শবরীমালা মন্দির (Sabarimala Temple) হল ভারতের অন্যতম এক বিখ্যাত হিন্দু মন্দির। ভারতের কেরালা রাজ্যের পতনমতিট্টা (Pathanamthitta) জেলার রান্নি-পেরুনাড় (Ranni-Perunad) গ্রামের কাছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় রয়েছে এই মন্দিরটি। মন্দিরের আরাধ্য দেবতা হলেন ভগবান আয়াপ্পান (Ayappan), যিনি শিব ও মোহিনীরূপী বিষ্ণুর সন্তান।
আয়াপ্পা দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন – আয়াপ্পান, ধর্মষষ্ঠ, ষষ্ঠ, মণিকন্দন, হরিহরপুত্র প্রভৃতি। কেরালা ছাড়াও তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানাসহ সমগ্র দক্ষিণ ভারতে ধুমধাম করে আয়াপ্পার পূজা করা হয়। এমনকি শ্রীলঙ্কাতেও এই দেবতার পূজার প্রচলন আছে। ভারতবর্ষে প্রচলিত বৈষ্ণব, শাক্ত ও শৈব ধর্মের মিলন দেখতে পাওয়া যায় এই মন্দিরে। শবরীমালা মন্দির হল বিশ্বের সেই সমস্ত তীর্থক্ষেত্রগুলির মধ্যে একটি যেখানে প্রতি বছর প্রায় লক্ষাধিক ভক্ত আয়াপ্পার দর্শন করতে আসেন। ২০১৮ সালের আগে পর্যন্ত মন্দিরে ১০ থেকে ৫০ বছরের মেয়েদের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ ছিল, তবে বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর সব বয়সের মহিলারাই এই মন্দিরে প্রবেশ করতে পারলেও সকল ভক্ত সানন্দে এই রায় গ্রহণ করতে পারেননি। এছাড়া এই মন্দিরে প্রবেশের জন্য বর্ণ ও জাতপাতের বিচার করা হয় না, সব ভক্তরাই আয়াপ্পার দর্শন করতে পারেন। এই মন্দিরটি আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি তার চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও বিখ্যাত। এককথায় বলা যায় যে, এই মন্দিরে ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে।
শবরীমালা শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল – ‘শবরীর পাহাড়’। রামায়ণের কাহিনি অনুসারে রামের এক উপজাতি ভক্ত দীর্ঘ অপেক্ষার পর শবরীমালাতে রামের দর্শন পেয়েছিলেন, আর তারপর তাঁর নাম অনুসারেই ওই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়। কিংবদন্তি অনুসারে এখানে নাকি তপস্যারত আয়াপ্পানের সঙ্গে রামচন্দ্রের সাক্ষাৎ হয়। তবে শবরীমালা মন্দির প্রতিষ্ঠার পিছনে সাধারণ যে গল্প প্রচলিত আছে তা হল – আয়াপ্পা অনুসারীদের জন্য লেখা ‘ভূতনাথোপখ্যায়নম’ গ্রন্থ অনুসারে সূত ঋষি আয়াপ্পার জন্ম কাহিনি শুনিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করার পর মহিষাসুরের বোন মহিষী দেবতাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে, আর তাই সে ব্রহ্মার তপস্যা শুরু করে। এরপর ব্রহ্মা তার তপস্যায় খুশি হয়ে তাকে অজেয় হওয়ার আশীর্বাদ দেন, তবে তিনি এও বলেন যে, কেবল মাত্র দুটি পুরুষের গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানই একমাত্র মহিষীকে বধ করতে পারবে। এইভাবে একপ্রকার অমরত্বের বর লাভের পর মহিষী দেবতাদের উপর অত্যাচার শুরু করে আর তখন তাঁরা ভয় পেয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। সেই সময় বিষ্ণু মোহিনী রূপ ধারণ করেন আর দেবতা শিব ও মোহিনীর মিলনের ফলে জন্ম হয় শাস্ত বা মনিকন্দনের। এই মণিকন্দনকে আয়াপ্পার অবতার বলে মনে করা হয়। এই মণিকন্দনের জন্মের পর দক্ষিণ ভারতের পম্পা নদীর তীরে তাঁকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। এরপর পান্ডালাম বা পান্থালাম রাজবংশের নিঃসন্তান রাজা রাজশেখর (Rajasekhara) ওই দেবশিশুকে খুঁজে পান। কিছুদিন পর রাজা একটি পুত্র সন্তান লাভ করলেও মণিকন্দনকে তিনি নিজের সন্তানের মত পালন করেন। কিন্তু রাণী মণিকন্দনকে একেবারে অপছন্দ করতেন, আর তাই তিনি মণিকন্দনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। রাণী নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে মিথ্যা কথা প্রচার করেন এবং বলেন যে একমাত্র বাঘের দুধ খেয়ে তবেই তাঁর চিকিৎসা করা সম্ভব হবে। এইজন্য বারো বছরের মণিকন্দন তার দত্তক মাকে সুস্থ করার জন্য বাঘের দুধ আনতে যায় এবং সেই সময় বনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় মহিষীর সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত করে। মহিষীর মৃত্যুতে দেবতারা খুশি হন আর তাই স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র বাঘের রূপ ধারণ করে মণিকন্দনকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে মণিকন্দন নিজের স্বরূপ সম্পর্কে বুঝতে পারে ও দেবলোকে ফিরে যেতে উদ্যত হয়। সেইসময় মনিকন্দন মন্দির নির্মাণের জন্য একটি তীর নিক্ষেপ করে আর ওই তীর যে স্থানে গিয়ে পড়ে সেখানেই এই শবরীমালা মন্দির গড়ে তোলা হয় বলে কথিত আছে।
কেরালায় শাস্তার পাঁচটি প্রধান মন্দির রয়েছে যেখানে শাস্তার বিভিন্ন রূপের পূজা করা হয়। যথা – কুলাথুপুজহাতে (Kulathupuzha) শাস্তার শৈশব রূপের, আরয়ানকাভু (Aryankavu) মন্দিরে বয়ঃসন্ধিকালে ব্রহ্মচারী রূপের, আচানকোভলিতে (Achankovil) শাস্তার দুই স্ত্রীর সাথে সংসারী রূপের, শবরীমালাতে তাঁর বানপ্রস্থ রূপের আর পুন্নামবালমেডু (Ponnambalmedu) বা কান্তমালা (Kantamala) মন্দিরে তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী হিসাবে পূজা করা হয়। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী এই সকল মন্দির পরশুরামই প্রতিষ্ঠা করেন। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে প্রাচীনকালে কেবলমাত্র ঋষিরা শবরীমালা মন্দিরে পূজা করতে পারতেন। পাহাড় ও জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত এই মন্দিরে পৌঁছাতে ভক্তদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হত।
শবরীমালা মন্দির কোনও একক রাজার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, লোককথা অনুযায়ী পান্ডালাম বংশের রাজারা এই মন্দির তৈরি করেন। কথিত আছে যে, আয়াপ্পার ভক্ত রাজা রাজশেখর এই মন্দির তৈরি করেন। ১৯৫০ সালে অগ্নিসংযোগের পর এই মন্দিরটিকে নতুনভাবে তৈরি করা হয়।
শবরীমালা মন্দিরের প্রকৃত নাম হল ‘শবরীমালা শ্রীধর্ম সংস্থা মন্দির’ বা ‘শবরীমালা শ্রী আয়াপ্পা স্বামী মন্দির’। এই মন্দিরের আয়াপ্পা স্বামী নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারী। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী পরশুরামের স্থাপন করা এই মন্দিরে কোনও ছাদ ছিল না। পরবর্তীকালে নির্মিত শবরীমালা মন্দিরে কেরালার ঐতিহ্যবাহী শৈলী দেখতে পাওয়া যায়। এই মন্দিরের গর্ভগৃহের ছাদটিতে রয়েছে সোনার প্রলেপ, এছাড়া গর্ভগৃহের উপরে রয়েছে চারটি সোনার চূড়া। আবার এই মন্দিরে আছে দুটি মণ্ডপ যেখানে ভক্তরা প্রার্থনা করেন। এই মন্দিরের বাইরে রয়েছে ১৮টি পবিত্র সিঁড়ি, জনবিশ্বাস অনুযায়ী সিঁড়িগুলি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ১৮টি পর্বতকে নির্দেশ করে আবার অনেকের মতে এই সিঁড়ির প্রথম পাঁচটি ধাপ মানবদেহের পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের প্রতীক, পরবর্তী আটটি ধাপ মানুষের আটটি নেতিবাচক আবেগের প্রতীক, পরের দুটি সহজাত গুণাবলীর প্রতীক আর শেষ দুটি ধাপ বিদ্যা ও অবিদ্যা তথা জ্ঞান ও অজ্ঞানতার প্রতীক। অর্থাৎ জাগতিক এই সকল মোহ অতিক্রম করে তবেই ভগবান আয়াপ্পার কাছে পৌঁছান যায়। পঞ্চলোহা দ্বারা আচ্ছাদিত এই সিঁড়ির ওঠার মুখে আয়াপ্পার বিশ্বস্ত অনুচর কারুপান্না স্বামী এবং কাডুথা স্বামীর মূর্তি রক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। শবরীমালা মন্দির চত্বরে পম্পা গণপতির মন্দির আছে। এছাড়া এখানে নীলকাল মহাদেব ও পাল্লিয়ারকাভু দেবীর মন্দির রয়েছে, যারা আয়াপ্পার বাবা ও মা রূপে পূজিত হন। প্রধান মন্দির বা সন্নিধানাম থেকে কিছু গজ দূরে রয়েছে মালিকাপুরাথাম্মা মন্দির। তাছাড়া সাপের রাজা নাগরাজের মন্দির, মুসলিম সুফি সাধক ভাভরের মসজিদও রয়েছে মন্দিরের কাছে। প্রচলিত কথা অনুসারে ভাভর আয়াপ্পার বন্ধু ছিলেন এবং মহিষীকে হত্যা করতে তিনি সাহায্য করেছিলেন।
লোককথা অনুসারে মন্দিরের মূল মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পরশুরাম নিজে। মূর্তিটি প্রথমে ঋষিদের দ্বারা ঘন অরণ্যে গোপনে পূজা করা হত তবে পরবর্তীকালে মূর্তিটি পাণ্ডালাম রাজবংশের আমলে জনপ্রিয় হয়। বর্তমানে এই মন্দিরে যে মূর্তিটি পূজা করা হয় তা কেরালার থাট্টাভিলা বিশ্বকর্মা পরিবারের সদস্য নীলাকান্ত পানিকর (Neelakanta Panicker) ও তার ছোটভাই আয়াপ্পা পানিকরের (Ayyappa Panicker) নির্মিত নতুন মূর্তি। পঞ্চলোহা অর্থাৎ পাঁচটি ধাতু – সোনা, রূপা, তামা, লোহা, টিন দ্বারা এই মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল। মনে করা হয় যে, এই ধাতুগুলি মূর্তিটির আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে। এখানে আয়াপ্পা স্বামীর মূর্তিটি বসার ভঙ্গিমাতে রয়েছেন, তাঁর ডান হাতে রয়েছে অভয় মুদ্রা আর বাম হতে রয়েছে জ্ঞান মুদ্রা বা চিন মুদ্রা। এছাড়া মূর্তিটির হাঁটুর চারপাশে রয়েছে একটি পবিত্র বেল্ট। আয়াপ্পার মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় দেড় ফুট।
শবরীমালা মন্দিরের সবচেয়ে বিখ্যাত অনুষ্ঠান হল মকর সংক্রান্তি পূজা ও মণ্ডল পূজা। মণ্ডল পূজা হয় নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে, এইসময় ভক্তরা প্রায় ৪১ দিন কঠিন সংযম ব্রতের পর তারপর আয়াপ্পার দর্শন করেন। আর মকর সংক্রান্তি বা মকরাভিলাক্কু উৎসব হয় জানুয়ারিতে। এই উৎসবে মকর জ্যোতি অনুষ্ঠান নিয়ে ভক্তদের মধ্যে প্রবল আগহ দেখা যায়। এই মন্দিরে ঐতিহ্যবাহী একটি নিজস্ব সংগীত রয়েছে – ১০৮টি শব্দ ও ৮টি স্তবকের ‘হরিভরসনম’ গানটি মন্দিরে বহু বছর ধরে বাজানো হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান