নোবেল পুরস্কারকে বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন মানুষ। সুইডিশ রসায়নবিদ ও শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের নামে এই পুরস্কারটি নামাঙ্কিত। ১৯০১ সাল থেকে অনন্য সাধারণ গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণমূলক কাজের জন্য এই পুরস্কারটি প্রদান করে আসছে সুইডিশ আকাদেমি। উন্নতমানের গবেষণা, আবিষ্কার এবং মানবকল্যাণমূলক কাজকে এই পুরস্কার স্বীকৃতি জানায়। প্রথমদিকে মোট পাঁচটি বিষয় অর্থাৎ রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য এবং শান্তি-র জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হত। কিন্তু ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবার জন্যও নোবেল দেওয়া শুরু হয় এবং এর নাম দেওয়া হয় ‘দ্য সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল (The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Noble)। কখনও একক ব্যাক্তি, কখনও দুজন যৌথভাবে আবার কখনও তিনজন ব্যাক্তি একত্রেও নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন। একাধিক ব্যাক্তি নোবেল পুরস্কার পেলে সেক্ষেত্রে পুরস্কারের প্রদত্ত অর্থ পরস্পরের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়ে যায়।
নিম্নে ২০২৩ সালে বিভিন্ন বিভাগে নোবেল বিজয়ীদের তালিকা ও কোন কৃতিত্বের জন্য তাঁরা নোবেল পেলেন তা উল্লেখ করা হল—
পদার্থবিদ্যায় নোবেল :- ২০২৩ সালে পদার্থবিদ্যায় পিয়েরি অ্যাগোস্টিনি (Pierre Agostini), ফেরেঙ্ক ক্রাউস (Ferenc Krausz) এবং অ্যান ল’হুইলিয়ার (Anne L’Huillier)—এই তিনজন একত্রে নোবেল পেয়েছেন। তাঁদের গবেষণার মূল বিষয় ছিল ইলেকট্রন গতিবিদ্যা। তাঁরা এই গবেষণার সাহায্যে আলোর অটোসেকেন্ড পালস বা স্পন্দন তৈরির পরীক্ষামূলক পদ্ধতি সৃষ্টিতে সফল হয়েছেন যা, ইলেকট্রনের দ্রুত গতিবিধির ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছে। এই আবিষ্কার পরমাণু এবং অণুর ভিতরে ইলেকট্রনের জগতকে অন্বেষণের নতুন দিশা দেখিয়েছে।
রসায়নবিদ্যায় নোবেল :- ২০২৩ সালে রসায়নবিজ্ঞানে ফ্রান্সের মাউঙ্গি জি. বাওয়েন্ডি (Moungi G. Bawendi), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লুইস ই. ব্রুস (Louis E. Brus) এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যালেক্সেই আই. একিমোভ (Alexei I. Ekimov) একত্রে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। মূলত কোয়ান্টাম ডটস বা সেমিকন্ডাক্টর ন্যানোক্রিস্টাল কণার আবিষ্কার এবং এর সংশ্লেষণের জন্য উক্ত তিন বিজ্ঞানীকে রসায়নে নোবেল প্রদান করা হয়েছে। এই আবিষ্কারের ফলে টিভি বা এলইডি ল্যাম্পের মতো ইলেকট্রনিক সামগ্রীতেও বদল আসতে পারে।
চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল :- ২০২৩ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ক্যাটালিন কারিকো (Katalin Karikó) এবং ড্রিউ ওয়েইসম্যানকে (Drew Weissman) নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। ২০১৯ গোটা বিশ্বের কাছে ছিল আতঙ্কের, হাহাকারের, কারণ কোভিড-১৯ নামক মারণ ভাইরাস থাবা বসিয়েছিল এই মানবসভ্যতার ওপর। উক্ত নোবেলবিজয়ী দুই বিজ্ঞানী নিউক্লিওসাইড বেস পরিবর্তন সংক্রান্ত তাঁদের গবেষণার সাহায্যে সেই মারন ভাইরাস কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এমআরএনএ(mRNA) টীকার বিকাশে সহায়তা করেছে। ২০০৫ সালে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণাপত্রের উপর ভিত্তি করেই ২০২০ সালে দুটি এমআরএনএ টীকা তৈরি হয়েছিল, যা অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিল। এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য নোবেল কমিটি তাঁদের সম্মান জানিয়েছে।
সাহিত্যে নোবেল :- ২০২৩ সালে সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য নোবেল পেয়েছেন জন ফস (Jon Fosse)। নাটক, উপন্যাস, কবিতা এমনকি শিশুসাহিত্য—সাহিত্যের সব শাখাতেই তাঁর প্রায় সমান দক্ষতার সঙ্গে বিচরণ লক্ষণীয়। মূলত তাঁর অত্যাশ্চর্য নাট্যসাহিত্য এবং গদ্যসাহিত্য, যা পিছিয়ে পড়া মানুষের কথা বলে—তার জন্যই নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয় তাঁকে। তাঁর সাহিত্য যেন মূক মুখে ভাষা জুগিয়েছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার :- ২০২৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে ইরানের সমাজকর্মী নার্গিস মহম্মদিকে (Narges Mohammadi)। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানবাধিকার, নারীদের ওপর নিপীড়ন এবং নারী-স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে চলেছেন। ইরানে নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সকলের জন্য মানবাধিকার ও স্বাধীনতার প্রচার করায় তাঁকে এবছর নোবেল শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছে। তাঁর লড়াইয়ের জন্য তাঁকে মোট ১৩ বার গ্রেপ্তার এবং পাঁচবার দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং মোট ৩১ বছর জেলের সাজা এবং ১৫৪ বার বেত্রাঘাতের শাস্তিও পেতে হয়েছে। এমনকি এখনও নার্গিস জেলেই বন্দী।
অর্থনীতিতে নোবেল :- ২০২৩ সালে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য নোবেল পেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ক্লডিয়া গোল্ডিন (Claudia Goldin)। মূলত শ্রম বাজারে নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের ধারণার অগ্রগতিতে সাহায্য করবার জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। নারীর উপার্জন এবং শ্রম বাজারে তাদের ভূমিকা নিয়ে তাঁর দীর্ঘ এবং অত্যন্ত মূল্যবান গবেষণা যা আমাদের ধারণাকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে, তাকে যথাযোগ্য স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল কমিটি। এই গবেষণায় লিঙ্গ বৈষম্যের প্রধান কারণগুলিকেও তুলে ধরেছেন ক্লডিয়া।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান