সববাংলায়

ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

বিভাগঃ , ,

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের একজন অভিনেতা তথা উদ্যোক্তা এবং পরিচালক ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (Dhirendra Nath Ganguly)। তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। চলচ্চিত্র জগতে ‘ডিজি’(D. G) নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন তিনি। একাধারে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন ধীরেন্দ্রনাথ। তাঁর তৈরি ইন্দো ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি, ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মস এবং লোটাস ফিল্ম কোম্পানি থেকে বহু হাস্যরসাত্মক ছবি মুক্তি পেয়েছে। নীতিশ লাহিড়ীর নির্দেশনায় তাঁর অভিনীত ‘বিলাত ফেরত’ ছবিটি বাংলা নির্বাক যুগের প্রথম হাস্যরসাত্মক ছবি ছিল।

১৮৯৩ সালের ২৬ মার্চ কলকাতায় এক অভিজাত ও সম্পন্ন প্রতিপত্তিশালী পরিবারে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁদের আদি নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের বরিশালে। তাঁর বড় দাদা উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় পেশায় একজন রেস্তোরাঁ-মালিক ছিলেন যিনি পরে যুক্ত প্রদেশে চলে যান। উপেন্দ্রনাথের এক কন্যা বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং শিক্ষয়িত্রী অরুণা আসফ আলি এবং অপর কন্যা পূর্ণিমা ব্যানার্জী ভারতীয় বিধানসভার সদস্যও হয়েছিলেন। তাঁর অন্য আরেক ভাই নগেন্দ্রনাথ দত্ত পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের একমাত্র জীবিত কন্যা মীরা দেবীকে বিবাহ করেন। ছোটবেলা থেকেই নাটক ও চারুকলার প্রতি আকর্ষণ জন্মেছিল ধীরেন্দ্রনাথের। শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আসেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’, ‘রাজা’, ‘ডাকঘর’ ইত্যাদি নাটকে তিনি অভিনয়ও করেছেন কৈশোরে। তাঁর অনবদ্য অভিনয় সহজেই রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ১৯১০ সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট কলেজে ভর্তি হন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু ছয় মাস পরেই কলেজ ছেড়ে জুবিলী আর্টস অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। তারপরে গভর্নমেন্ট স্কুল অফ আর্টসে ভর্তি হন ধীরেন্দ্রনাথ। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৯১২ সালে ডিস্টিংশন সহ পাশ করেন তিনি।

তাঁর রক্ষণশীল পরিবার তাঁকে নাট্যকলা এবং চারুকলা নিয়ে কাজ করতে বাধা দিয়েছিলেন। অর্থোপার্জনের জন্য তিনি ছবি আঁকতেন এবং তাঁর আঁকা ছবি কিছু পত্রিকাকে বিক্রি করতেন। শান্তিনিকেতনে একজন রূপসজ্জা শিল্পী হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুবাদে কলকাতা পুলিশের দপ্তরে একটি চাকরি পান ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। সেখানে তাঁর কাজ ছিল পুলিশের বড় কর্তাদের জন্য পোশাক তৈরি করা। ক্রমেই ছবি তোলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। তার ফলে সেই সময় থেকেই নিজের নানা রকম ছবি তোলাতে শুরু করেন ধীরেন্দ্রনাথ। পরে তাঁর এইসব ছবি ‘ভানওয়ার অভিব্যাকে’ (Bhanwar Abhivyake) নামে দুই মলাটের বইয়ের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল যা প্রভূত প্রশংসিত হয়েছিল। এর ফলেই ১৯১৫ সালে হায়দ্রাবাদের নাজিম আর্ট কলেজে একটি চাকরিও জুটে যায় তাঁর। ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় যখন চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন, তখন ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা একেবারে টালমাটাল। ১৯১৯ সালে জেনারেল ডায়ার অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালান, বহু ভারতীয় মারা যায়। এর প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করেন। ব্রিটিশ সরকার অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধীকে কারারুদ্ধ করে। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলতে থাকে, চলচ্চিত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়। সেই সময় মুক্তি পাওয়ার আগে ৪৯টি ছবির মধ্যে ১৩টি ছবিকেই বাতিল ঘোষণা করেছিল কলকাতা বোর্ড অফ সেন্সর। ইতিমধ্যে ছবি তোলার সুবাদে জে এফ ম্যাডানের সঙ্গে পরিচয় হয় ধীরেন্দ্রনাথের। ম্যাডান থিয়েটার্সের ব্যবস্থাপক নীতিশ লাহিড়ীর সঙ্গে একত্রে ১৯১৮ সালেতিনি গড়ে তোলেন প্রথম বাঙালিদের চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা ‘ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি’। এই সংস্থা থেকেই ১৯২১ সালে ‘বিলাত ফেরত’ নামে একটি নির্বাক বাংলা ছবি মুক্তি পায় যেখানে পরিচালক ছিলেন নীতিশ লাহিড়ী এবং তারপরে ১৯২২ সালে ‘যশোদা নন্দন’ এবং ‘সাধু অউর শয়তান’ নামে আরও দুটি ছবি মুক্তি পায়। ‘বিলাত ফেরত’ ছবিতে মূল কাহিনী লেখা এবং মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। একটি হাস্যরসাত্মক ছবি ছিল এই ‘বিলাত ফেরত’ যা সেই সময় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ১৯২৩ সালে নীতিশ লাহিড়ী এবং ধীরেন্দ্রনাথের যৌথ উদ্যোগ ভেঙে যায়। হায়দ্রাবাদে ফিরে আসেন ধীরেন্দ্রনাথ এবং সেখানেই নিজামের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি গড়ে তোলেন ‘লোটাস ফিল্ম কোম্পানি’। এই সংস্থার পক্ষ থেকে পরপর তিনটি ছবি মুক্তি পায় – লেডি টিচার (১৯২২), ম্যারেজ টনিক (১৯২২) এবং রাজিয়া বেগম (১৯২৪)। ইলতুৎমিসের কন্যা রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে আবিসিনিয়ার এক ক্রীতদাসের প্রেমকে কেন্দ্র করে ‘রাজিয়া বেগম’ ছবিটি নির্মিত হওয়ার কারণে হায়দ্রাবাদের নিজাম অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং এক দিনের মধ্যেই ধীরেন্দ্রনাথকে হায়দ্রাবাদ ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৯২৮ সালে কলকাতায় ফিরে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় তৈরি করেন ‘ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্ম কোম্পানি’। ১৯৩০ সালে এই সংস্থার পক্ষ থেকে চিতোরের রানি পদ্মিনীর জীবন অবলম্বনে ‘ফ্লেমস অফ ফ্লেশ’ নামে একটি ছবি বানান তিনি। রাজস্থানের অম্বর প্রাসাদে এই ছবির শ্যুটিং হয়েছিল।

কলকাতার দমদমে ১৯২৯ সালে তিনি ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্ম স্টুডিও গড়ে তুলেছিলেন তিনি যা অত্যন্ত জনপ্রিয় তৃতীয় নির্বাক স্টুডিও ছিল। এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরের সদস্য ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া, পুরী, খাদিয়া, পাটনার রাজাগণ, তরুবালা সেন, এন এন মুখার্জী এবং কে সি রায়চৌধুরী। ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন এর ব্যবস্থাপক পরিচালক। ঔপনিবেশিক রাজ্যগুলির অর্থ সাহায্যের পাশাপাশি রয়্যালটি থেকেও এই সংস্থার উপার্জন হত। এই সংস্থার প্রথম ছবিতে কাজ করেছিলেন দেবকী কুমার বসু, চিত্রনাট্যকার ও চিত্রনির্মাতা দীনেশরঞ্জন দাস এবং ক্যামেরাম্যান শৈলেন বসু এবং দ্রোণাচার্য। মোট আটটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল এই প্রযোজনা কোম্পানি থেকে। শব্দ প্রক্ষেপণের দুনিয়াতেও এক আমূল পরিবর্তনের কারণে ১৯৩০ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপরে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘বড়ুয়া পিকচার্স কোম্পানি’তে যোগ দেন ধীরেন্দ্রনাথ এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা দুজনেই যোগ দেন বি এন সরকারের ‘নিউ থিয়েটার্স’-এ।

বাংলায় হাস্যরসাত্মক ছবির জগতে তাঁর বেশ কিছু কাজ আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি হল – ‘হরগৌরী’ (১৯২৩), ‘দ্য স্টেপমাদার’ (১৯২৩), ‘চিন্তামণি’ (১৯২২), ‘চরিত্রহীন’ (১৯৩১), ‘হোয়াট নট’ (১৯৩১), ‘নাইট বার্ড’ (১৯৩৪) এবং ‘কান্ট্রি গার্ল’ (১৯৩৬)। নির্বাক ছবির জগত থেকে শুরু করে সবাক ছবির দুনিয়াতেও বহু কাজ করেছেন তিনি। নিউ থিয়েটার্স-এর হয়ে ‘মাসতুতো ভাই’ (১৯৩৪) এবং ‘এক্সকিউজ মি স্যার’ নামের দুটি অত্যন্ত হাস্যরসাত্মক ছবি তৈরি করেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। পথ ভুলে (১৯৪০) এবং দাবী (১৯৪৩) ছবিতে ধীরেন্দ্রনাথের কন্যা মনিকা বসু ঠাকুরতা তাঁরই বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন শিশু শিল্পী হিসেবে। পরবর্তীকালে ‘ডিজি অ্যান্ড বেঙ্গলি ফিল্মস’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন তিনি। সেই বইতে মনিকা লিখেছেন যে ধীরেন্দ্রনাথ পোশাক-পরিচ্ছদ বা ছদ্মবেশ খুবই ভালবাসতেন এবং প্রায়ই মহিলার ছদ্মবেশ নিয়ে তাঁর রূপসজ্জার দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে কাজ করার সময় একবার রাস্তায় সারা দিন ভিখারি সেজে প্রমথেশকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর পরিচালিত অন্যান্য ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে – ‘কার্টুন’ (১৯৪৯), ‘শেষ নিবেদন’ (১৯৪৮), ‘শৃঙ্খল’ (১৯৪৭), ‘আহুতি’ (১৯৪১), ‘অভিসারিকা’ (১৯৩৮), ‘দ্বীপান্তর’ (১৯৩৬) ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর অভিনীত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘বন্দিতা’ (১৯৪৫), ‘মরণের পারে’ (১৯৩১), ‘অলীক বাবু’ (১৯৩০), ‘শঙ্করাচার্য’ (১৯২৭) ইত্যাদি। ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিনীত ও পরিচালিত ছবিগুলি আজ আর পাওয়া যায় না। কেবলমাত্র কল্পনা লাজমির ডিজি পাইওনিয়ার নামের একটি তথ্যচিত্র থেকে তাঁর অভিনীত ছবির কিছু ধারণা পাওয়া যায়।     

ছবিতে অভিনয়ের আগে তিনি তাঁর মুখের অভিব্যক্তির একটি ছবি এঁকে নিতেন। শান্তিনিকেতনের ছাত্র হিসেবে মুখকে একটি মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করার শিক্ষা পেয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ। হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্যুটিং-এর আগে থেকেই নিজের নোটবুকে তাঁর মুখের নানাবিধ ভঙ্গিমা ও অভিব্যক্তি আলাদাভাবে এঁকে রাখতেন তিনি।

১৯৭৪ সালে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত হন এবং ১৯৭৫ সালে তাঁকে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

১৯৭৮ সালের ১৮ নভেম্বর ৮৫ বছর বয়সে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।