ইতিহাস

বঙ্গদেশে শাড়ির বিবর্তন

শাড়িই বোধহয় বাঙালির একমাত্র পোশাক যা ভারত এবং দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে নারীরা বেশ আগ্রহ নিয়ে পরেন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা প্রবন্ধ ‘কোট বা চাপকান’-এ শাড়ির মাহাত্ম্য টের পাওয়া যায় – “আমাদের মধ্যে যাহারা বিলাতি পোশাক পরেন, স্ত্রীগণকে তাঁহারা শাড়ি পরাইয়া বাহির করিতে কুণ্ঠিত হন না। একাসনে গাড়ির দক্ষিণভাগে হ্যাট কোট, বামভাগে বোম্বাই শাড়ি।” বাঙালির শাড়ির বিবর্তন সম্বন্ধে আলোকপাত করতেই এই নিবন্ধ।

শাড়ি শব্দটির উৎস ‘শাট’ বা ‘শাটক’ শব্দজাত ‘শাটিকা’। শাটক শব্দের অর্থ সরু দৈর্ঘ্যের জোড়া দেয়া কাপড়। আচার্য সুকুমার সেনের মতে, বাংলায় তাঁতযন্ত্রের আবির্ভাবের আগে শটক বা জোড়া দেয়া কাপড় ব্যবহারের প্রচলন ছিল। এই শটক নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সবাই ব্যবহার করতেন। বাংলায় শাড়িকে জনপ্রিয় করার পেছনে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের অনেক অবদান রয়েছে। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী দেশি ছাঁদে শাড়ি পরার বদলে আধুনিক ধারায় শাড়ি পরা চালু করেছিলেন বাঙালি সমাজে। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রাচীন ভারতের পোশাক সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে তখন মেয়েরা আংটি, দুল, হার এসবের সঙ্গে পায়ের গোছা পর্যন্ত শাড়ি পরত। পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতায়, যেমন মিশর, রোম, গ্রিস প্রভৃতি দেশে সেলাই ছাড়া বস্ত্রের ব্যবহার চালু ছিল। সেলাই চালু হওয়ার পরে ঘাগরা, সালোয়ার, কুর্তা, কামিজের প্রচলন শুরু হয়। তবে কিছু কিছু এলাকায় সেলাইবিহীন কাপড় জড়ানোর রীতি টিকে যায়। এসব এলাকা হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, আসাম, কেরালা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, বিহার, পাঞ্জাব এবং পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ ও পাঞ্জাব। তাই শাড়ি শুধুমাত্র বাঙালি নারীর পরার পোশাক নয়, তবে বর্তমান যুগে বিশেষভাবে বাঙালি রমণীর পোশাক হিসেবেই শাড়ি বেশি পরিচিত। শ্রী মলয় রায় তাঁর ‘বাঙালির বেশবাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, “সুকুমার সেনের বক্তব্য অনুসরণ করে আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসতে হয়, ধুতি ও শাড়ির মধ্যে কোনো গুরুতর লিঙ্গভেদ সে-কালে মানা হত না।”

ধুতি এবং শাড়ির সমার্থক হওয়ার বিষয়টি কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের কাব্যে পাওয়া যায়। তিনি তাঁর কাব্যে সুরঙ্গ পাটের শাড়ি, তসরের শাড়ি, মেঘডম্বুর শাড়ি, ক্ষীরোদক শাড়ি, খুঞার ধুতি, খুঞার শাড়ি ও বিয়ে উপলক্ষে ব্যবহার্য মন্ত্রপূত হরিদ্রাযুত ধুতির উল্লেখ ছাড়াও বলেছেন – “তন্তুবায়ভুনি ধুতি খাদি বুনে গড়া।”

‘গড়া’ সর্বদা ব্যবহার্য মোটা কাপড় ও ‘খাদি’ খদ্দরের কাপড়। এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, নারীর বস্ত্র হিসেবে ‘শাড়ি’ নামটি কালের বিবর্তনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, যদিও ধুতি নামটি তখনও একেবারে হারিয়ে যায়নি। পনেরো-ষোল শতকে বাংলার নারীরা শুধু একখণ্ড শাড়ি গায়ে জড়াতেন। তখনও শাড়ি ব্যতীত নারীর ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনো বস্ত্রের প্রচলন হয়নি।

বাংলায় শাড়ির ব্যবহার সেই প্রাচীনকাল থেকেই, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের শাড়ির প্রচলন ছিল। প্রথমবার মা হওয়া উপলক্ষে নারীরা যে শাড়ি পরিবার থেকে উপহার পেতেন, তার নাম ছিল ‘অধ্যয়া’। এ শাড়ি হতো লাল রঙের। আবার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নারীরা পরতেন নীল শাড়ি, যার নাম ছিল ‘ব্রশতী’।

মধ্যযুগের সাহিত্য আমাদের শাড়ির দৈর্ঘ্যের পরিমাপ জানিয়ে দেয়, অর্থাৎ মধ্যযুগেই শাড়ির দৈর্ঘ্য ১২ হাত হয়ে গিয়েছিল। কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘দোছটী করিয়া পরে বার হাত শাড়ি’ — এ কথায় মহিলাদের বস্ত্রের দৈর্ঘ্য বোঝা যায়। সাহিত্যে আছে রাজকন্যার যৌতুকের সময়ে ‘কেহ নেত কেহ শ্বেত পাটশাড়ী’ দিতেছে। মনসামঙ্গল বা পদ্মপুরাণের অন্যতম কবি বিজয়গুপ্ত মনসার গোয়ালিনী রূপের সজ্জার যে বিবরণ দিয়েছেন, সেখানেও শাড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। ষোড়শ শতাব্দীর কবি দ্বিজ বংশীবদনের মনসামঙ্গলে গঙ্গাজলি শাড়ি, নেতের উড়নী, পাটশাড়ি, ঘুঘরা, নীবিবন্ধ ইত্যাদির উল্লেখ আছে।

প্রাচীনকালে আজকের মতো নারীদের ঊর্ধ্বাঙ্গে জড়ানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট পোশাক ছিল না বলেই ধারণা করা হয়। মেয়েদের বুকে কাপড় ওঠা প্রসঙ্গে শ্রীমতী জয়িতা দাস তাঁর ‘সাজমহল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘‘সপ্তদশ শতকে নির্মিত বাংলার টেরাকোটা মন্দিরগুলির অলঙ্করণেও অনেক নারীকে ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত রেখে নীচে কোঁচা দেওয়া ধুতি পরতে দেখা গেছে। আলাদা করে আর এক টুকরো কাপড় দিয়ে বুক ঢাকা দেবার চল যে কবে শুরু হল, এ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। তবে যবে থেকেই শুরু হোক না কেন, একই সঙ্গে বুক আবৃত আর অবগুণ্ঠনের জন্য আলাদা করে আর এক টুকরো কাপড় ব্যবহারের রেওয়াজ এক সঙ্গেই শুরু হয়। যাঁদের একাধিক কাপড় কেনার সামর্থ্য ছিল না, তাঁরা অধোবাসের কাপড় দিয়েই বুক মাথা ঢাকার চেষ্টা করতেন। উপরভাগের এই কাপড়ের নাম ছিল ‘সেওটা’। পাল আমলে (৮৫০-১১৬২) ওপরের অংশটাকে বলা হত ‘আধনা’। এই আধনা বা সেওটার সাথে কাঁচুলির মিল থাকলেও থাকতে পারে। কাঁচুলির প্রচলন সম্ভবত মুসলমান আমলে। কারণ মেয়েদের খোলা শরীর মুসলমানদের পছন্দ ছিল না। মুঘলযুগে বাঙালি মেয়েরাও নাকি কাঁচুলির ব্যবহার করতেন।’’

আধুনিক ব্লাউজ, পেটিকোটের চল উনিশ শতকের  শুরু পর্যন্ত ছিল না। আজকের শাড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্লাউজ। এক কালে শাড়ি পরার দুটি ধরন ছিল, আটপৌরে ও পোশাকি। মেয়েরা শাড়ি পরতো কোমরে জড়িয়ে, পরার ধরন অনেকটা পুরুষের ধুতি পরার মতোই ছিল। তবে শাড়ি পরার আদলে আমূল পরিবর্তন ঘটে সেলাই শিল্প আবিষ্কারের পর ব্লাউজ ও পেটিকোট ব্যবহারের পর থেকে। দু’প্যাঁচ দিয়ে পরার ধরনটি বলতে গেলে শহর থেকে উঠেই যায়। পেটিকোটের উপর শাড়িটিকে গিট দিয়ে প্রথমে ডানে পরে বাঁয়ে লম্বা ভাঁজ দিয়ে জড়িয়ে টেনে এনে ডান হাতের নিচ দিয়ে আলগা করে বাঁ কাঁধে আঁচলের সামান্য অংশ রাখার যে ধরন, তার নাম ‘এক প্যাঁচ’। এ ধরন চালু ছিল দীর্ঘকাল। ‘এক প্যাঁচ’ ধরনের শাড়ি পরার অনেক সুবিধা ছিল একদিকে পর্দা রক্ষা, অন্যদিকে সংসারের কাজের সুবিধা। এরপরে এসেছে ‘কুঁচি পদ্ধতি’।

বাংলার মসলিন কিংবা অন্য সূক্ষ্ম কাপড় বহু আগে থেকেই দুনিয়ায় বিখ্যাত। এ অঞ্চলের নারীদের শাড়িও ছিল বেশ পাতলা, স্বচ্ছ। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ব্রিটিশদের আগমনের মাধ্যমে। একদিকে নারীরা অন্তঃপুর থেকে বের হওয়া শুরু করেন, অন্যদিকে ব্রিটিশদের রীতি অনুসরণ করতে গিয়ে নারীদের ফিনফিনে পাতলা শাড়ির ব্যবহার হ্রাস পেতে থাকে। ১৮২২ সালের ফ্যানি পার্কস কলকাতা ভ্রমণ করে বাঙালি নারীদের পাতলা, স্বচ্ছ শাড়ির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ এবং তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন। উনিশ শতকে শুরু হলো মেয়েদের পাতলা শাড়ি নিয়ে তুমুল সামাজিক তর্ক। শ্রীমতী জয়িতা দাস লিখেছেন, ‘‘বাড়ির বউ-ঝিরা দামী সূক্ষ্ম শাড়ি অলঙ্কার পরলে সামাজিক প্রতিপত্তি বাড়ে। ‘বড় মানুষের’ এই দেখনদারি স্বভাব নিয়ে কাগজে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ শুরু হল। মেয়েরা তখন শাড়ি পরলেও শরীর দেখা যেত। শ্রী নীরদ সি চৌধুরী জানিয়েছেন, অনেকেই নাকি তখন নিতম্বে আলতা  মাখতেন— এর আভা দেখে মনে হত পেটিকোট। কিন্তু এ আলতার ছদ্ম পেটিকোট পরে তো আর বাইরে বেরোনো চলে না। শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা বিশেষ করে ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়েরা তখন অন্দরমহলের বাইরে পা রাখছেন। তাঁদের পোশাক বলতে মিহি শাড়ি। এই পোশাকে তাঁরা বাইরে বেরোন কী করে! অনেক পরিবারের কর্তা আবার রাজপুরুষের চাকরি নিয়ে সপরিবারে প্রবাসে যেতে শুরু করেছেন। কেউ হয়তো স্ত্রীকে নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন, মেয়েদের রেলেও চাপতে হচ্ছে — মার্জিত পোশাক না পরলে যে আর মেয়েদের সম্মান থাকে না।”

শাড়ির কাপড়ের ঘনত্ব নিয়ে এই টানাপড়েনের মাঝে চলে এল নতুন যুগ। বাংলার নারীদের পোশাকে পরিবর্তন এল। উনিশ শতকের সাতের দশক-পরবর্তী সময়ে লাগল পরিবর্তনের ছোঁয়া। নারীরা নিজেদের পশ্চিমা পোশাক, বিশেষত গাউনে সজ্জিত করলেন। কেউ গাউনের ওপর ওড়না দিয়ে ঘোমটা দিলেন। বিশ শতকের প্রথমভাগে শাড়ির পরিশীলিত রূপ চালু হয়ে গেল। তবে তখনও পশ্চিমা পোশাকের অনুকরণ অব্যাহত ছিল। বর্তমানে নারীরা বিভিন্ন পশ্চিমা পোশাক যেমন প্যান্ট, শার্ট, শর্টস, স্কার্ট, টপ ইত্যাদি পড়লেও বাঙালি নারীর সঙ্গে শাড়ির নাড়ির যোগ থাকার কারণেই বিশেষ উৎসব, অনুষ্ঠানে শাড়িতেই সেজে ওঠেন বাঙালি নারীরা।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


তথ্যসূত্র


  1. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ডক্টর এমএ রহিম, বাংলা একাডেমি।
  2. প্রাচীন বাংলা সামাজিক ইতিহাস: সেন যুগ, এসএম রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি।
  3. সাজমহল: ঔপনিবেশিক বাংলায় মেয়েদের সাজগোজ, জয়িতা দাস, গাঙচিল।
  4. বাঙালির বেশবাস: বিবর্তনের রূপরেখা, মলয় রায়, মনফকিরা।
  5. মধ্যযুগের বাঙ্গালা, কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং।
  6. বাঙালির ইতিহাস: আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়।
  7. বঙ্গবাসীর অঙ্গবাস। পূর্ণেন্দু পত্রী। প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস লিমিটেড। বইমেলা জানুয়ারি ১৯৯৪।
 
Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।