ইতিহাস

রফি আহমেদ কিদোয়াই

রফি আহমেদ কিদোয়াই

ভারতের একজন সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং দক্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন রফি আহমেদ কিদোয়াই (Rafi Ahmed Kidwai)। অনেকে তাঁকে ইসলামি সমাজবাদী হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর পরামর্শদাতা হিসেবেও তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। স্বাধীন ভারতের প্রথম যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামই নয়, দেশের সার্বিক উন্নতির প্রতিটি ধাপে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর নজর ছিল। মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হয়ে ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং সঙ্কট দূরীকরণের জন্য সূক্ষ্ম পরিকল্পনার কারণে ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে রফি আহমেদ কিদোয়াই আজও অনস্বীকার্য এক নাম।

১৮৯৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশের বরাবাঁকি জেলার মাসাউলি গ্রামে এক মধ্যবিত্ত জমিদার পরিবারে রফি আহমেদ কিদোয়াইয়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ইমতিয়াজ আলি কিদোয়াই একজন জমিদার এবং একজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন। রফি আহমেদের বাল্যকালেই তাঁর মা রশিদ-উল-নিসা মারা যান। ১৯১৯ সালে রফি আহমেদ কিদোয়াই বিবাহ করেন মাজিদ-উল-নিসাকে। তাঁদের একমাত্র পুত্র মাত্র সাত বছর বয়সেই মারা যায়।

শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলিতে কাকা বিলায়েত আলির কাছেই প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ গ্রহণ করেন রফি আহমেদ কিদোয়াই। তাঁর কাকা একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী এবং পেশায় একজন আইনজীবি ছিলেন। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত বরাবাঁকির গভর্নমেন্ট হাই স্কুলেই পড়াশোনা করেছেন রফি আহমেদ। তারপর ১৯১৬ সালে তিনি আলিগড়ের মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজে স্নাতক স্তরে ভর্তি হন। ঐ বছরই ডিসেম্বর মাসে তাঁর কাকার আগ্রহে এবং প্রেরণায় ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের ঐতিহাসিক লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে যোগ দেন রফি আহমেদ কিদোয়াই। এই অধিবেশনেই কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯১৮ সালে রফি আহমেদ সাফল্যের সঙ্গে স্নাতক উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য আইন পড়তে শুরু করেন এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার দরুন আইন পড়ায় মাঝপথেই ইতি টানেন তিনি।

১৯২০ সাল থেকেই মূলত রফি আহমেদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। সেই সময় গান্ধীজির নেতৃত্বে পরিচালিত খিলাফৎ আন্দোলন এবং অসহযোগ আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অবদান ও আত্মনিয়োগ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। আন্দোলনে সামিল হওয়ার কারণে তাঁকে কারাবাসও করতে হয়েছিল। ১৯২২ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে এলাহাবাদে চলে আসেন তিনি। তারপর মতিলাল নেহেরুর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজে যোগ দেন তিনি। ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের কেন্দ্রীয় বিধানসভায় নির্বাচিত হন রফি আহমেদ কিদোয়াই এবং তারপর থেকে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক দূরদৃষ্টির কারণে ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস বিধানসভায় মুখ্য সচেতক (Chief Whip) হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। যুক্ত প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি-র সম্পাদকের পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তিনি এবং সেই সময় প্রবহমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রায়বেরিলি জেলার কৃষকদের সংগঠিত করে তাঁদের সুরক্ষার দাবিতে খাজনা অস্বীকারের একটি প্রচারাভিযান চালান তিনি। এই কারণেও তাঁকে ছয় মাস কারারুদ্ধ করে রাখা হয়।

১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইনের বলে যুক্ত প্রদেশে পণ্ডিত গোবিন্দ বল্লভ পন্থের মন্ত্রীসভায় কর ব্যবস্থাপনা ও কারাগারের অবস্থা পরিদর্শনের জন্য ভারপ্রাপ্ত-মন্ত্রীর পদে আসীন হন রফি আহমেদ কিদোয়াই। কংগ্রেস সরকার ঐ সময়েই সুসজ্জিত ভাবে গড়ে উঠছিল। ১৯৪৬ সালের সরকারে গোবিন্দ বল্লভ পন্থের পরেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ঐ বছরই উত্তর প্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হন রফি আহমেদ কিদোয়াই। ভারতের স্বাধীনতার পরে জওহরলাল নেহেরুর মন্ত্রীসভায় তিনিই ভারতের প্রথম যোগাযোগ মন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এবং রফি আহমেদই কেবলমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন নেহেরুর মন্ত্রীসভায়। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৪৮ সালে নিজস্ব টেলিফোন ক্রয়ের (Own Your Telephone) প্রকল্পটি সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা খুব জনপ্রিয় হয়। আজও তাঁর নামেই এই প্রকল্পটি চালু রয়েছে ভারতে। ১৯৪৮ সালে প্রথম চিঠিপত্র প্রেরণের জন্য রাত্রিকালীন উড়ান (Night Air Mail Service) চালু করেন তিনি। ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পরে রফি আহমেদ কিদোয়াই মন্ত্রীসভায় খাদ্য ও কৃষি দপ্তরের দায়িত্বও লাভ করেন। এই সময় থেকেই সমগ্র ভারত জুড়ে খাদ্য রেশন প্রকল্প চালু হয়, কিন্তু সেটা ছিল একটা পরীক্ষামূলক প্রয়াস। তাই রেশন সরবরাহের পরিমাণ ছিল কম। একমাত্র রফি আহমেদই দক্ষতার সাথে খাদ্য সরবরাহের এই বিষয়টিকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়েছিলেন যাতে চূড়ান্ত অভাবের দিনেও খাদ্যদ্রব্য কিংবা রেশনের সরবরাহে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে। এছাড়াও কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কাশ্মীরের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ্‌কে মন্ত্রীত্ব থেকে সরিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন রফি আহমেদ কিদোয়াই। তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবন জুড়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কাজে তিনি আত্মনিবেদিত ছিলেন, বিশ্বস্ত ছিলেন এবং স্বাধীনতার পরেও জওহরলাল নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্বে ভারতের বুনিয়াদি ভিতকে আরো মজবুত করতে ও সরকারকে আরও শক্তিশালী ও দক্ষ করে তুলতে তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর সম্মানার্থে প্রতি দুই বছর অন্তর ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ’-এর পক্ষ থেকে কৃষি, পশুবিদ্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কৃতী বিজ্ঞানীদের রফি আহমেদ কিদোয়াই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। পুরস্কারমূল্য হিসেবে তিন লক্ষ টাকা এবং একটি স্বর্ণপদক দেওয়া হয় কৃতীদের। এছাড়া তাঁর স্মৃতিতে কলকাতার একটি রাস্তার নামকরণও করা হয়েছে রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড।

১৯৫৪ সালের ২৪ অক্টোবর দিল্লিতে একটি জনসভায় বক্তব্য রাখাকালীন হৃদ্‌যন্ত্র বিকল হয়ে রফি আহমেদ কিদোয়াইয়ের মৃত্যু হয়।            

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন