ধর্ম

মহালয়ায় তর্পণ এবং পিতৃপক্ষে শ্রাদ্ধ

আশ্বিনের কৃষ্ণ পক্ষের তিথিকে বলা হয় মহালয়া। এই কৃষ্ণ পক্ষকে বলা হয় ‘অপরপক্ষ’ কিংবা পিতৃপক্ষ।  মহালয়ায় তর্পণ করার রীতি এল কিভাবে? এ বিষয় জানতে গেলে আমাদের আশ্রয় নিতে হবে মহাভারতের।

মহাভারত অনুযায়ী , মৃত্যুর পর কর্ণের আত্মা  স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেওয়া হয় কেবলই সোনা।হতচকিত  কর্ণ  তার সাথে এরকম অদ্ভূত ব্যবহারের কারণ জিজ্ঞেস করলে  ইন্দ্র তাঁকে বলেন, বেঁচে থাকাকালীন  সারাজীবন কর্ণ কেবল সোনাদানাই দান করেছে, পিতৃপুরুষকে জল দেয় নি। কিন্তু কর্ণের জীবনে সেই সময়টুকু সে পায়নি বলে কর্ণকে পনেরো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দেওয়া হয়।  কর্ণের এই মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে জল দেওয়ার পক্ষটি সেই থেকে পরিচিত পিতৃপক্ষ নামে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন, তাঁকে তাঁর পিতার মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়।

মহালয়া পক্ষ সাধারণত পনেরোটি তিথিতে বিভক্ত। সেগুলি হল, প্রতিপদ, দ্বিতীয়, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী,ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী,দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবস্যা। মহালয়ার পর প্রতিপদ তিথি থেকে দেবী বন্দনা শুরু হয়। কোন কোন অঞ্চলে দেবীর আরাধনা প্রতিপদ থেকে শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গে ষষ্ঠ তিথি থেকে দেবী বন্দনা শুরু হয়। দুই মতেই দেবী পূজার রীতি প্রচলিত আছে।হিন্দুধর্ম মতে, পিতৃপক্ষ পূর্বপূরুষের তর্পণের জন্য উপযুক্ত এক বিশেষ পক্ষ। বিশ্বাস করা হয়, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাঁদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান।

পিতৃগণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে হিন্দুদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে হয়।তর্পণ শব্দের ব্যুৎপত্তি হল তৃপ + অনট। তৃপ ধাতুর অর্থ তৃপ্তি সাধন করা। এখানে তৃপ্তি সাধন বলতে দেব-ঋষি- পিতৃ-মনুষ্যগণের তৃপ্তিসাধনকে বোঝানো হয়েছে। সাধারণভাবে মৃত পূর্বপুরুষগণকে জলদান করাকেই তর্পণ বলা হয়।জীবিত ব্যক্তির পিতা বা পিতামহ যে তিথিতে মারা যান, পিতৃপক্ষের সেই তিথিতে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। পূর্ববর্তী বছরে মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধ হয় চতুর্থী (চৌথা ভরণী) বা পঞ্চমী (ভরণী পঞ্চমী) তিথিতে। সধবা নারীর মৃত্যু হলে, তাঁর শ্রাদ্ধ হয় নবমী (অবিধবা নবমী) তিথিতে। বিপত্নীক ব্যক্তি ব্রাহ্মণী নারীদের শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণ করেন। শিশু বা সন্ন্যাসীর শ্রাদ্ধ হয় চতুর্দশী (ঘট চতুর্দশী) তিথিতে। অস্ত্রাঘাতে বা অপঘাতে মৃত ব্যক্তিদেরও শ্রাদ্ধ হয় এই তিথিতেই (ঘায়েল চতুর্দশী)। সর্বপিতৃ অমাবস্যা দিবসে তিথির নিয়মের বাইরে সকল পূর্বপুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়।যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে ভুলে যান, তাঁরা এই দিন শ্রাদ্ধ করতে পারেন। এই দিন গয়ায় শ্রাদ্ধ করলে তা বিশেষ কার্যকরী হিসেবে গণিত হয়। মৃত ব্যক্তির পুত্র (বহুপুত্রক হলে জ্যেষ্ঠ পুত্র) বা পিতৃকুলের কোনো পুরুষ আত্মীয়ই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের অধিকারী এবং শ্রাদ্ধ কেবলমাত্র পূর্ববর্তী তিন পুরুষেরই হয়ে থাকে। মাতার কুলে পুরুষ সদস্য না থাকলে সর্বপিতৃ অমাবস্যায় দৌহিত্র মাতামহের শ্রাদ্ধ করতে পারেন। কোনো কোনো বর্ণে কেবলমাত্র পূর্ববর্তী এক পুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়।

পূর্বপুরুষকে যে খাদ্য উৎসর্গ করা হয়, তা সাধারণত রান্না করে রুপো বা তামার পাত্রে কলাপাতার উপর দেওয়া হয়। এই খাদ্যগুলি হল ক্ষীর, লপসি, ভাত, ডাল, গুড় ও কুমড়ো। শ্রাদ্ধকর্তাকে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ধুতি পরে শ্রাদ্ধ করতে হয়। শ্রাদ্ধের পূর্বে তিনি কুশাঙ্গুরীয় (কুশ ঘাসের আঙটি) ধারণ করেন। এরপর সেই আঙটিতে পূর্বপুরুষদের আবাহন করা হয়। শ্রাদ্ধ খালি গায়ে করতে হয়, কারণ শ্রাদ্ধ চলাকালীন যজ্ঞোপবীতের অবস্থান বারংবার পরিবর্তন করতে হয়। শ্রাদ্ধের সময় সেদ্ধ অন্ন ও ময়দা ঘি ও তিল দিয়ে মাখিয়ে পিণ্ডের আকারে উৎসর্গ করা হয়। একে পিণ্ডদান বলে। এরপর দুর্বাঘাস, শালগ্রাম শিলা বা স্বর্ণমূর্তিতে বিষ্ণু এবং যমের পূজা করা হয়। এরপর পিতৃপুরুষদের খাবার খেতে দেওয়া হয়। এই খাবার সাধারণত ছাদে রেখে আসা হয়। যদি কোনো কাক এসে সেই খাবার খেয়ে যায়, তাহলে ধরা হয় যে খাবার পিতৃপুরুষ গ্রহণ করেছেন। মনে করা হয়, পাখিটি আসলে যম বা পিতৃগণের আত্মার প্রতিনিধি।গোরু ও কুকুরদেরও খাওয়ানো হয়। ব্রাহ্মণদের ভোজন করানো হয়। পূর্বপুরুষ (কাকের বেশে) এবং ব্রাহ্মণেরা ভোজন করলেই তবে পরিবারের সদস্যরা অন্নগ্রহণ করেন। কোনো কোনো পরিবারে পিতৃপক্ষে ভাগবত পুরাণ, ভগবদ্গীতা বা শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠ করা হয়। অনেকে পূর্বপুরুষের মঙ্গল কামনায় ব্রাহ্মণদের দান করেন। তর্পণ কেবল মৃত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যেই করা যায়। কোনও জীবৎপিতৃক (যার পিতা জীবিত আছে) ব্যক্তি তর্পণ করতে পারবে না। হিন্দু  পূর্বপুরুষগণ তাদের বংশধরগণের কাছে পিণ্ড ছাড়াও জল আশা করেন। কারণ হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দেহের বিনাশ হলেও আত্মার বিনাশ হয় না। তাই মনে করা হয় যে মৃত পিতৃগণের দেহে যে আত্মা ছিলেন তিনি এখন যে শরীরেই অবস্থান করুন সেই শরীরেই জলক্রিয়া ও শ্রাদ্ধের দ্বারা তিনি তৃপ্তি লাভ করে থাকেন।

তথ্যসূত্র


  1. Mahalaya: Festivals In Indian Society, Usha Sharma, Mittal Publications (২০০৮)
  2. Handbook of Death and Dying, Clifton D Bryant, Sage publications (২০০৩)
  3. Mahalaya ushers in the Puja spirit, article in Times of India, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৯ সাল
  4. ps://eisamay.indiatimes.com/
  5. https://bengali.oneindia.com/
  6. https://www.eibela.com/

২ Comments

২ Comments

  1. Pingback: মহালয়া | সববাংলায়

  2. Pingback: দুর্গাপূজা | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!