শিল্প-সাহিত্য

হরিহর আত্মা

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা। এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোন উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ ইংরাজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এরকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল ‘হরিহর আত্মা’। অন্তরঙ্গ বন্ধু কিংবা অভিন্ন হৃদয় বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এই প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়৷ এই বন্ধুত্ব ভাল কিংবা খারাপ দুই অর্থেই ব্যবহার হয়ে থাকে অর্থাৎ দুজন ভাল মানুষের জুটিকে হরিহর আত্মা বলার পাশাপাশি দুই মন্দ লোকের জুটিকেও হরিহর আত্মা বলা যেতে পারে। হরিহর আত্মা এবং মানিকজোড় এই দুই প্রবাদ একে অপরের সমার্থক।

এবার আমরা জেনে নেব এই প্রবাদটির উৎস কোথায়। হরি এবং হর দুই শব্দই বহু অর্থবাচক। তবে এই প্রবাদে হরি বলতে পালনকর্তা বিষ্ণু এবং হর বলতে বিনাশকর্তা শিবকে বলা হয়৷ পালন এবং ধ্বংস উভয়ের আচরণ বিপরীতধর্মী হয়েও তাদের মধ্যে হৃদ্যতার কারণ কি? মহাদেব শিব অনার্যদের দেবতা, বিষ্ণু ভক্তেরা তাঁকে অবহেলা করলেও মাঝেমাঝে তাঁর শক্তি এবং তেজের কাছে নতিস্বীকার করেন। রামায়ণ, মহাভারত এবং আরও অনেক পুরাণে আমরা দেখি অনার্য শিবের সাহায্য ছাড়া দেবতারা অসহায়৷ অনেক ক্ষেত্রে ব্রহ্মা থেকে শুরু করে অনেক আর্য দেবতাকেই শিবের শরণাপন্ন হতে দেখা গিয়েছে।

মহাভারতের বিভিন্ন জায়গায় শিব এবং বিষ্ণু উভয়ের শ্রেষ্ঠত্বের বিরোধ নিয়ে অনেক গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে৷ শিব উপাসক অর্থাৎ শৈব এবং বিষ্ণু উপাসক বা বৈষ্ণবদের মধ্যে বিরোধ লেগেই থাকত। আবার হিন্দু ধর্মেরই বিভিন্ন গ্রন্থে শিব এবং বিষ্ণু যে অভিন্ন সেই নিয়ে অনেক প্রমানের চেষ্টাও আছে। বেদে মহাদেবের কথা নেই কিন্তু রুদ্রের উল্লেখ আছে। রুদ্রকেই পরবর্তীকালে শিব বা মহাদেব বলা হয়েছে। রুদ্রের রূপ হল ভয়ানক এবং শিব হল মঙ্গলময়। অন্যদিকে বিষ্ণুও মঙ্গলময় কর্তা। সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্য দিয়েই আমাদের জগৎ বিরাজমান। কোন কিছুর সৃষ্টি হলে তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। আবার বিনাশের পর হয় নতুন সৃষ্টি। তাই সৃষ্টির দেবতা হরি এবং বিনাশের দেবতা হর এঁদের মিলিত শক্তি ছাড়া কোনকিছুই সম্ভব নয়৷ এই কারণে বিষ্ণু ও মহাদেবের মিলিত মূর্তি ‘হরিহর’ এর কল্পনা করেছে তাঁদের ভক্তরা।

সৃষ্টি ও বিনাশকে যেমন আলাদা করা সম্ভব নয়, হরিহরের মূর্তি যেমন অভিন্ন তেমনই দুই অভিন্ন হৃদয় মানুষ বন্ধুত্বে আবদ্ধ হলে তাদের হরিহর আত্মা বলা হয়৷

উদাহরণঃ গুপী গাইন ও বাঘা বাইন দুজন যেন ‘হরিহর আত্মা’, এদের একজনকে ছাড়া অন্যজনকে কল্পনাই করা যায় না!

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান - সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১৭৪ পৃঃ

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন