ভারতের ইতিহাস অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহে পরিপূর্ণ। তবে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ রয়েছে, যেগুলির সাহায্যে নতুন এক-একটি অধ্যায়ের সূত্রপাত ঘটেছে। তেমনই সব যুদ্ধের তালিকার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে পানিপথের যুদ্ধ (Battle of Panipat)। সেই ষোড়শ শতাব্দীতে সংঘটিত এই ঐতিহাসিক যুদ্ধের হাত ধরেই ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের সূচনা ঘটেছিল বলা যায়। ভারতে সংঘটিত যুদ্ধগুলির মধ্যে পানিপথের যুদ্ধ সেই প্রথমদিককার যুদ্ধগুলির মধ্যে একটি যেগুলিতে বন্দুক এবং কামানের ব্যবহার করা হয়েছিল। মোগল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বাবর ও আকবরের নাম এই যুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। উত্তর ভারতে সংঘটিত এই যুদ্ধে দিল্লি সালতানাতের সমাপ্তির ঘন্টা বেজে গিয়েছিল। পানিপথের প্রান্তে কেবলমাত্র একটি নয়, বিভিন্ন কারণে সর্বমোট তিনটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। পানিপথের তিনটি যুদ্ধ সম্পর্কেই নিম্নে বিশদে আলোচনা করা হল।
প্রথম পানিপথের যুদ্ধ :- প্রথম পানিপথের যুদ্ধ ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদি এবং হিন্দুস্থান জয়ের স্বপ্ন দেখা মধ্য এশিয়ার এক পরাক্রমশালী বীর যোদ্ধা ও শাসক বাবরের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। হরিয়ানা রাজ্যের পানিপথের ছোট্ট গ্রামের কাছে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।
দিল্লির সুলতান তখন ইব্রাহিম লোদি। তাঁর অত্যাচারে তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রাও তখন অতিষ্ঠ ও অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে দ্বিতীয়বার সমরকন্দ হারানোর পর বাবর ১৫১৯ সালে চেনাবের তীরে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুস্থান জয়ের দিকে মনোনিবেশ করেন। ১৫২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর লক্ষ্য ছিল কেবলমাত্র পাঞ্জাবে শাসন প্রসারিত করা কারণ, সেটা তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুর লঙের সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, এবং তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ে উত্তর ভারতের অধিকাংশ এলাকাই ছিল লোদি রাজবংশের ইব্রাহিম লোদির অধীনস্থ। তবে ইব্রাহিমের অত্যাচারের কারণেই পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খাঁ লোদি এবং ইব্রাহিম লোদির চাচা আলাউদ্দিন বাবরকে আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। বাবর ইব্রাহিমের কাছে এক দূত পাঠিয়ে নিজেকে এদেশের সিংহাসনের সঠিক উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি জানালে সেই দূতকে লাহোরে আটক করা হয় এবং কয়েক মাস পর মুক্তি দেওয়া হয়।
১৫২৪ সালে বাবর পাঞ্জাবের লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে দেখেন দৌলত খান ইব্রাহিম লোদীর পাঠানো বাহিনী দ্বারা বিতাড়িত হয়েছেন। বাবর লাহোর থেকে ১৫০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে দেপালপুরের দিকে অগ্রসর হন এবং ইব্রাহিমের দলত্যাগী আরেক চাচা আলম খাঁ-কে গভর্নর নিযুক্ত করেন। যদিও আলম খাঁ শীঘ্রই ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বাবর আলম খাঁ-এর বাহিনীকে শক্তিশালী করবার জন্য সৈন্য পাঠান এবং তারা পরে দৌলত খানের সঙ্গে যোগ দিয়ে দিল্লিতে ইব্রাহিম লোদিকে অবরোধ করেন। কিন্তু দলটি পুনরায় ইব্রাহিম লোদির কাছে পরাস্ত হলে বাবর বুঝতে পারেন ইব্রাহিম এত সহজে বাবরকে পাঞ্জাবের দখল ছেড়ে দেবেন না। বাবর সিরহিন্দ হয়ে দিল্লির দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। অবশেষে দিল্লির ৯৫ কিমি উত্তরে পানিপথের প্রান্তরে বাবর এবং ইব্রাহিম লোদির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
পানিপথের এই প্রথম যুদ্ধে অনুমান করা হয় বাবরের পক্ষে প্রায় ১৫,০০০ সৈন্যবাহিনী ছিল এবং বাবরের অনুমান অনুযায়ী, লোদির ৩০ থেকে ৪০ হাজার সৈন্য এবং কমপক্ষে ১০০০টি হাতি ছিল।
বাবরের বন্দুক এবং কামান ছিল অনেক কিন্তু লোদির তেমন কোন অস্ত্র ছিল না, উল্টে কামানের শব্দে লোদির হাতির দল আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। যুদ্ধে ইব্রাহিমের বিশেষ কোনো কৌশল ছিল না কিন্তু বাবরের তুলুঘমা এবং আরবা কৌশল লোদির সেনাবাহিনীকে কাবু করে ফেলেছিল। তুলুঘমার মানে সমস্ত সৈন্যকে ডান, বাম এবং কেন্দ্র, এরকম কয়েকটি ইউনিটে বিভক্ত করা। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেনাদের ইউনিট চারদিক থেকে শত্রুদের ঘিরে ফেলতে পারত অনায়াসেই। আরবা কৌশল হল, কেন্দ্রে সারি সারি প্রায় ৭০০টি গরুর গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, সেগুলি একটি আরেকটির সঙ্গে চামড়ার দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল, এবং সেই গাড়িগুলির পিছনে কামানগুলি স্থাপন করা হয়েছিল। এই দুই অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত যুদ্ধ কৌশলের সামনে লোদিবাহিনী ধরাশায়ী হয়ে পড়েছিল। ইব্রাহিম লোদি পিছু হটতে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন। তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।
যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির প্রায় ২০,০০০ সৈন্য নিহত হয়েছিল। লোদি বংশের ক্ষমতা চিরতরে লুপ্ত হয়ে যায়। দিল্লি ও আগ্রা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল বাবরের অধিকারভূক্ত হয়। তবে এই যুদ্ধে জিতেই ভারত মোগলদের অধিকারে আসেনি, তারজন্য মেবারের রাণা সংগ্রাম সিংহ এবং আফগানদের বিরুদ্ধে আরও দুটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল বাবরকে। সেই কারণেই ঐতিহাসিকরা বলেন, পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ছিল ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য স্থাপনের প্রথম সোপান।
দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ :- ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর পানিপথের প্রান্তরে মোগল সম্রাট আকবর এবং আদিল শাহের হিন্দু সেনাপতি, হিন্দুরাজ্য স্থাপনের স্বপ্নে বিভোর হিমুর মধ্যে দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ সংগঠিত হয়।
মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে আফগান বংশোদ্ভূত শের শাহ দিল্লির সিংহাসন অধিকার করে রাজ্যবিস্তার করতে থাকেন। দিল্লি, আগ্রা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সব অঞ্চল শের শাহের অধিকারে চলে যায়। ১৫৪৫ সালে কালিঞ্জরে এক দুর্ঘটনায় শের শাহের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র ইসলাম শাহ সিংহাসনে বসেন। তিনি একজন দক্ষ শাসক ছিলেন৷ ১৫৫৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ইসলাম শাহের নাবালক পুত্র ফিরোজ সিংহাসনে বসলে শের শাহের ভ্রাতুষ্পুত্র মহম্মদ আদিল শাহ তাঁকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করে নেন। অযোগ্য ও বিলাসী আদিলের সেনাপতি হিমু হিন্দু সাম্রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন, ফলে নানা বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই সুযোগ নিয়ে ১৫৫৫ সালে রাজ্যচ্যুত মোগল বাদশা হুমায়ুন আগ্রা, দিল্লি ও লাহোর জয় করে মোগল শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দিল্লির সিংহাসন দখলের পর সেবছরই ১৩ বছর বয়সী তাঁর নাবালক পুত্র আকবরকে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন হুমায়ুন। তখনও মোগল সাম্রাজ্য দিল্লি, আগ্রা ও পাঞ্জাব অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৫৫৬ সালে ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে হুমায়ুনের মৃত্যু হলে আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ তাঁকে পাঞ্জাবে দিল্লির বাদশা বলে ঘোষণা করেন। অন্যদিকে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর হিমু হারানো অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেখতে পান। বায়না, ইটাওয়া, ভরথানা, বিধুনা, লখনা, সম্বল, কাল্পি এবং নার্নৌল থেকে মুঘলদের তাড়িয়ে দেন তিনি। আগ্রা আক্রমণ করলে সেখানকার গভর্নর বিনাযুদ্ধে পালিয়ে যান। এরপর সেই গভর্নরকে অনুসরণ করে দিল্লির বাইরের তুঘলকাবাদ গ্রামে দিল্লির মোগল গভর্নর তারদি বেগ খানকে তুঘলকাবাদের যুদ্ধে পরাস্ত করেন এবং ১৫৫৬ সালে দিল্লির দখল নিয়ে বিক্রমাদিত্য উপাধি ধারণ করেন। এই খবর শুনে আকবর ও বৈরাম খাঁ দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ১৫৫৬ সালে ৫ নভেম্বর পানিপথের যুদ্ধে হিমু ও আকবরের সৈন্যরা মুখোমুখি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন।
মোগল সৈন্যকে আলি কুলি খান শাইবানি ১০,০০০ অশ্বারোহী বাহিনী এবং সিকান্দার খান উজবক ও আবদুল্লাহ খান উজবককে সঙ্গে নিয়ে নেতৃত্ব দান করেছিলেন। অন্যদিকে আফগানদের প্রায় ৩০,০০০ অশ্বারোহী বাহিনী ছিল এবং সৈন্য সংখ্যাও তুলনায় ছিল বেশি। হিমু নিজে তাঁর সেনাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
হিমু এবং তাঁর সেনারাই প্রথম আক্রমণ শুরু করেছিলেন। মোগলরাও পাল্টা হিমুর অশ্বারোহী বাহিনীকে আক্রমণ করে এবং মোগল তীরন্দাজরা ক্রমাগত তীর নিক্ষেপ করে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে দিতে থাকে৷ মোগল সৈন্যরা একটি গভীর গিরিখাতকে প্রতিরক্ষার কাজে লাগিয়েছিল। হিমুর হাতি বা ঘোড়া সেই খাদ অতিক্রম করে প্রতিপক্ষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। মোগলরা অন্যদিক থেকে নানা অস্ত্র নিক্ষেপ করে হিমুর সৈন্যকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে থাকে। হিমুর হাতিগুলিকে সরাসরি আঘাত করে দুর্বল করে দেওয়ার প্রয়াস করছিল মোগলেরা। ফলে হাতিদের ফিরিয়ে এনে আফগান আক্রমণ প্রত্যাহার করলে সেই সুযোগে আলি কুলি খান অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে আফগান সৈন্যকেন্দ্রে আক্রমণ করেন। এই সুযোগে হিমুও পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্ব দেন। হিমু মোগল কেন্দ্র চূর্ণ করবার জন্য তাঁর হাতি ও অশ্বের বাহিনীকে চালনা করে নিয়ে যান। মোগল সেনার উভয় শাখাই পিছু হটতে শুরু করেছিল। প্রবল পরাক্রমে মোগলদের প্রায় ধরাশায়ী করে দেওয়ার মুখে এসে একটি তীরের আঘাতে চোখে আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন হিমু। ফলে তাঁর সেনাবাহিনীরা ভয় পেয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে গেলে আফগানদের পরাজয় ঘটে। হিমুকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।
এই যুদ্ধে হিমুর পরাজয় তাঁর হিন্দুরাজ্য স্থাপনের স্বপ্নকে যেমন ভেঙে দিয়েছিল, তেমনই মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করেছিল।
তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ :- ১৭৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি মারাঠা সাম্রাজ্যের অষ্টম পেশোয়া বালাজি বাজিরাও এবং দুররানি সাম্রাজ্যের আফগান সম্রাট আহমেদ শাহ আবদালির মধ্যে পানিপথে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধটিকে ১৮ শতকের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বলা হয়ে থাকে।
ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে মোগল সাম্রাজ্যর ভিত শিথিল হতে শুরু করেছিল। সেসময় মারাঠারা দ্রুত তাদের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে শুরু করে। পেশোয়া প্রথম বাজিরাও-এর নেতৃত্বে গুজরাট, রাজপুতানা, মালওয়া মারাঠাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৭৩৭ সালে বাজিরাও দিল্লির উপকন্ঠে মোগলদের পরাস্ত করেন। আগ্রার অধিকাংশ মারাঠাদের অধীনে এসে যায়। অন্যদিকে ১৭৪৭ সালে আহমেদ শাহ আবদালি আফগানিস্তানে দুররানি সাম্রাজ্যের পত্তন করেন এবং পাঞ্জাবেও নিজস্ব শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম বাজি রাও-এর পুত্র বালাজি বাজি রাও ১৭৫৮ সালে পাঞ্জাব আক্রমণ করে মারাঠাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল বৃদ্ধি করলে এই ঘটনা আফগান সম্রাট আহমেদ শাহ আবদালিকে বিচলিত করে। পাঞ্জাবের শাসনকর্তা তাঁর পুত্র তৈমুর শাহকে পরাস্ত করে মারাঠা পেশোয়া বাজিরাও পাঞ্জাব দখল করেছিলেন। ফলে আহমেদ শাহ আবদালি পুনরায় আক্রমণ করে পাঞ্জাব দখল করেন ও দিল্লির দিকে অগ্রসর হন। সেসময় সদাশিব রাও এবং বিশ্বাস রাও-এর নেতৃত্বে মারাঠা বাহিনী আবদালিকে বাধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে যান। অন্যদিকে মারাঠাদের শক্তি বিস্তারে আতঙ্কিত হয়ে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও রোহিলা সর্দার নজির খাঁ আবদালির পক্ষে যোগ দেন। পানিপথের প্রান্তে ১৭৬১ সালে এই দুই পক্ষের তুমুল যুদ্ধ হয়।
মারাঠাদের পক্ষ থেকেই যুদ্ধ শুরু করা হয়। যুদ্ধের একটা পর্যায়ে মারাঠাদের হাতে বন্দী আফগান সৈন্যরা বিদ্রোহ শুরু করে। তারা ছদ্মবেশ ধারণ করে মারাঠা সৈন্যদের ভিতর থেকেই আক্রমণ শুরু করে ফলে মারাঠা সৈন্য শিবির বিভ্রান্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। রোহিলারাও যুদ্ধে আবদালিকে প্রভূত সাহায্য করেছিল। আবদালির নেতৃত্বে রোহিলা রাইফেলম্যানরা তলোয়ারে সজ্জিত মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনীকে গুলিতে বিদ্ধ করতে শুরু করেছিল। ক্রমে মারাঠারা শক্তি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়তে থাকে। আফগান ও তার সহযোগীদের পরাক্রম ও কৌশলে মারাঠারা প্রাণপণ লড়েও পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। অনেক প্রথম শ্রেণির মারাঠা সেনাপতি ও প্রায় ২০,০০০ মারাঠা সৈন্য যুদ্ধে নিহত হয়েছিল৷ যুদ্ধজয়ের পরে আবদালির সেনারা মারাঠাদের ধনরত্ন, হাতি, ঘোড়া, উট সব লুঠ করে, তাদের নির্বিচারে হত্যাও করে। পরাজয়ের খবর পেয়ে বালাজি বাজিরাও-এর মৃত্যু হয়।
এই যুদ্ধ নিয়ে নানা ঐতিহাসিকের নানা মত। কেউ বলেন মারাঠা জাতির স্বার্থের পক্ষে এই যুদ্ধ ছিল বিপর্যয়কর। আবার মারাঠা ঐতিহাসিকরা বলেন, এই পরাজয় মারাঠাদের জাতীয় বিপর্যয় বলা যায় না, কারণ আবদালি দিল্লিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি৷ কেউ আবার বলেন যুদ্ধের কিছুকাল পরে আবদালি মারাঠাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সন্ধি করতে বাধ্য হন এবং মারাঠাদের সাহায্যেই দিল্লিতে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ক্ষমতায় বসেন। অন্যদিকে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের মতে, এই পরাজয়ের ফলে মারাঠাদের হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে গিয়েছিল৷ মারাঠাদের পতনের ফলে ইংরেজরা দাক্ষিণাত্য ও বাংলাদেশে আধিপত্য স্থাপনের সুযোগ পায়। ইংরেজদের উত্থান রোধে ব্যর্থ হয় মারাঠারা। তাঁর মতে, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ ব্রিটিশ আধিপত্য স্থাপনের ভিতকে শক্ত করেছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’ (পুনর্মুদ্রণ), জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, জানুয়ারি, ২০২১
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://en.m.wikipedia.org
- https://www.pw.live//
- https://panipat.gov.in//
- https://www.jagranjosh.com/


আপনার মতামত জানান