সববাংলায়

পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা : মধ্য-মহাসাগরীয় রিজ

বিভাগঃ ,

পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা কোনটি? এই প্রশ্ন করলে অনেকেই উত্তর দেবেন অ্যান্ডিজ পর্বতমালা। কিন্তু এই উত্তর ভুল। স্থলভাগে অবস্থিত পর্বতমালাগুলির মধ্যে অবশ্যই অ্যান্ডিজ পর্বতমালা দীর্ঘতম কিন্তু পৃথিবী তার অনেক বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে মহাসাগরের তলদেশে। এরমধ্যে সব থেকে বিস্ময়কর হল, পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা মধ্য-মহাসাগরীয় রিজ বা মিড ওশান রিজ (Mid-Ocean Ridge) মহাসাগরের তলায় অবস্থিত। আমরা পর্বতমালা বলতে সুউচ্চ ভুমিকে বুঝি এবং পর্বতমালা বললেই হিমালয়, অ্যান্ডিজ বা আল্পসের পর্বতমালার নাম মনে আসে। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ পর্বতমালা আসলে সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে আছে। মিড-ওশান রিজ হল পৃথিবীর মহাসাগরগুলির নিচে বিস্তৃত এক বিশাল পর্বতমালা, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৫,০০০ কিলোমিটার বা ৪০,০০০ মাইল। এটি পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে যেন একটি বেসবলের সেলাইয়ের মতো এবং পৃথিবীর মোট পৃষ্ঠের প্রায় ২৩ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত। স্থলভাগের দীর্ঘতম পর্বতমালা অ্যান্ডিজ যেখানে ৭,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, সেখানে মিড-ওশান রিজ তার প্রায় দশগুণ বড়।

এই মধ্য-মহাসাগরীয় রিজ বা মিড-ওশান রিজ গঠিত হয়েছে পৃথিবীর টেকটনিক প্লেটগুলির গতিবিধির কারণে। পৃথিবীর ভূত্বক আসলে কয়েকটি বড় বড় প্লেটে বিভক্ত, যেগুলি ক্রমাগত নড়াচড়া করছে। যখন দুটি প্লেট একে অপর থেকে দূরে সরে যায়, তখন নিচের ম্যান্টল থেকে গলিত ম্যাগমা উপরে উঠে আসে এবং ঠান্ডা হয়ে নতুন সমুদ্রতল তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সমুদ্রতল বিস্তার (sea-floor spreading )। মিড-ওশান রিজ অঞ্চলে এই বিস্তার সবচেয়ে বেশি ঘটে। ফলে পৃথিবীর ভূত্বক ক্রমাগত নতুনভাবে গড়ে উঠছে।

মধ্য-মহাসাগরীয় রিজের উচ্চতা সাধারণত আশেপাশের সমুদ্রতলদেশ থেকে প্রায় ২,০০০ মিটার বেশি। যদিও এটি সমুদ্রের গভীরে অবস্থিত, তবুও এর বিশালতা ও বিস্তার পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে এক অনন্য ভূমিকা রাখে। রিজ বরাবর ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপও বেশি হয়, কারণ এখানে পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে গলিত পদার্থ বেরিয়ে আসে। অনেক জায়গায় এই আগ্নেয়গিরি সমুদ্রের উপরিভাগ পর্যন্ত উঠে এসে নতুন দ্বীপ তৈরি করে। যেমন, আইসল্যান্ড আসলে মিড-অ্যাটলান্টিক রিজের উপর অবস্থিত একটি দ্বীপ, এই অঞ্চলে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ অত্যন্ত সক্রিয়।

মিড-ওশান রিজের বিভিন্ন অংশ পৃথিবীর বিভিন্ন মহাসাগরে বিস্তৃত। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হল মধ্য-আটলান্টিক রিজ (Mid-Atlantic Ridge), যা উত্তর ও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরকে বিভক্ত করে। আবার প্রশান্ত মহাসাগরে রয়েছে পূর্ব প্রশান্ত উত্থান (East Pacific Rise), যেখানে সমুদ্রতল বিস্তার সবচেয়ে দ্রুত ঘটে। ভারত মহাসাগরেও একটি বড় রিজ রয়েছে, যা ভারত মহাসাগরের তলদেশে বিস্তৃত। এই সমস্ত রিজ একসাথে পৃথিবীর ভূত্বককে ঘিরে রেখেছে এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা মধ্য-মহাসাগরীয় রিজ নিয়ে গবেষণা করে পৃথিবীর বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সমুদ্রতলের শিলার বয়স পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে রিজের কাছাকাছি শিলা সবচেয়ে নতুন এবং দূরে গেলে শিলা ক্রমশ পুরনো হয়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে পৃথিবীর ভূত্বক ক্রমাগত নতুনভাবে গড়ে উঠছে এবং প্লেট টেকটনিক্স সত্যিই কার্যকর। এছাড়া রিজ বরাবর পাওয়া যায় হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট, যা সমুদ্রের গভীরে গরম জল ও খনিজ পদার্থ নির্গত করে। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ভেন্টের আশেপাশে এমন অনেক জীব পাওয়া যায় যারা সূর্যালোক ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে। তারা রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে, যা পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ।

মিড-ওশান রিজ শুধু ভূতাত্ত্বিক দিক থেকেই নয়, বরং পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রচুর খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়, যেমন তামা, দস্তা, সোনা এবং বিরল ধাতু। অনেক দেশ ভবিষ্যতে এই সম্পদ আহরণের পরিকল্পনা করছে। তবে এর ফলে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে, কারণ হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের আশেপাশের জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, এই সম্পদ আহরণ করার আগে পরিবেশগত প্রভাব ভালভাবে বিবেচনা করা উচিত।

মধ্য-মহাসাগরীয় রিজের আরেকটি বিশেষত্ব হল এটি পৃথিবীর জলবায়ুর উপরও প্রভাব ফেলে। রিজ বরাবর সমুদ্রের তলদেশ থেকে নির্গত গ্যাস ও খনিজ পদার্থ সমুদ্রের রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন করে। এর ফলে সমুদ্রের কার্বন চক্রে প্রভাব পড়ে, যা পৃথিবীর জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, মিড-ওশান রিজ পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

মিড-ওশান রিজ নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ এটি সমুদ্রের অনেক গভীরে অবস্থিত। তবে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন সাবমেরিন, রিমোট সেন্সিং এবং স্যাটেলাইট ইমেজিং ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এর গঠন ও কার্যকলাপ সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এই গবেষণা শুধু পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার জন্য নয়, বরং অন্য গ্রহের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও সহায়ক। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে মঙ্গল গ্রহ বা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপাতেও এমন রিজ থাকতে পারে, যা জীবনের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মিড-ওশান রিজ পৃথিবীর অদৃশ্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পর্বতমালা। এটি আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ভারসাম্য রক্ষায়, জীববৈচিত্র্য গঠনে এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা অপরিসীম। স্থলভাগের হিমালয় বা অ্যান্ডিজ যতটা পরিচিত, মিড-ওশান রিজ ততটাই রহস্যময়। তবে বিজ্ঞানীরা যত বেশি গবেষণা করছেন, ততই আমরা বুঝতে পারছি যে পৃথিবীর আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে সমুদ্রের গভীরে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading