সববাংলায়

চট্টেশ্বরী মন্দির

বিভাগঃ ,

হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান উপাস্য দেবী হলেন মা কালী। বাঙালিদের এক বড় অংশ মা কালীর ভক্ত এবং তারা শাক্ত ধর্মে বিশ্বাস করে। তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে পূজিতা হন। মা কালীর তেমনই একটি রূপ দেবী চট্টেশ্বরীর পূজা করা হয় বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। বিশ্বাস করা হয় চট্টগ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপে তিনি সুপ্রাচীন চট্টেশ্বরী মন্দিরে (Chatteshwari Temple) বা শ্রী শ্রী চট্টেশ্বরী কালী মন্দিরে অবস্থান করেন। চট্টগ্রাম নামটিও দেবীর নাম অনুসারে রাখা হয়েছে বলে মনে করা হয়। এই মন্দিরটিকে বাংলার একটি শক্তিপীঠ হিসেবে মনে করা হয়, যদিও এখানে দেবী সতীর কোন অঙ্গ পড়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা এই মন্দিরটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই সময় তারা মূল মন্দিরের সেবায়েতের বাড়ি ও বিগ্রহ নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এই আক্রমণের ফলে মন্দিরের ও দেবীর প্রাচীন মূর্তিটি অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছিল। কিন্তু তাও আজও বাংলাদেশের হিন্দু মন্দিরগুলির মধ্যে নিজের চিরন্তন ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চট্টেশ্বরী মন্দিরটি।

চট্টেশ্বরী মন্দিরকে একটি শক্তিপীঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা বিশেষত শাক্ত ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা পূজিত একটি পবিত্র স্থান। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী নিজের বাপের বাড়িতে বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন। মাতা সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌঁছতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব সেই দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য চালু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন।  সেই দেহখন্ডগুলোই যে যে স্থানে পড়েছিল  সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়। তবে চট্টেশ্বরী মন্দিরে দেবী সতীর দেহের কোন অংশ পড়েছিল তা সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি।

চট্টেশ্বরী মন্দির কে নির্মাণ করেছিলেন, তা নিয়ে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। একটি জনশ্রুতি অনুসারে, প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর আগে আর্য ঋষি, যোগী ও সাধু-সন্ন্যাসীরা এই মন্দির তৈরি করেছিলেন। কোনও মতে আদি মন্দিরটির অবস্থান ছিল একটি গাছতলায়, আবার কোনও মতে আদি মন্দিরটি একটি পর্ণকুটিরে ছিল। পরবর্তীকালে আদি মন্দিরের জায়গায় একটি মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করে, খ্রিষাণগীর নামক একজন মহারাজ স্বপ্নে দক্ষিণা কালী মায়ের আদেশ পেয়ে আঠারো শতকে চট্টেশ্বরী মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তারপর পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় ওই মন্দিরটির ব্যাপক ক্ষতি করেছিল। এরপর চক্রবর্তী পরিবারের সদস্য তারাপদ চক্রবর্তী চট্টেশ্বরী মন্দিরের পুনঃনির্মাণ করেছিলেন। 

চট্টেশ্বরী মন্দিরের জটিল খোদাই এবং একটি সুউচ্চ কাঠামো ভক্তদের বিস্মিত করে। মন্দিরের মূল প্রবেশপথ থেকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে মূল ফটকের মধ্যে দিয়ে একটি বাঁধানো চত্বর দিয়ে ভক্তরা প্রবেশ করে। এই চত্বরটির বাঁদিকে কালী মন্দির ও ডানদিকে রয়েছে শিব মন্দির। এই শিব মন্দিরের পাশে আছে একটি কুণ্ড বা পবিত্র জলাশয়। শিব এখানে ভৈরবরূপে দেবী সতীর কুণ্ডকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস করা হয়। এই মন্দিরের নিত্য মণ্ডপে নিয়মিত দেবীর পূজা-অর্চনা করা হয়। এই মন্ডপ মন্দিরের শান্ত পরিবেশকে আরও নির্মল করে তোলে। এখানে শাক্ত রীতি অনুসারে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান করা হয়। মন্দিরের দেওয়ালের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী হিন্দু চিত্রকলার সাথে স্থানীয় শিল্পের মিশ্রণ দেখা যায়, যা দর্শকদের মনে ভক্তিভাব জাগিয়ে তোলে। কেউ কেউ আবার মনে করে যে, এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে উত্তর ভারতীয় মন্দিরগুলির সাদৃশ্য রয়েছে। এই মন্দিরের প্রধান গর্ভগৃহে দেবী কালীর পুজো করা হয়। মন্দিরের পেছনে একটি ছোট, সুন্দর বাগানের মধ্যে একটি পঞ্চমুণ্ডি আসন রয়েছে। এই আসনটি প্রাচীন তান্ত্রিক ব্রহ্মচারীরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে মনে করা হয়। বর্তমানে এটি একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রাচীন ইতিহাস, শাক্তধর্মের তান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং বিশেষ স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ ঘটেছে মন্দিরের প্রতিটি কোণায়। সবকিছু মিলিয়ে এই মন্দির দর্শনার্থীদের এক সমৃদ্ধশালী সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা দ্বারা আনন্দিত করে।

চট্টেশ্বরী মন্দিরের মা কালীর প্রাচীন মূর্তিটি নিম কাঠের ছিল। তবে এখন সেই প্রাচীন মূর্তিটি আর মন্দিরে নেই। এই প্রাচীন মূর্তিটি বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিধ্বস্ত মূর্তিটির কিছু অংশ উদ্ধার করে সেগুলি দিয়ে বেনারসে একটি নতুন মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মন্ত্রী তরুণ কান্তি ঘোষ ও তাঁর পরিবার ওই মূর্তিটি চট্টেশ্বরী মন্দিরে দান করেছিলেন। বাংলাদেশ সরকারও এই মূর্তি পুনঃনির্মাণে প্রত্যক্ষ ভাবে সহযোগিতা করেছিল। তারপর ভারত থেকে বিমানে করে ওই মূর্তিটি বাংলাদেশের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। 

চট্টেশ্বরী মন্দিরের কালী মায়ের মূর্তি আরাধনা করলে জাগতিক ও পারমার্থিক ফললাভ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। এই মন্দিরের বর্তমান মূর্তিটি কষ্টিপাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে। মা কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ রূপ দক্ষিণা কালীর এই মূর্তিটি বহু রত্ন, নানা ধরনের অলংকার দ্বারা সজ্জিত থাকে। মা দক্ষিণাকালী, দক্ষিণ দিকের অধিষ্ঠাত্রী, যাকে দেখে যমও ভয় পায়। চতুর্ভুজা এই দেবীর উপরের বাম হাতে খড়্গ ও নীচের বাম হাতে ছিন্ন নরমুণ্ড রয়েছে। এছাড়া উপরের ডান হাতে রয়েছে অভয় মুদ্রা আর নীচের ডান হাতে আছে বর মুদ্রা। তাঁর গায়ের রঙ কালো, তিনি মুক্তকেশী ও স্নিগ্ধ হাস্যময়ী। এই দেবীর পায়ের তলায় শায়িত শিবের মূর্তিটি শ্বেতপাথরের। এখানে ভক্তরা মায়ের শান্ত ও সুন্দর করুণাময় দৃষ্টি দ্বারা মোহিত হয়ে দেবীর দর্শনলাভ করতে আসেন। 

এই মন্দিরের প্রধান উৎসব হল শ্যামাপূজা। এই সময় দেবীর আরাধনা করে অশুভ শক্তিকে সরিয়ে শুভশক্তির আগমন করার জন্য ও জীবনে শান্তি এবং সাফল্য কামনার জন্য ভক্তরা প্রার্থনা করে। ভক্তরা বিশ্বাস করে যে, এই মন্দিরে দেবীর পূজা করলে জাগতিক ও পারমার্থিক সবরকম সুখ লাভ হয় ও ভক্তদের সকল মনোবাঞ্চা পূরণ হয়। মহাসমারোহে ধুমধাম করে এই মন্দিরে কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপূজা করা হয়। এই সময় তান্ত্রিক আচার মেনে, নানা মন্ত্র জপ করে দেবীর আরাধনা করা হয়, দেবীকে বিভিন্ন প্রসাদ দেওয়া হয়। এই পূজা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণের চারিদিক নানা রঙের আলো দ্বারা সজ্জিত করা হয়। পূর্বে এই পূজার সময় প্রচুর ছাগল বলি করা হলেও, বর্তমানে আর আগের মতো বেশি সংখ্যক ছাগল বলি দেওয়া হয় না। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, একসময় এই মন্দিরে পূজা উপলক্ষে প্রায় ৩০০ ছাগল বলি দেওয়া হতো। সারা বছরে এই মন্দিরে ভক্তদের আগমন হলেও কালীপূজার সময় প্রচুর তীর্থযাত্রীর আগমন হয়। এছাড়াও দুর্গাপূজা বা হিন্দুদের অন্যান্য পূজা পার্বণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অনেক ভক্তসমাগম হয়। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading