ব্যাকরণের প্রসঙ্গ উঠলেই যে প্রাচীন পন্ডিতের কথা আসে, তিনি পাণিনি (Panini) নামে পরিচিত। ভাষা চর্চাকারীরা এই ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকেন। সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ পাণিনিকে ভাষাবিজ্ঞানের জনকও বলা হয়ে থাকে। তাঁকেই প্রথম ‘বর্ণনামূলক ভাষাবিদ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তিনি ধ্বনিতত্ত্ব, ধ্বনিবিদ্যা ও রূপতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখা প্রদান করেছিলেন। ফার্দিনান্দ দি স্যোসুরের মতো আন্তর্জাতিক স্তরের ভাষাবিদরাও পাণিনির ব্যাকরণের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি, তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। প্রথম ভারতীয় ব্যাকরণবিদ বললে পাণিনির নামই করতে হবে। তবে পাণিনির জন্মস্থান, কাল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানারকম সংশয় রয়েছে। তাঁর রচিত ‘অষ্টাধ্যয়ী’ নামক উৎকৃষ্ট ব্যাকরণগ্রন্থই সংস্কৃত ভাষাকে একটা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সংস্কৃত ভাষার যে কাঠামো তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন তা পরবর্তী দুহাজার বছরে খুব কমই পরিবর্তিত হয়েছিল।
পাণিনির জন্মের সময়কাল ও জন্মস্থান সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না, এ-নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানারকম সংশয় রয়েছে। তবে অনেকেই মনে করেন খ্রীস্টপূর্ব সপ্তম থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যবর্তীকালীন কোন একটা সময়ে পাণিনির জন্ম হয়েছিল। জর্জ কর্ডোনা সমীক্ষা এবং গবেষণা করে জানিয়েছেন উপলব্ধ প্রমাণগুলি থেকে মনে হয়, ৪০০ থেকে ৩৫০ খ্রীস্টপূর্বাব্দের মধ্যে কোন এক সময় পাণিনির অস্তিত্ব ছিল। আবার সংখ্যাগত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ভন হিনবার এবং ফক খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কেই পাণিনির অস্তিত্বের সময়কাল হিসেবে জানিয়েছিলেন৷
পাণিনির রচনায় উল্লিখিত ‘রুপিয়া’ আসলে নিস্কা নামক একপ্রকার স্বর্ণমুদ্রাকে বোঝায়, খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতেই ভারতে যার প্রচলন হয়েছিল। কেউ কেউ ৩২৬ খ্রীস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভারত অভিযানের ঠিক পরবর্তী সময়কে পাণিনির সময় বলে উল্লেখ করেছেন, তবে এই মত খন্ডনও করে দিয়েছেন কেউ কেউ।
পাণিনির রচিত সূত্রে ‘কুমারশ্রমণ’ নামে একটি শব্দ পাওয়া যায়, যার বৌদ্ধদের শ্রমণ শব্দটি থেকে উদ্ভুত বলে মনে করা হয়। এই শ্রমণ হল বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। এই কারণে অনেকেই পাণিনিকে গৌতম বুদ্ধের পরবর্তীকালের মানুষ বলে মনে করেছেন। যদিও কেবি পাঠক যুক্তি দিয়েছিলেন যে, কুমারশ্রমণ বলতে কোন জৈন সন্ন্যাসীকেও বোঝানো হতে পারে, তাই এই শব্দটি থেকেই নিশ্চিতভাবেই এই সিদ্ধান্তে আসা যায় না যে, পাণিনি গৌতম বুদ্ধের পরবর্তীকালের মানুষ।
পাণিনি তাঁর রচনায় তাঁর পূর্ববর্তী দশজন ব্যাকরণবিদের নাম করেছিলেন। কমল.কে মিশ্রের মতে, পাণিনি যাস্কের নিরুক্তের উল্লেখ করেছিলেন, যা কিনা চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি রচিত।
সংস্কৃত মহাকাব্য বৃহৎকথা এবং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ মঞ্জুশ্রী-মূল-কল্প উভয়ই পাণিনিকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের ক্ষমতায় আসার আগে নন্দ সাম্রাজ্যের শেষ রাজা ধন নন্দ-এর সমসাময়িক বলে উল্লেখ করেছে।
অনেকে আবার পাণিনির রচনার ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে তাঁর রচনা পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শতাব্দীর বলে উল্লেখ করেছেন। বোডের মতে, বৈদিক যুগের পরেই ছিল পাণিনির কাল, যা খ্রীস্টপূর্ব সপ্তম থেকে পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যবর্তী হওয়াই সম্ভব। এবি কিথ আবার পাণিনির ভাষার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল পেয়েছিলেন ঐতরেয় ব্রাহ্মণের, যেটির সময়কাল আনুমানিক অষ্টম থেকে ষষ্ঠ খ্রীস্টপূর্বাব্দ।
এভাবেই পাণিনির সময়কালকে কেন্দ্র করে গবেষকদের মধ্যে নানারকম মতভেদ, সংশয়, ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
পাণিনির জন্মস্থান নিয়েও রয়েছে একাধিক মত। ভালভীর সপ্তম শিলাদিত্যের একটি শিলালিপিতে পাণিনিকে ‘শালতুরিয়া’ বলা হয়েছে, যার অর্থ সালাতুরার একজন মানুষ। এই সালাতুরা উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের গান্ধারে, সিন্ধু ও কাবুল নদীর সংযোগস্থলে লাহোর শহরের কাছে অবস্থিত ছিল। হার্টমুট শার্ফের মতেও পাণিনি গান্ধারে জন্মেছিলেন কিন্তু প্যাট্রিক অলিভেলের অনুমান পাণিনি স্পষ্টতই একজন উত্তরের, সম্ভবত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন।
আবার সপ্তম শতাব্দীর চীনা পন্ডিত জুয়ানজাং-এর স্মৃতিচারণ অনুসারে, সিন্ধু নদীর তীরে সুওলুওডুলুও নামে একটি শহরে নাকি পাণিনির জন্ম হয়েছিল।
পাণিনির পিতার নাম যেটি জানা যায়, তা হল পাণি, যদিও অনেক ঐতিহাসিক তা মানতে চান না। পাণিনির মা দাক্ষী নামে পরিচিত। অনেকের মতে পাণিনির বড়দাদা ছিলেন মহর্ষি পিঙ্গল। তাঁর মায়ের তরফের এক কাকা ছিলেন ব্যাদী নামে।
পিতা ছিলেন পাণিনির সর্বপ্রথম গুরু। এরপর বহু শিক্ষকের কাছে পাণিনি পড়াশোনা করেন। তাঁদের কাছে যখন শব্দভান্ডার শিখছিলেন তখন সমস্ত পাঠ্যতেই একইরকম ভুল তাঁর চোখে পড়ে এবং তখনই সম্ভবত তিনি ব্যাকরণের উন্নতি সাধন করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
‘কথাসরিৎসাগর’ গ্রন্থে পাণিনিকে নিয়ে একটি গল্প রয়েছে। সেই গল্প অনুযায়ী, পাটলিপুত্রের গুরু বর্ষের শিষ্য ছিলেন পাণিনি। সমস্ত শিষ্যের মধ্যে পাণিনি খুবই কম বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন তবে গুরুর প্রতি তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। গুরুপত্নী তাঁকে হিমালয়ে গিয়ে ভগবান শিবকে প্রসন্ন করার জন্য তপস্যা করতে বলেন। শিব তাঁর তপস্যায় খুশি হয়ে তাঁকে একটি নতুন ব্যাকরণ সম্পর্কে জ্ঞান দান করেন। সেই নতুন ব্যাকরণের জ্ঞান নিয়ে যখন তিনি ফিরে এলেন তখন গুরু বর্ষের বররুচি নামক এক শিষ্য ইন্দ্রের কাছ থেকে বর হিসেবে একটি নতুন ব্যাকরণের জ্ঞান অর্জন করেছেন। পাণিনি তখন বররুচিকে একটি বিতর্কে আহ্বান জানালেন। আটদিন তর্ক-বিতর্কের পরে ভগবান শিবের কৃপায় বররুচি এবং তাঁর সমস্ত শিষ্যকে পরাজিত করে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাকরণবিদ হিসেবে পরিচিত হন পাণিনি।
পাণিনির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হল ‘অষ্টাধ্যায়ী’ নামক গ্রন্থ, যা ব্যাকরণের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট আদি গ্রন্থ বলে মনে করা হয়। বৈদিক স্তোত্র রচিত হয়েছিল যে সংস্কৃত ভাষায়, তার শুদ্ধতা রক্ষা করবার জন্যে এবং তার যথেচ্ছ বিকৃতি রোধ করবার জন্যে পাণিনি যুক্তিসম্মত গাণিতিক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের নিগড়ে বাঁধবার সংকল্প করেন সংস্কৃতকে এবং রচনা করেন অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থ।
মোট আটটি অধ্যায়ে এবং ৩৯৫৯টি সূত্রে বিভক্ত এই গ্রন্থটি। প্রতিটি অধ্যায় আবার চারটি করে পদে বিভাজিত।
সংস্কৃত রূপবিদ্যা এবং ধ্বনিতত্ত্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এই গ্রন্থের অন্যতম উপাদান। মূলত বিশ্লেষণ এবং সংশ্লেষণ, এই দুটি ভাগে গ্রন্থটি বিভক্ত। ধ্বনিবিদ্যা, রূপবিদ্যা এবং উচ্চারণের সংশ্লেষণ এই গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এটিতে সংস্কৃত ব্যাকরণকে বর্ণনা করবার জন্য প্রাথমিক কিছু নিয়মের ব্যাখা করেছিলেন পাণিনি। এই গ্রন্থে পাণিনি ধাপে ধাপে বিশেষ্য, স্বরবর্ণ, প্রত্যয়, ক্রিয়াপদ ইত্যাদির ব্যবহার সম্পর্কে যেমন বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তেমনি তাদের প্রয়োজনীয় কয়েকটি শ্রেণীতেও বিভক্ত করেছিলেন। এছাড়াও বাক্যের গঠন, যৌগিক বিশেষ্য ও কালের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়েও পাণিনি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছিলেন তাঁর গ্রন্থে। এতে ফোনিম (phoneme), মরফিমের (morpheme) প্রসঙ্গও ব্রাত্য থাকেনি। এছাড়াও ব্যাকরণের অনেক সূক্ষ্ম বিষয়ে আলোকপাত করে অষ্টাধ্যায়ী। এই গ্রন্থ ধ্রুপদী সাহিত্যের জন্য ব্যবহৃত ভাষা এবং তৎকালীন লোকেদের কথা বলার জন্য ব্যবহৃত ভাষার মধ্যে পার্থক্য সূচিত করে।
অষ্টাধ্যায়ীর সঙ্গে আরও যে তিনটি গ্রন্থ যুক্ত রয়েছে, সেগুলি হল শিবসূত্র, ধাতুপথ এবং গণপথ।
একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ভাষার সিনট্যাক্স টুলের সঙ্গে পাণিনির ব্যাকরণের অনেক মিল পাওয়া গেছে। নতুন ভাষা সৃষ্টি করতে প্রাথমিক পদ্ধতিগুলি দেওয়ার জন্য ভাষাবিজ্ঞানী ও কম্পিউটার সায়েন্টিস্টরা পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী থেকে অজস্র উদাহরণ ব্যবহার করেছিলেন। এইভাবে পাণিনির ব্যাকরণ সময়ের দীর্ঘ স্রোত পেরিয়েও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক থেকে গেছে। সেই ব্যাকরণের নানা জটিলতর দিকগুলি নিয়ে গবেষণা হয় আজও। পাণিনির এই বিখ্যাত ব্যাকরণ গ্রন্থের ভাষ্য রচনা করেছিলেন পতঞ্জলি, যেটি ‘মহাভাষ্য’ নামে পরিচিত। পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী হল শঙ্কর, রামানুজ এবং মাধব সহ বিখ্যাত ভারতীয় ধর্মতত্ত্ববিদ এবং দার্শনিকদের অধ্যয়নের প্রবেশদ্বার। প্রকৃতপক্ষে, এও বলা যায় যে, অষ্টাধ্যায়ী তাদের চিন্তার ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। এছাড়াও পাণিনির ব্যাকরণ ফার্দিনান্দ ডি সসুর , লিওনার্ড ব্লুমফিল্ড এবং রোমান জ্যাকবসনের মতো ভাষাবিদদেরও প্রভাবিত করেছিল।
পাণিনির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে তথ্য মেলে না, ফলে তাঁর জীবনের অন্তিম সময় এবং মৃত্যু বিষয়েও নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না। তবে ভারতীয় উপকথা ও প্রাচীন গ্রন্থে পাণিনির উল্লেখ রয়েছে। পঞ্চতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাণিনি নাকি এক সিংহ দ্বারা নিহত হয়েছিলেন। তবে এটি নিছক কিংবদন্তি বলেই মনে হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান