নাতদন্তের পরে জানিয়েছিলেন যে, মৃত্যুটি অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। সুনন্দার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে আবার তাঁর পেটে অ্যাংজাইটি প্রতিরোধক আলপ্রোজোলামেরও চিহ্ন মিলেছে। প্রাথমিকভাবে এও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে সম্ভবত সিডেটিভ এবং অন্যান্য শক্তিশালী ওষুধ ও অ্যালকোহলের সংমিশ্রণে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। মার্চ মাসে সুনন্দা পুষ্করের ভিসেরা রিপোর্ট সামনে আসে। তাতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধের বিষক্রিয়াকেই দায়ি করা হয়েছিল। রিপোর্টে অ্যালপ্রাজোলাম এবং এক্সেড্রিন নামক দুটি ওষুধ যে নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে সুনন্দার শরীরে পাওয়া গেছে তার উল্লেখ রয়েছে। যদিও ওষুধের মাত্রা ঠিক কতটা ছিল রিপোর্টটি সেই বিষয়ে কোন আলোকপাত করেনি। সেজন্যই সুনন্দা অতিরিক্ত ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল নাকি তার মৃত্যুর অন্য কারণ রয়েছে সেবিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। পুলিশ এইসব কারণেই সেন্ট্রাল ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি (সিএফএসএল)-এর এই রিপোর্টে কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এখানে আরও একটি তথ্য উল্লেখের প্রয়োজন। মৃত্যুর ১২ ঘন্টা আগে এক অনুসারীকে ট্যুইট করে সুনন্দা জানান যে কেআইএমএস হাসপাতালে তাঁর বেশ কিছু রোগ ধরা পড়েছে এবং তিনি জীবন সম্পর্কে অনিশ্চিত। শেষে এও লিখেছিলেন যে তিনি হাসতে হাসতেই চলে যেতে পারেন। এই ট্যুইটের দিকে তাকালে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা মনে আসে কিন্তু ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারদের কথাই সেই অনুমানে বাধ সাধে।

এরপর আরও বেশি উত্তেজনা তৈরি হয় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন এইমস-এর একজন ডাক্তার সুধীর গুপ্ত সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবুনাল-এর কাছে জমা দেওয়া একটি হলফনামায় জানান যে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে দুজন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেছিলেন এবং কিছু ব্যক্তির মনোমত রিপোর্টকে প্রভাবিত করা হয়েছিল। এই অভিযোগ স্বভাবতই জনমানসে চাঞ্চল্য তৈরি করে, যদিও শশী থারুর এ-নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি সেসময়। ১০ অক্টোবরের একটি রিপোর্টে সুনন্দা পুষ্করের মৃত্যুর তদন্তকারী মেডিক্যাল টিম এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে মৃত্যুর কারণ বিষক্রিয়া।

এরই মধ্যে সুনন্দার মৃত্যুর পাঁচ সপ্তাহের মাথায় বিজেপির রাজনীতিবিদ সুব্রহ্মণ্যম স্বামী এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেন শশী থারুরের বিরুদ্ধে। সুব্রহ্মণ্য স্বামীর মতে সুনন্দা সম্ভবত শশী থারুরের বিষয়ে গোপন কিছু জানতে পেরেছিলেন যা প্রকাশ্যে এলে নাকি থারুরের রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে যেত। সেজন্য শশী থারুর নিজেই নাকি ভাড়াটে খুনি দিয়ে সুনন্দাকে হত্যা করে। এমনকি তিনি এও দাবি করেছেন যে পোলোনিয়াম নামের এক বিষাক্ত বিষ সুনন্দার ওপর প্রয়োগ করা হয়েছিল।

সুনন্দার দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের রিপোর্টটি সুব্রহ্মণ্যমের এই অভিযোগকেই কিন্তু জোরালো করে তুলেছিল। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে দ্বিতীয় রিপোর্টে উল্লেখ ছিল যে সুনন্দার শরীরে ১৫টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং দেখা গেছে একটি সূক্ষ্ম দাগ যা ছুঁচ ফোটানোর ফলেই সম্ভবত সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয় এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বিজেপি সরকার পুনরায় বিষয়টিকে খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেয় এইমস-এর ফরেন্সিক বিভাগকে। ২৯ ডিসেম্বর জমা পড়া সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে খুনের মামলা দায়ের করে। শশী থারুর, তাঁর ব্যক্তিগত সচিব-সহ চরও কয়েকজনকে জেরা করার পরিকল্পনা করে পুলিশ। তবে আদালত সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর দায়ের করা জনস্বার্থ মামলাটিকে রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত বলে অভিহিত করে বাতিল করে দিয়েছিল।
এরই মধ্যে ২০১৫ সালের নভেম্বরে এফবিআই ল্যাবের প্রাথমিক রিপোর্টে পোলোনিয়াম বা অন্য কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিকিরণে সুনন্দার মৃত্যুর সম্ভাবনাকে খারিজ করে দেওয়া হয়। তবে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে এফবিআই-এর বিস্তারিত রিপোর্টে দাবি করা হয় যে, বিষক্রিয়াতেই সুনন্দার মৃত্যু ঘটেছিল।

২০১৮ সালের ১৫ মে দিল্লি পুলিশ কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরের বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনে। প্রায় ৩০০০ পৃষ্ঠার চার্জশীটে সুনন্দা পুষ্করের ওপর থারুরের নিষ্ঠুরতারও অভিযোগ করা হয়। ভারতীয় দন্ডবিধির ৪৯৮-এ এবং ৩০৬ ধারায় অভিযোগ দায়ের করে পুলিশ। অবশেষে ২০২১ সালে আদালত সুনন্দা পুষ্কর মৃত্যু মামলার সমস্ত অভিযোগ থেকে শশী থারুরকে মুক্তি দিয়েছিল।

এতরকম রিপোর্ট, এত তদন্ত, সন্দেহ, জল্পনা যে সুনন্দা পুষ্কর মৃত্যুরহস্যকে ঘিরে, তা আজও অমীমাংসিতই থেকে গেল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading