ধর্ম

মহালয়ায় তর্পণ করা হয় কেন

আশ্বিনের কৃষ্ণ পক্ষের তিথিকে বলা হয় মহালয়া। এই কৃষ্ণ পক্ষকে বলা হয় ‘অপরপক্ষ’ কিংবা ‘পিতৃপক্ষ'(mahalaya)। পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পার্বন শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করার অনুষ্ঠান বা রীতিই হল পিতৃপক্ষ।মহালয়া(mahalaya) হচ্ছে পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবী পক্ষের শুরুর আগের দিন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে মহালয়ায়  পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ কেন করা হয়? এ বিষয় জানতে গেলে আমাদের আশ্রয় নিতে হবে মহাভারতের।

মহাভারত অনুযায়ী , মৃত্যুর পর কর্ণের আত্মা  স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেওয়া হয় কেবলই সোনা।হতচকিত  কর্ণ  তার সাথে এরকম অদ্ভূত ব্যবহারের কারণ জিজ্ঞেস করলে  ইন্দ্র তাঁকে বলেন, বেঁচে থাকাকালীন  সারাজীবন কর্ণ কেবল সোনাদানাই দান করেছে, পিতৃপুরুষকে জল দেয় নি। সেই কারণেই তার জন্যে এই ব্যবস্থা। কর্ণ  তখন প্রত্যুত্তরে বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগের রাতে পিতৃপুরুষের কথা জানতে পারেন মা কুন্তীর কাছ থেকে যখন মা এসে তাকে বলেন, কর্ণ তাঁর ছেলে। এরপর যুদ্ধে ভাইয়ের হাতেই তাঁর  মৃত্যু হলো।সুতরাং পিতৃতর্পণের সময়ই তো তিনি পেলেননা। ইন্দ্র বুঝলেন, কর্ণের দোষ নেই। তিনি কর্ণকে পনেরো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দিলেন।ইন্দ্রের কথা মতো এক পক্ষকাল (পনেরো দিন) ধরে কর্ণ মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে অন্নজল দিলেন।  কর্ণের এই মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে জল দেওয়ার পক্ষটি সেই থেকে পরিচিত পিতৃপক্ষ নামে।

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন, তাঁকে তাঁর পিতার মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়। পিতৃপক্ষে পুত্র দ্বারা শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হিন্দুধর্মে অবশ্য করণীয় একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের ফলেই মৃতের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পান। এই প্রসঙ্গে গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “পুত্র বিনা মুক্তি নাই।”  মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন। বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাঁরা অপারগ, তাঁরা সর্বপিতৃ অমাবস্যা পালন করে পিতৃদায় থেকে মুক্ত হতে পারেন।শ্রাদ্ধ বংশের প্রধান ধর্মানুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে  তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ড ও জল প্রদান করা হয়, তাঁদের নাম উচ্চারণ করা হয় এবং গোত্রের পিতাকে স্মরণ করা হয়। এই কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে বংশের ছয় প্রজন্মের নাম স্মরণ রাখা সম্ভব হয় এবং এর ফলে বংশের বন্ধন দৃঢ় হয়। ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতাত্ত্বিক উষা মেননের মতেও, পিতৃপক্ষ বংশের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে। এই পক্ষে বংশের বর্তমান প্রজন্ম পূর্বপুরুষের নাম স্মরণ করে তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পিতৃপুরুষের ঋণ হিন্দুধর্মে পিতৃমাতৃঋণ অথবা গুরুঋণের সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মহালয়া পক্ষ সাধারণত পনেরোটি তিথিতে বিভক্ত। সেগুলি হল, প্রতিপদ, দ্বিতীয়, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী,ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী,দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবশ্যা। মহালয়ার পর প্রতিপদ তিথি থেকে দেবী বন্দনা শুরু হয়। কোন কোন অঞ্চলে দেবীর আরাধনা প্রতিপদ থেকে শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গে ষষ্ঠ তিথি থেকে দেবী বন্দনা শুরু হয়। দুই মতেই দেবী পূজার রীতি প্রচলিত আছে।হিন্দুধর্ম মতে, পিতৃপক্ষ পূর্বপূরুষের তর্পণের জন্য উপযুক্ত এক বিশেষ পক্ষ। এই পক্ষ পিত্রুপক্ষ, ষোলা শ্রাদ্ধ, কানাগাত, জিতিয়া, মহালয়া পক্ষ ও অপরপক্ষ নামেও পরিচিত। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যেহেতু পিতৃপক্ষে প্রেতকর্ম (শ্রাদ্ধ), তর্পণ ইত্যাদি মৃত্যু-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়, সেই হেতু এই পক্ষে কোন শুভকাজ করা উচিত নয়। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে গণেশ উৎসবের পরবর্তী পূর্ণিমা (ভাদ্রপূর্ণিমা) তিথিতে এই পক্ষ সূচিত হয় এবং সমাপ্ত হয় সর্বপিতৃ অমাবস্যা, মহালয়া অমাবস্যা বা মহালয়া দিবসে। উত্তর ভারত ও নেপালে ভাদ্রের পরিবর্তে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে পিতৃপক্ষ বলা হয়। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির আগের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মায় (ঈশ্বর) লীন হন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে যান। এই কারণে, কেবলমাত্র জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে; এবং এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। হিন্দু মহাকাব্য অনুযায়ী, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাঁদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। পিতৃগণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে হিন্দুদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে হয়।তর্পণ শব্দের ব্যুৎপত্তি হল তৃপ + অনট। তৃপ ধাতুর অর্থ তৃপ্তি সাধন করা। এখানে তৃপ্তি সাধন বলতে দেব-ঋষি- পিতৃ-মনুষ্যগণের তৃপ্তিসাধনকে বোঝানো হয়েছে। সাধারণভাবে মৃত পূর্বপুরুষগণকে জলদান করাকেই তর্পণ বলা হয়।জীবিত ব্যক্তির পিতা বা পিতামহ যে তিথিতে মারা যান, পিতৃপক্ষের সেই তিথিতে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। পূর্ববর্তী বছরে মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধ হয় চতুর্থী (চৌথা ভরণী) বা পঞ্চমী (ভরণী পঞ্চমী) তিথিতে। সধবা নারীর মৃত্যু হলে, তাঁর শ্রাদ্ধ হয় নবমী (অবিধবা নবমী) তিথিতে। বিপত্নীক ব্যক্তি ব্রাহ্মণী নারীদের শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণ করেন। শিশু বা সন্ন্যাসীর শ্রাদ্ধ হয় চতুর্দশী (ঘট চতুর্দশী) তিথিতে। অস্ত্রাঘাতে বা অপঘাতে মৃত ব্যক্তিদেরও শ্রাদ্ধ হয় এই তিথিতেই (ঘায়েল চতুর্দশী)। সর্বপিতৃ অমাবস্যা দিবসে তিথির নিয়মের বাইরে সকল পূর্বপুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়।যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে ভুলে যান, তাঁরা এই দিন শ্রাদ্ধ করতে পারেন। এই দিন গয়ায় শ্রাদ্ধ করলে তা বিশেষ কার্যকরী হিসেবে গণিত হয়। মৃত ব্যক্তির পুত্র (বহুপুত্রক হলে জ্যেষ্ঠ পুত্র) বা পিতৃকুলের কোনো পুরুষ আত্মীয়ই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের অধিকারী এবং শ্রাদ্ধ কেবলমাত্র পূর্ববর্তী তিন পুরুষেরই হয়ে থাকে। মাতার কুলে পুরুষ সদস্য না থাকলে সর্বপিতৃ অমাবস্যায় দৌহিত্র মাতামহের শ্রাদ্ধ করতে পারেন। কোনো কোনো বর্ণে কেবলমাত্র পূর্ববর্তী এক পুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়। পূর্বপুরুষকে যে খাদ্য উৎসর্গ করা হয়, তা সাধারণত রান্না করে রুপো বা তামার পাত্রে কলাপাতার উপর দেওয়া হয়। এই খাদ্যগুলি হল ক্ষীর, লপসি, ভাত, ডাল, গুড় ও কুমড়ো। শ্রাদ্ধকর্তাকে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ধুতি পরে শ্রাদ্ধ করতে হয়। শ্রাদ্ধের পূর্বে তিনি কুশাঙ্গুরীয় (কুশ ঘাসের আঙটি) ধারণ করেন। এরপর সেই আঙটিতে পূর্বপুরুষদের আবাহন করা হয়। শ্রাদ্ধ খালি গায়ে করতে হয়, কারণ শ্রাদ্ধ চলাকালীন যজ্ঞোপবীতের অবস্থান বারংবার পরিবর্তন করতে হয়। শ্রাদ্ধের সময় সেদ্ধ অন্ন ও ময়দা ঘি ও তিল দিয়ে মাখিয়ে পিণ্ডের আকারে উৎসর্গ করা হয়। একে পিণ্ডদান বলে। এরপর দুর্বাঘাস, শালগ্রাম শিলা বা স্বর্ণমূর্তিতে বিষ্ণু এবং যমের পূজা করা হয়। এরপর পিতৃপুরুষদের খাবার খেতে দেওয়া হয়। এই খাবার সাধারণত ছাদে রেখে আসা হয়। যদি কোনো কাক এসে সেই খাবার খেয়ে যায়, তাহলে ধরা হয় যে খাবার পিতৃপুরুষ গ্রহণ করেছেন। মনে করা হয়, পাখিটি আসলে যম বা পিতৃগণের আত্মার প্রতিনিধি।গোরু ও কুকুরদেরও খাওয়ানো হয়। ব্রাহ্মণদের ভোজন করানো হয়। পূর্বপুরুষ (কাকের বেশে) এবং ব্রাহ্মণেরা ভোজন করলেই তবে পরিবারের সদস্যরা অন্নগ্রহণ করেন। কোনো কোনো পরিবারে পিতৃপক্ষে ভাগবত পুরাণ, ভগবদ্গীতা বা শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠ করা হয়। অনেকে পূর্বপুরুষের মঙ্গল কামনায় ব্রাহ্মণদের দান করেন। তর্পণ কেবল মৃত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশেই করা যায় কিন্তু কোনও জীবৎপিতৃক (যার পিতা জীবিত আছে) ব্যক্তি তর্পণ করতে পারবে না। হিন্দু  পূর্বপুরুষগণ তাদের বংশধরগণের কাছে পিণ্ড ছাড়াও জল আশা করেন। কারণ হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দেহের বিনাশ হলেও আত্মার বিনাশ হয় না। তাই মনে করা হয় যে মৃত পিতৃগণের দেহে যে আত্মা ছিলেন তিনি এখন যে শরীরেই অবস্থান করুন সেই শরীরেই জলক্রিয়া ও শ্রাদ্ধের দ্বারা তিনি তৃপ্তি লাভ করে থাকেন।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আপনারা জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন তথ্য ভাগ করে নিতে পারবেন বাংলা ভাষায়। আশা করি আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন। আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে, আমাদের Facebook Page-এ মেসেজ করুন। আমাদের পেজ এ যেতে এখানে দেয়া Facebook icon-এর ওপর ক্লিক করুন।

Copyright © 2017 সব বাংলায়। All rights reserved.

To Top
error: Content is protected !!