সববাংলায়

ভানুমতীর খেল

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “ভানুমতীর খেল”। এই প্রবাদটির সাধারণ অর্থ হল: ভোজবাজি, জাদুবিদ্যা, ইন্দ্রজাল, ভানুমতির ভেলকি, কুহকবিদ্যা ইত্যাদি। তবে অনেক সময় ভেলকিবাজি, চালবাজি বা হাত সাফাই অর্থেও ভানুমতীর খেল কথাটি ব্যবহৃত হয়। এখনও বাংলার হাটে বাজারে জাদুবিদ্যা প্রদর্শনকারীরা তাদের জাদু দেখানোর সময় “ভানুমতীর খেল” বা “ভানুমতিকা খেল” কথাটি ব্যবহার করে থাকে অনেক সময়।

এখন প্রশ্ন হল কে এই ভানুমতী? তাঁর নামের সঙ্গে জাদুবিদ্যা বা ভেলকির সংযোগ হলই বা কীভাবে? এই ভানুমতী হলেন প্রাচীন মালব দেশের রাজা ভোজরাজের কন্যা। তাঁর স্বামী হলেন মহারাজ বিক্রমাদিত্য। অনেকের বিশ্বাস, ভানুমতীর পিতা ভোজরাজ ইন্দ্রজালবিদ্যার প্রবর্তক। ইন্দ্রজালবিদ্যা বা ম্যাজিককে এই জন্য অনেকে ভোজবাজি বলে থাকেন। প্রাচীন কাহিনি অনুযায়ী, বিদ্যনুরাগী ভোজরাজ এই অপূর্ব মায়াবিদ্যার উৎকর্ষ সাধনের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। সেজন্য তাঁর চেষ্টায় ও যত্নে তাঁর রাজ্যে এই বিদ্যার প্রসার ঘটে। তিনি নিজেও এই ইন্দ্রজালের চর্চা করতেন।

প্রচলিত আছে যে, ভোজরাজের এই অদ্ভুত জাদুবিদ্যায় ভোজরাজকন্যা ভানুমতী বিশেষভাবে পরাদর্শী ছিলেন। ভোজ রাজ তাঁর সমস্ত বিদ্যা কন্যা ভানুমতীকে শিখিয়েছিলেন। ফলে একসময় ভানুমতী জাদুবিদ্যায় পিতার চেয়েও পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সমস্ত ধরণের জাদুবিদ্যা ভানুমতী আয়ত্ত করেন। তিনি নিজ মেধাবলে সারাবিশ্বে জাদুবিদ্যার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। ফলে জাদুবিদ্যা নামটি বহুলাংশে ভানুমতীর সমার্থক হয়ে যায়।

তাঁর এই দক্ষতা সম্পর্কে নানা গল্প চালু আছে। কিংবদন্তি আছে যে, ভানুমতী একদিন জাদুবিদ্যা প্রয়োগ করে মাঠের মধ্যে সমুদ্র সৃষ্টি করে মহারাজা বিক্রমাদিত্যের গতিরোধ করেছিলেন। বত্রিশ সিংহাসন বা দ্বাত্রিংশৎ-পুত্তলিকাকথন এই ভোজবিদ্যা কৌশলের নিদর্শনমাত্র।

বিক্রমাদিত্যের সভাকবি কালিদাস বলেছেন-

দেবগুরোঃ প্রসাদেন জিহ্বাগ্রে মে সরস্বতী।
তেনাহং নৃপ জানামি ভানুমত্যান্তিলং যথা ॥

অর্থাৎ কালিদাস দেবগুরু বৃহস্পতির কৃপায় তার জিহ্বায় সরস্বতীকে অধিষ্ঠিত পেয়েছিলেন এবং সেরকম রাজা বিক্রমাদিত্যের কৃপায় তিনি জানতে পারেন যে, ভানুমতির অঙ্গের কোন স্থানে তিল আছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, বিক্রমাদিত্যের সভাতেও এই ভোজবাজির চর্চা ছিল। তবে কাহিনিটি কতখানি ঐতিহাসিক সেই বিষয়ে কোন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। তবে “ভানুমতীর খেল” প্রবাদের উৎস অনুসন্ধানে ভোজরাজকন্যা ভানুমতী সম্পর্কিত প্রচলিত কিংবদন্তিটিই পাওয়া যায়। ভানুমতি বিক্রমাদিত্যের স্ত্রী হিসেবে ভোজবিদ্যার চর্চা করুন আর নাই করুন এদেশে নিম্নস্তরের জাদুকরদের (কখনো বেদে জাতীয়) মুখে আজও শোনা যায়, ‘লাগ লাগ ভেলকি লাগ, মামীর মায়ের খেলা দেখ’, কিংবা ‘লাগ ভেলকি লাগ, চোখে মুখে লাগ।’

‘ভানুমতীর খেল’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। ছেলেটা ‘ভানুমতীর খেল’ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেল।
২। আগে হাটেবাজারে ‘ভানুমতীর খেল’ দেখিয়ে মনোরঞ্জন করত যেসব যাদুকরেরা, ইদানিং তাদের দেখাই যায় না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১১৪ পৃঃ

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading