সববাংলায়

অজয় কর

অজয় কর (Ajoy Kar) ছিলেন একজন বিখ্যাত বাঙালি চিত্রপরিচালক ও দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফার। তিনি ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’ ইত্যাদির মতো বেশ কিছু কালজয়ী সিনেমা যেমন নির্মাণ করেছিলেন, তেমনই সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে বহু পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ও কিছু তথ্যচিত্রের শুটিংও করেছিলেন। সিনেমা পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি গতানুগতিক ভাবনার বাইরে গিয়ে নানারকম নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ করেন। এছাড়া উত্তম-সুচিত্রার মতো রোমান্টিক হিট জুটিকে তিনি অভিনবভাবে নিজের সিনেমায় উপস্থাপিত করেছিলেন। চিত্রপরিচালনার পাশাপাশি ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ছিল তাঁর নিজস্ব মুন্সিয়ানা। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রে রয়েছে অসাধারণ ক্যামেরার কাজ, শক্তিশালী চিত্রনাট্য ও সঠিক কাস্টিং – যা দর্শককে মুগ্ধ করেছিল এবং সমালোচকদের প্রশংসাও পেয়েছিল।

১৯১৪ সালের ২৭ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কলকাতায় অজয় করের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ডা. প্রমোদচন্দ্র কর ও মায়ের নাম সুহাসিনী কর। তাঁর বাবা ছিলেন রেলের ডাক্তার। তাঁদের আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার তেঘরিয়া গ্রাম। তাঁরা মোট আট ভাই-বোন ছিলেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল অচ্চিদানন্দ কর তবে তাঁর এই নাম পরিবর্তনের কোনও কারণ জানা যায়নি। তাঁর স্ত্রীর নাম গৌরি কর ও মেয়ের নাম কৃষ্ণা কর।

বাবা প্রমোদচন্দ্রের বদলির চাকরির সুবাদে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে অজয় করের শৈশবে কেটেছিল। পরে তাঁকে ও তাঁর ভাইদের পড়াশোনার জন্য মামাবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৯২৭ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেন। তারপর তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য ভর্তি হলেও, তা শেষ করা হয়নি। ছোটবেলা থেকেই অজয় করের ফটোগ্রাফির প্রতি তীব্র আগ্রহ ছিল। তাই কলেজ ছেড়ে তিনি পেশাদারি ফটোগ্রাফি শুরু করেন ও পরবর্তীকালে সিনেমাটোগ্রাফির কাজ করেন।

এক নজরে অজয় করের জীবনী:

  • জন্ম: ২৭ মার্চ, ১৯১৪
  • মৃত্যু: ২৫ জানুয়ারি, ১৯৮৫
  • কেন বিখ্যাত: অজয় কর একজন বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ও দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফার। তিনি একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন, যেমন ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, শ্যামলী’ ইত্যাদি।
  • পুরস্কার: বিভিন্ন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বারেবারে ভূষিত হয়েছে তাঁর পরিচালিত ছবি। অষ্টাদশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘মাল্যবান’ সেরা বাংলা সিনেমার স্বীকৃতি পায়।

১৯৩২ সালে মামা সতীশ ঘোষের সাহায্যে ম্যাডান থিয়েটারের ক্যামেরাম্যান যতীন দাশের সঙ্গে পরিচয় হয় অজয় করের। যতীন দাশের সুপারিশে তিনি ১৯৩৩ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রসেসিং ল্যাবরেটরিতে কাজ পান। পরে ১৯৩৫ সালে তিনি যতীন দাশের সহকারী ফটোগ্রাফার হিসাবে কাজ শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতার ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে একজন সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে কাজ শুরু করেন অজয় কর। তিনি সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে শুধু প্রচলিত ধারণা নয় বরং নতুন শৈল্পিক ভাবনার প্রয়োগও করতেন। তিনি হলিউড সিনেমার বিখ্যাত ক্যামেরাম্যানদের কাজ ও বিদেশি নানা পত্রিকার ফটোগ্রাফ খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে তিনি চারু রায়ের ‘পথিক’ সিনেমাতে প্রথম স্বাধীন ফটোগ্রাফার হিসাবে কাজ করেন। তারপর তিনি দেবকী বসু, সত্যেন বসু, হেমেন গুপ্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকদের সিনেমাতেও সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে কাজ করেছিলেন।

অজয় কর ‘সব্যসাচী’ গোষ্ঠীর পরিচালক হিসাবে তৈরি করেন ‘অনন্যা’ সিনেমাটি, যা মুক্তি পায় ১৯৪৯ সালে। অজয় কর ছাড়াও এই গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন কানন দেবী ও বিনয় চট্টোপাধ্যায়। এককভাবে পরিচালিত তাঁর প্রথম ছবি ‘বামুনের মেয়ে’ ১৯৪৯ সালে মুক্তি পায়। অজয় কর চিত্রপরিচালনার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সিনেমা ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হলেও, তা কখনই পুরোপুরি অনুকরণ করতেন না। হলিউড সিনেমা ‘দ্য হাউন্ড অব দ্যা বাসকারভিলস’-এর (The Hound of the Baskervilles) সঙ্গে নিজস্ব চলচ্চিত্র ভাবনা ও শৈল্পিক কৌশলকে যুক্ত করে পরিচালনা করেন ‘জিঘাংসা’ (১৯৫১ সাল) সিনেমাটি। এই সিনেমাই অজয় করকে প্রথম পরিচালক হিসাবে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এটি রহস্য-রোমাঞ্চে ঘেরা প্রথম বাংলা ছবি যা বাণিজ্যিক দিক থেকে দারুণ সফল হয়েছিল। হলিউডের চিত্রপরিচালকদের মধ্যে অ্যালফ্রেড হিচকক ছিলেন অজয়ের প্রিয় পরিচালক। ডিটেকটিভ সিনেমা তৈরি করার ক্ষেত্রে অজয় কর হিচকককেই অনুসরণ করতেন। অ্যালফ্রেড হিচককের ‘রোপ’ (Rope) সিনেমাটি তিনি খুবই ভালবাসতেন। তিনি মাদ্রাজে গিয়ে সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে ১৯৫২ সালে ‘পল্লীতরু’ নামক তামিল ও ‘ভায়ারি ভামা’ নামক তেলেগু ছবিতে কাজ করেন। এরপর বোম্বাইয়ে ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। সেই সময় গুরু দত্তের সঙ্গে ‘সৈলাব’ ও হেমেন গুপ্তের সঙ্গে ‘কশ্তী’ সিনেমাতে কাজ করনে।

এরপর তিনি কলকাতায় এসে চলচ্চিত্র পরিচালায় মন দেন, তৈরি করেন জনপ্রিয় সিনেমা – ‘শ্যামলী’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘বর্ণালী’, ‘কাঁচ কাটা হীরে’ ইত্যাদি। অজয় করের ‘সপ্তপদী’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘হারানো সুর’-এ উত্তম-সুচিত্রার অভিনয়ের পাশাপাশি এই সিনেমাগুলির অসাধারণ চিত্রনাট্য, ক্যামেরার কাজ, কাহিনী দর্শকের পক্ষে সহজে ভোলা সম্ভব নয়। উত্তমকুমারের সঙ্গে অজয় কর ‘আলোছায়া প্রোডাকশন’ তৈরি করেন, সেই প্রোডাকশন হাউস থেকেই মুক্তি পায় বাংলা সিনেমা জগতের অন্যতম সেরা ছবি ‘হারানো সুর’ (১৯৫৭)। অজয় কর ছিলেন এই সিনেমার পরিচালক ও ফটোগ্রাফার। ‘হারানো সুর’ ১৯৪২ সালের অস্কার মনোনীত সিনেমা ‘র‍্যানডম হারভেস্ট’-এর (Random Harvest) অনুসরণে তৈরি করেছিলেন তিনি। এরপর তিনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘সপ্তপদী’র উপর ভিত্তি করে তৈরি করেন বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘সপ্তপদী’ (১৯৬১)। মূলত এই চলচ্চিত্রের জন্যই অজয় কর বাংলা সিনেমা জগতে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সিনেমার ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানে তিনি সুন্দরভাবে ব্যাক প্রোজেকশন পদ্ধতির ব্যবহার করেছিলেন। অনেকে অজয় করের এই কাজ দেখে তাঁকে বাংলা সিনেমার ব্যাক প্রোজেকশন পদ্ধতির জনক বলেও অভিহিত করেন। তাঁর পরিচালিত সিনেমাগুলিতে সিনেম্যাটিক এক্সেলেন্সের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। এককথায় বাংলা সিনেমায় তিনি বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। কাজের পাশাপাশি সহকর্মীদের সাথেও ছিল তাঁর মধুর সম্পর্ক। ‘প্রণয়পাশা’ ছবিতে অভিনয়ের পর সুচিত্রা সেন অবসর নিয়েছিলেন। যদিও অজয় করের সিনেমায় নিজের বয়সোচিত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন তিনি, তবে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। নিজের সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে অজয় কর অভিজ্ঞ অভিনেতাদেরই বেশি প্রাধান্য দিতেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন আনন্দপ্রিয় ও শৌখিন মানুষ। নিজের কাজের পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্বও তিনি দক্ষতার সঙ্গে পালন করতেন।

এছাড়া অজয় কর ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। রবীন্দ্র-রচনাবলী, শরৎ-রচনাবলী তিনি নিয়মিত পড়তেন। তিনি বেশ কিছু সাহিত্যকেন্দ্রিক সিনেমা তৈরি করেন, যেমন ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘বড়দিদি’, ‘পরিণীতা’, ‘মাল্যদান’, ‘দত্তা’, ‘নৌকাডুবি’ , ‘বিষবৃক্ষ’, ‘শুন বরনারী’ ইত্যাদি। তাঁর পরিচালিত শেষ সিনেমা ‘মধুবন’ (‘১৯৮৩ সাল)পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থ সাহায্যে তৈরি করা হয়েছিল।

অজয় কর কিছু সময়ের জন্য পুণের ফিল্ম ইন্সটিটিউটের কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকেও প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। এছাড়া মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার দক্ষিণী চলচ্চিত্রের নির্মাতা সি.ভি.শ্রীধর ও পি.এস.রামকৃষ্ণা রাও এবং বলিউডের অনিল গাঙ্গুলিও তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। অজয় করের ‘মাল্যদান’ ও ‘সাত পাকে বাঁধা’ সিনেমাদুটিকে পুনরুদ্ধার করে জাতীয় চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগারে সেগুলিকে ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে।

অজয় করের সিনেমাগুলি একদিকে যেমন বাণিজ্যিক দিক থেকে সফলতা পেয়েছিল আবার ওই সিনেমাগুলিকে বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কৃতও করা হয়। যেমন – পঞ্চম জাতীয় চলচ্চিত্র অ্যাওয়ার্ড শোতে ‘হারানো সুর’ বাংলা ভাষার তৃতীয় সেরা চলচ্চিত্রের জন্য মেরিট সার্টিফিকেট পেয়েছিল। আবার নবম জাতীয় চলচ্চিত্র অ্যাওয়ার্ড শোতে ‘সপ্তপদী’ সিনেমা দ্বিতীয় সেরা বাংলা সিনেমা হিসাবে মনোনীত হয়। এরপর একাদশ জাতীয় চলচ্চিত্র অ্যাওয়ার্ড শোতে ‘সাত পাকে বাঁধা’ সিনেমাকে দ্বিতীয় সেরা বাংলা চলচ্চিত্র হিসাবে পুরস্কৃত করা হয়। অষ্টাদশ জাতীয় চলচ্চিত্র অ্যাওয়ার্ড শোতে বাংলা ভাষার সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের সম্মান পায় অজয় করের ‘মাল্যদান’ সিনেমাটি। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও তাঁর সিনেমাগুলি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। মস্কোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (১৯৬৩ সাল) গ্র্যান্ড পিক্সের জন্য মনোনীত করা হয় ‘সপ্তপদী’ সিনেমাটিকে। ১৯৭১ সালে সেরা আঞ্চলিক চলচ্চিত্র পুরষ্কার পায় ‘মাল্যদান’ সিনেমাটি পরের বছর বিএফজেএতে (BFJA) সেরা ভারতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারও লাভ করে সিনেমাটি। এছাড়া ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সপ্তপদী’ সিনেমাকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়। অন্যদিকে ‘সাত পাকে বাঁধা’ সিনেমায় অসাধারণ অভিনয়ের জন্য মস্কো আন্তর্জাতিক ফিল্ম উৎসবে সুচিত্রা সেনকে রুপোর পদক দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।

১৯৮৫ সালের ২৫ জানুয়ারি হৃদ-রোগে আক্রান্ত হয়ে অজয় করের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading