পূর্ব এশিয়ার একটি উপদ্বীপীয় অঞ্চল হল কোরিয়া। ১৯৪৮ সালে কোরিয়া উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া নামে দুই স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। বিভক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই শুরু হয় কোরিয়া যুদ্ধ (Korean War) — দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের অন্যতম ভয়াবহ সশস্ত্র সংঘাত। এই যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত, আহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে জেটবিমান ব্যবহারের কারণে এই যুদ্ধকে ইতিহাসে ‘জেট বনাম জেট’ আকাশযুদ্ধের সূচনা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই সংঘাত ছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যার প্রভাব আজও কোরিয়ার ভূ-রাজনীতি ও দুই কোরিয়ার আদর্শগত অবস্থানে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি; তাই বলা হয় যে কোরিয়া যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও শেষ হয়নি।
১৯৫০ সালের ২৫ জুন কোরিয়া যুদ্ধ শুরু হয়। একদিকে ছিল উত্তর কোরিয়ার ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়া (Democratic People’s Republic of Korea) ও অন্যদিকে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার রিপাবলিক অফ কোরিয়া ( Republic of Korea)। এই সশস্ত্র সংঘাতে উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন করেছিল চিন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর দক্ষিণ কোরিয়াকে সমর্থন করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ কমান্ড (United Nations Command বা UNC)। তিন বছরব্যাপী এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়।
এই যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয় আরও আগেই। ১৯০৫ সালের রুশ–জাপান যুদ্ধে জাপান রাশিয়াকে পরাজিত করলে পূর্ব এশিয়ায় জাপানের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং কোরিয়া জাপানি সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে কোরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামী কিম ইল সুং (Kim Il Sung) সোভিয়েত সমর্থনে জাপানবিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর কোরিয়ায় জাপানি শাসনের অবসান ঘটে এবং সোভিয়েত বাহিনী উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং কিছুদিনের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার বেশিরভাগ প্রধান শহরগুলি দখল করে নেয়।
এই রকম অবস্থায় ১৯৪৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়াকে ৩৮তম সমান্তরাল রেখা দ্বারা বিভাজন করার প্রস্তাব দেয়। আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়নি যে, সমগ্র কোরিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে চলে যাক এবং চারিদিকে কমিউনিজম ছড়িয়ে পড়ুক। আর এই কারণে তারা কোরিয়াকে বিভক্ত করে কমিউনিস্টদের গতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুজনেই বিজয়ী মিত্রশক্তির অংশ হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ওই প্রস্তাব মেনে নেয়। এই সময় সমগ্র কোরিয়ার স্বাধীনতা বিষয়ে পাঁচ বছরের ট্রাস্টিশিপ পরিকল্পনা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি করা কোরিয়ার মানুষেরা এই ট্রাস্টিশিপ পরিকল্পনাকে ভালোভাবে নেয়নি। কিম কু (Kim Ku) এবং সিঙ্গম্যান রিয়ের (Syngman Rhee) মতো স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতারাও ট্রাস্টিশিপের বিরোধীতা করেছিলেন।
অবশেষে ১৯৪৮ সালে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত হওয়ার পর জাতিসংঘ একটি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। তবে উত্তর কোরিয়া এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়নি। তাই ১৯৪৮ সালে কেবল দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার একটি জাতীয় রাজনৈতিক সংবিধান তৈরি করে এবং আমেরিকার সমর্থনে সিঙ্গম্যান রি দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৫ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম কোরিয়া প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই নির্বাচনে সিঙ্গম্যান রিকে সমর্থনের মাধ্যমে আমেরিকা কোরিয়ায় পুঁজিবাদের গোড়াপত্তন করতে চেয়েছিল। অন্যদিকে কিম ইল সুং সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন নিয়ে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় আসেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কোরিয়ার উভয় সরকারই একে অপরকে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা নিজেদেরকে সমগ্র কোরিয়ার একমাত্র বৈধ শাসক বলে দাবি করেছিল।
উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে সীমান্তে তারা সংঘর্ষে লিপ্ত থাকত। ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়েসু-সানচেন বিদ্রোহের (Yeosu-Sancheon Rebellion) মতো বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের সময় দক্ষিণ কোরিয়া অভিযোগ করেছিল যে, এই বিদ্রোহগুলি সংঘটিত হওয়ার পিছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার এইরকম টালমাটাল অবস্থায় সমগ্র কোরিয়াকে একীভূত করে কোরিয়ায় কমিউনিজমের বিকাশ ঘটানোর জন্য ১৯৫০ সালে আকস্মিকভাবে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার উপর আক্রমণ করে। তবে উত্তর কোরিয়া দাবি করেছিল যে, দক্ষিণ কোরিয়াই প্রথম আক্রমণ করেছিল। আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদদের অধিকাংশই উত্তর কোরিয়ার আক্রমণকেই যুদ্ধের সূচনা হিসেবে স্বীকার করেন।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সুং একটি বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া দখল করতে যায়। তারা ক্রমশ দক্ষিণ কোরিয়ার উপর কামানের গোলাবর্ষণ শুরু করেছিল। ১৯৫০ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার বাহিনী সিউল শহরসহ প্রায় সমগ্র দক্ষিণ কোরিয়া দখল করে নিয়েছিল। তবে দক্ষিণ-পূর্বের পুসান পেরিমিটার নামক একটি ছোট অঞ্চল তারা দখল করতে পারেনি। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার বাহিনী চিনা সীমান্তের কাছাকাছি চলে গেলে চিনও বিপুল সংখ্যক সৈন্য দিয়ে উত্তর কোরিয়াকে সাহায্য করতে শুরু করে। এই আক্রমণের ফলে দক্ষিণ কোরিয়া অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিল এবং এই কারণে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়।
তবে এরপর দক্ষিণ কোরিয়া ধীরে ধীরে নিজেদের সংগঠিত করে পাল্টা আক্রমণ করা শুরু করে। এই সময় আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুপস্থিতিতে কোরিয়া যুদ্ধের বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস করে উত্তর কোরিয়ার কর্মকাণ্ডকে আগ্রাসন হিসেবে ঘোষণা করে। আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়াকে সহায়তা করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোকে আহ্বান করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান (Harry S. Truman) দক্ষিণ কোরিয়াকে সহায়তা করার জন্য আমেরিকার সৈন্যদের নির্দেশ দেন। তারপর মার্কিন স্থল, আকাশ এবং সমুদ্র বাহিনী এই যুদ্ধে যোগ দেয়। এরপর জাতিসংঘ বাহিনীও দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থনে যুদ্ধে এগিয়ে আসে। অন্যদিকে স্ট্যালিনের নির্দেশে সোভিয়েত বাহিনী প্রকাশ্যে যুদ্ধ না করে গোপনে কিম ইল সুংকে সাহায্য করতে থাকে। ১৯৫০ সালে জাতিসংঘ বাহিনী উত্তর কোরিয়াকে আটকানোর জন্য পিয়ং ইয়ংয়ের কাছে পৌঁছে যায়। শেষপর্যন্ত আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাতিসংঘের যৌথ চাপে উত্তর কোরিয়ার বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়।
কোরিয়া যুদ্ধে প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে জেট ফাইটার ব্যবহৃত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র F‑86 Sabre ও F9F Panther এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও উত্তর কোরিয়া MiG‑15 ব্যবহার করেছিল। আকাশযুদ্ধের এই নতুন যুগ কোরিয়া যুদ্ধকে সামরিক ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
পরবর্তীতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার (Dwight D. Eisenhower) যুদ্ধের অবসান চেয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেন। অবশেষে ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং দুই কোরিয়ার মাঝখানে প্রতিষ্ঠিত হয় কোরিয়ান ডিমিলিটারাইজড জোন (Korean Demilitarized Zone বা DMZ) — প্রায় ২.৫ মাইল প্রশস্ত ও ১৫০ মাইল দীর্ঘ একটি বাফার জোন, যা আজও বিশ্বের অন্যতম সামরিক উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্ত। যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যেহেতু এই যুদ্ধ শেষ হয়েছিল, কোনও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, তাই বলা হয় যে দুটি দেশ এখনও কোরিয়া যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এছাড়া এই দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা এখনো বর্তমান। সম্প্রতি ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়া সংবিধান সংশোধন করে দক্ষিণ কোরিয়াকে শত্রু রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করেছে।
এই যুদ্ধে প্রায় ২০ থেকে ৪০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যার একটি বড় অংশ ছিল সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের ফলে উত্তর কোরিয়ার শিল্পসমাজ ধ্বংস হয়ে যায় এবং কিম ইল সুং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চিনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা নেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উত্তর কোরিয়ায় কিম রাজবংশের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়াকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিনবিরোধী মনোভাবও বৃদ্ধি পায়।
তিন বছরের এই কোরিয়া যুদ্ধ আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চিন—তিন পক্ষের জন্যই হতাশাজনক ছিল। তারা কেউই সমগ্র কোরিয়ার উপর পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। যুদ্ধের সামরিক ফলাফল অমীমাংসিত থাকলেও দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত সাফল্য ছিল। তবে যুদ্ধ আরও এগোলে তা পারমাণবিক সংঘাতে রূপ নিতে পারত এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতো—এ কথা ইতিহাসবিদরা একবাক্যে স্বীকার করেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান