জোনাস স্যাক

জোনাস সাল্ক

বিশ্বে প্রথম সফলভাবে পোলিও টিকা আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন আমেরিকান জীবাণু বিশেষজ্ঞ জোনাস সাল্ক (Jonas Salk)। ১৯৪০ এবং ১৯৫০-এর দশকে পোলিওমাইলাইটিস ভাইরাসের আক্রমণে শিশুদের পঙ্গুত্ব এক অনিবার্য ঘটনা ছিল। এই প্রাণঘাতী পোলিও রোগের বিরুদ্ধে টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে জোনাস সাল্ক সমগ্র বিশ্বে মানুষের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিন থেকে ডাক্তারি পাশ করে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে কিছুদিন চিকিৎসা করেন তিনি এবং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের টিকা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৪৭ সাল থেকে সেন্ট পিটসবার্গ স্কুল অফ মেডিসিন-এ অণুজীব সংক্রান্ত গবেষণা করতে করতেই পোলিও রোগের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। তাঁর এই আবিষ্কারের কারণেই ১৯৬০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা যেখানে ছিল প্রায় ৪৫ হাজার জন, তা দুই বছরের মধ্যে কমে ৯১০ জনে নেমে আসে। কিন্তু এই টিকা আবিষ্কারের কোনো পেটেন্ট করাননি তিনি, আপামর বিশ্বের মানুষের সেবায় নিয়োজিত জোনাস সাল্কের এই যুগান্তকারী গবেষণা এবং আবিষ্কারের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬৩ সালে লা জোলায় তাঁর নামে স্থাপিত হয় ‘সাল্ক ইনস্টিটিউট’। ‘ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউণ্ডেশন’ তাঁকে ২ কোটি ডলার অর্থ সাহায্য করেছিল।

১৯১৪ সালের ২৮ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটিতে একটি ইহুদি পরিবারে জোনাস সাল্কের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ড্যানিয়েল সাল্ক এবং তাঁর মা ডোরা সাল্ক উভয়েই ধর্মীয় পরিচয়ে ছিলেন আশকেনাজি ইহুদি। স্যাকের বাবা ড্যানিয়েলের জন্ম হয়েছিল নিউ জার্সিতে এবং তাঁর মা ডোরার জন্মেছিলেন মিনস্কে। পরে দুজনেই অভিবাসিত হয়ে চলে আসেন নিউ ইয়র্ক সিটিতে। জোনাস স্যাকের আরো দুই ভাই ছিল হার্ম্যান ও লি নামে। তাঁর জন্মের কিছুদিন পরে তাঁর পরিবার ইস্ট হার্লেম থেকে প্রথমে ব্রঙ্কসের এলসমার প্লেসে এবং পরে অ্যার্ভার্নের কুইন্সে চলে আসেন।

১৩ বছর বয়সে টাউনসেণ্ড হ্যারিস হাই স্কুলে ভর্তি হন জোনাস সাল্ক । স্কুলে পড়ার সময় হাতের সামনে যা পেতেন তাই গোগ্রাসে পড়ে ফেলতেন তিনি। অদ্ভুতভাবে চার বছরের পাঠক্রমের পড়া মাত্র তিন বছরে সমাপ্ত করার জন্য বাধ্য করা হত ঐ স্কুলে যার ফলে বহু ছাত্র পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হত। যদিও ঐ স্কুল থেকে যারা স্নাতক উত্তীর্ণ হত তারা সহজেই সিটি কলেজ অফ নিউ ইয়র্কে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলত। সাল্কও এই সিটি কলেজ অফ নিউ ইয়র্কে ভর্তি হন এবং ১৯৩৪ সালে রসায়নশাস্ত্রে বি.এস.সি ডিগ্রি অর্জন করেন। এই কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা হত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে, কিন্তু যারা সুযোগ পেত পড়াশোনা করার তারা সম্পূর্ণ নিখরচায় পড়াশোনা করতে পারত এবং ডিগ্রি অর্জন করত। তাঁর মায়ের একান্ত উৎসাহেই আইন পড়ার বদলে ডাক্তারি পড়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন সাল্ক । মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই কলেজে পড়তে আসেন সাল্ক, কিন্তু ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে তাঁর খুব একটা ছিল না। পরবর্তীকালে ‘অ্যাকাডেমি অফ অ্যাচিভমেন্ট’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন যে ঐ বয়সে তাঁর বিজ্ঞান পড়ার প্রতি কোনো আগ্রহই ছিল না। এমনকি তাঁর পরিবারে তিনিই ছিলেন প্রথম কলেজ-পড়ুয়া। সিটি কলেজ থেকে পাশ করে ডাক্তারি পড়ার জন্য স্যাক ভর্তি হন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সময় পড়াশোনার পাশাপাশি ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান এবং গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প কাউন্সেলর হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি। ডাক্তারি পড়লেও তিনি নিজে কখনো ডাক্তারি অভ্যাস করবেন না মনস্থির করেছিলেন, তাই ক্রমেই চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণার দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। ডাক্তারি পড়া এক বছরের জন্য বন্ধ দিয়ে পরে জৈব রসায়ন পড়তে শুরু করেন তিনি এবং ক্রমেই জীবাণুবিদ্যার প্রতি মনোনিবেশ করেন। মানবজাতির হিতসাধনই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল। ১৯৩৯ সালে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা ও ঔষধশাস্ত্রে স্নাতক উত্তীর্ণ হন স্যাক। এই সময় থেকেই নিউ ইয়র্কের মর্যাদাপূর্ণ মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে থাকতে শুরু করেছিলেন সাল্ক। ১৯৪১ সালে জীবাণুবিদ্যায় স্নাতকোত্তর স্তরে গবেষণার সময় স্যাক মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফ্রান্সিসের গবেষণাগারে দুই মাসের জন্য কাজের অনুমতি পান। এরপরে টমাস ফ্রান্সিসের সঙ্গে ‘ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান স্কুল অফ পাবলিক হেল্‌থ’-এ ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের টিকা আবিষ্কার করার কাজে নিয়োজিত হন জোনাস সাল্ক। ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের একটি বিশেষ প্রভাবশালী স্ট্রেন আবিষ্কার করে চূড়ান্ত টিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন সাল্ক এবং তাঁদের আবিষ্কৃত টিকা বহুল ভাবে সেনাবাহিনীর শিবিরগুলিতে ব্যবহৃত হতে থাকে।

১৯৪৭ সালে নিজের একটি গবেষণাগার তৈরির জন্য উৎসুক হয়ে ওঠেন সাল্ক এবং সেন্ট পিটসবার্গ স্কুল অফ মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার জন্য অনুমোদন পান। ১৯৪৮ সালে ন্যাশনাল ফাউণ্ডেশন ফর ইনফ্যান্টাইল প্যারালাইসিস সংস্থার পরিচালক হ্যারি ওয়েভার সাল্কের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অতিরিক্ত স্থান, গবেষণার উপযোগী সমস্ত সরঞ্জাম সরবরাহ করে পোলিও রোগের জীবাণুর কোনো অপরিচিত স্ট্রেন আছে কিনা তা অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেন। সেকালে পোলিওর মাত্র তিনটি স্ট্রেনই পরিচিত ছিল, কিন্তু আরো অন্য স্ট্রেন খুঁজতে আগ্রহী ছিলেন হ্যারি। শুধু গবেষণাগার কিংবা সরঞ্জামই নয়, একটি গোটা গবেষণা সহায়ক দলকেও জোনাস সাল্কের সঙ্গে নিযুক্ত করেন তিনি। সেই দলে ছিলেন জুলিয়াস ইয়ঙ্গার, বায়রন বেনেট, এল জেমস লুইস এবং সম্পাদক লোরেন ফ্রিডম্যান। ক্রমে ক্রমে মেলন পরিবারের পক্ষ থেকে সাল্ক অনুদান পেতে শুরু করেন এবং জীবাণুবিদ্যার গবেষণার উপযোগী একটি গবেষণাগার তৈরি করতে সক্ষম হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল ফাউণ্ডেশন ফর ইনফ্যান্টাইল প্যারালাইসিস’-এর পোলিও কর্মসূচিতে যুক্ত হন জোনাস সাল্ক । সেই সময় পোলিও একটা প্রাণঘাতী মারণ রোগ ছিল। তাঁর এই গবেষণার কথা প্রচার হয়ে যাওয়ায় নানা জায়গা থেকে অনুদান পেতে শুরু করেন সাল্ক । ১৯৫৫ সাল নাগাদ পোলিও নিয়ে স্যাকের গবেষণার কাজে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি ৭০ লক্ষ ডলার। স্যাক সিদ্ধান্ত নেন যে এই পোলিও টিকায় নিষ্ক্রিয় জীবাণুর বদলে মৃত পোলিও জীবাণু রাখা হবে যা কিনা তুলনায় বেশি নিরাপদ। একইসময় অ্যালবার্ট স্যাবিন পোলিওর ওরাল ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের চেষ্টা করছিলেন নিষ্ক্রিয় জীবাণুর সাহায্যে। ১৯৫২ সালের ২ জুলাই গবেষণাগারে সফল পরীক্ষার পরে ৪৩ জন শিশুর শরীরে সাল্ক এই ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করেন। কয়েক সপ্তাহ পরে পোল্ক স্টেট স্কুলের মানসিক ভারসাম্যহীন শিশুদের উপরেও এই টিকা প্রয়োগ করেন সাল্ক । ১৯৫৩ সালে নিজের সন্তানকেও এই টিকা প্রয়োগ করেন তিনি। ১৯৫৪ সালের মধ্যে প্রায় দশ লক্ষ শিশুর উপর এই টিকা প্রয়োগ করেন সাল্ক যাদেরকে পোলিও পথনির্দেশক বলে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৫৫ সালের ১২ এপ্রিল বিশ্বজনীনভাবে নিরাপদ টিকার স্বীকৃতি পায় জোনাস সাল্কের আবিষ্কৃত পোলিও টিকা। ‘মার্চ অফ ডাইমস’ সংস্থা এই গবেষণায় এবং পোলিও টিকা আবিষ্কারের জন্য নিজেদের দেউলিয়া করেও পোলিও টিকার চূড়ান্ত উন্নয়নের জন্য অর্থ সরবরাহ করেছিল। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে জোনাস সাল্ক পোলিও রোগের টিকা আবিষ্কারের গবেষণায় নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৫৫ সালের শেষ দিকে স্যাক নিষ্ক্রিয় জীবাণুর সাহায্যে পোলিও টিকা তৈরি করেন এবং তা প্রকাশ্যে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অপরিহার্য ঔষধের তালিকায় এই পোলিও টিকা ক্রমে অত্যাবশ্যকীয় এবং অপরিহার্য ঔষধ হিসেবে স্থান পায় যা বিশ্বের মানব সমাজের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চলমান ও সবল রাখার সহায়ক হিসেবে কাজ করতে থাকে।

১৯৬৩ সালে জোনাস সাল্কের উদ্যোগে সান দিয়েগোতে স্থাপিত হয় ‘সাল্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিস’ নামে একটি গবেষণা সংস্থা। ১৯৮০-এর দশক থেকে সাল্ক এইডস-এর টিকা আবিষ্কারের জন্যেও গবেষণা শুরু করেছিলেন। এর জন্য কেভিন কিম্বারলির সঙ্গে তিনি তৈরি করেন ‘দ্য ইমিউন রেসপন্স’ সংস্থা।

১৯৫৫ সালে পোলিও টিকা আবিষ্কারের এক মাস পরেই পেনসিলভানিয়ার কমনওয়েলথ সংস্থা জোনাস সাল্ককে ‘মেধাবী কর্মদক্ষতা পদক’-এ ভূষিত করে। ১৯৫৬ সালে ল্যাস্কার পুরস্কার পান তিনি। এরপরে ১৯৫৮ সালে পোলিও হল অফ ফেম, ১৯৭৫ সালে জওহরলাল নেহেরু পুরস্কার এবং কংগ্রেসিয়াল স্বর্ণপদক, ১৯৭৬ সালে অ্যাকাডেমি অফ অ্যাচিভমেন্টের স্বর্ণপদক অর্জন করেন জোনাস স্যাক। ১৯৬৬ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা তাঁকে ‘জৈবদর্শনের জনক’ ( Father of Biophilosophy) অভিধায় ভূষিত করে। ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তাঁকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম’-এ সম্মানিত করে। এছাড়াও আরো বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন জোনাস স্যাক।

তাঁর লেখা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই হল – ‘ম্যান আনফোল্ডিং’ (১৯৭২), ‘সার্ভাইভ্যাল অফ দ্য ওয়াইসেস্ট’ (১৯৭৩), ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন অ্যাণ্ড হিউম্যান ভ্যালুস : এ নিউ রিয়্যালিটি’ (১৯৮১) এবং ‘অ্যানাটমি অফ রিয়েলিটি : মার্জিং অফ ইন্টিউশন অ্যাণ্ড রিজন’ (১৯৮৩)।

১৯৯৫ সালের ২৩ জুন ৮০ বছর বয়সে ক্যালিফোর্নিয়ার লা জোলায় জোনাস সাল্কের মৃত্যু হয়।                 

আপনার মতামত জানান