বাঙালিদের রান্নাঘরে বঁটিই কাটাকুটির প্রধান যন্ত্র বা সরঞ্জাম। মেঝেতে বসে মাছ-মাংস বা অন্যান্য খাদ্য কাটার জন্য বাঙালির প্রিয় সরঞ্জাম হল বঁটি। বাঙালি নারীরা কয়েক শতক ধরে এই বঁটি ব্যবহার করেই কাটাকুটি করতে শিখেছেন। ছুরি, পিলার প্রভৃতি পশ্চিমী যন্ত্রপাতি বাঙালির রান্নাঘরে প্রবেশ করলেও বঁটির জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহার এখনও অটুট রয়েছে।

বঁটি আকৃতিতে দুটি অংশে বিভক্ত। একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির ধাতব (প্রধানত লোহার) পাত যার উত্তল বাঁকটি ভোঁতা আর অবতল বাঁকটি ধারালো। এই ধারালো অংশেই কোন খাবার সামগ্রী কাটা হয়, এটিই হল বঁটির ব্লেড। আর এটিকে খাড়া করে রাখার জন্য একটি অনুভূমিক বাঁট থাকে। কাটাকুটির কাজে ব্যবহারের সময় বাঁটটিকে পা দিয়ে ধরে রাখা যায়। বাঁট সাধারণত কাঠের হলেও ধাতব বাঁটেরও বেশ প্রচলন হয়েছে। ধাতব বাঁটের ক্ষেত্রে ধারাল অংশটি উঁচু করে রাখার জন্য সেদিকের নিচে অনেক সময় দুটি পা থাকে। বঁটির মূল অংশের সাথে বাঁটের সংযোগ স্থলে কব্জা থাকে যাকে ভাঁজ করলে বঁটির ধারালো অংশ বাঁটের দিকে ও ভোঁতা অংশ বাইরের দিকে হয়ে যায়।
বঁটির ব্লেডের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ কিংবা আকারেও ভিন্নতা আছে। বাঙালি নারীরা সাধারণত দুটি মধ্যম আকারের বঁটি ব্যবহার করেন— একটি সবজি কাটতে, অন্যটি মাছ মাংস কাটতে। বাঙালি হিন্দু পরিবারগুলোয় সবজি এবং আমিষ (মাছ-মাংস) কাটার জন্য ভিন্ন বঁটি ব্যবহারের রীতি আছে। আর এ থেকে আমিষ কাটার জন্য ব্যবহৃত বঁটিকে ডাকা হয় ‘আঁশ-বঁটি’ নামে। বাবুর্চিরা সাধারণ গৃহিণীদের তুলনায় ভারী বঁটি ব্যবহার করেন। আঁশ-বঁটি ২০ বা ৩০ কেজি ওজনের মাছ কাটতে সক্ষম। এসব বঁটির ব্লেডের প্রস্থ বেশি এবং বেশ খাড়া হয়। বঁটির ব্লেড তৈরি হয় লোহা দিয়ে। ব্যবহারের ফলে বঁটির ব্লেডের ধার কমে যায়, আর বঁটির ব্লেডে ধার দেয়ার জন্য একটি বিশেষ পেশার মানুষও আছেন। এরা বঁটি বা ছুরি ধার দেয়ার জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি নিয়ে শহরে/গ্রামে ঘুরে বেড়ান।

আধুনিককালে বঁটির পরিবর্তে ছুরির ব্যবহার বাড়ছে। ছুরি দিয়ে কিছু কাটতে হলে এক হাতে ছুরি চালাতে হয়, অন্য হাতে যা কাটতে হয় সেটাকে চেপে ধরতে হয়। আর বঁটিতে এক পা দিয়ে এর কাঠ বা লোহার কাঠামোকে মাটির দিকে চেপে ধরতে হয় এবং দুই হাত দিয়ে মাছ, সবজি বা মাংসকে বঁটির ধারালো অংশের সঙ্গে চেপে কাটা হয়। বঁটি দিয়ে একেবারে ছোট আলুর খোসা ছাড়ানো যায়, শিমের সঙ্গে থাকা সূক্ষ্ম লতা ছেটে দেয়া যায়, গাছের কাণ্ড বা বড় মাছও সুবিধামতো কাটা যায়। মাছের বাজারে মাছ বিক্রেতাদের বড় বড় কাতলা কিংবা ইলিশ মাছ আর বিরাটাকার ধারালো বঁটি নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়।
নারকেল কোরানোর জন্য এক বিশেষ ধরনের বঁটি দেখা যায়, যা ‘কোরানি’ নামে পরিচিত। এটি সাধারণ বঁটির মতোই, তবে এর ব্লেডের মাথায় একটি খাঁজকাটা লোহার টুকরো থাকে। দুই হাতে নারকেল নিয়ে কোরানির মাথায় থাকা লোহার টুকরোতে ঘষা হয়, তখন নারকেলের সাদা মাংসল অংশ চেঁছে নিচে পড়তে থাকে। এই কোরানো নারকেল সংগ্রহের জন্য বঁটির ব্লেডের নিচে কাগজ বা পাত্র বা অন্য কিছু রাখা হয়।

পুরুষ বাবুর্চিরা বঁটি ব্যবহার করলেও এটি মূলত বাঙালি নারীদের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। বঁটি নিয়ে একজন বাঙালি গৃহিণী বসে আছেন, তার চারপাশে আছে সবজির ঝুড়ি— এটা বাঙালি সংস্কৃতির একটি প্রতীক বলা যেতে পারে। একসময় বাঙালিরা সাধারণত যৌথ পরিবারে বাস করতেন, তখন ঘরের মহিলাদের অনেক মানুষের জন্য খাবার তৈরি করতে হতো। ঘরের ঠাকুমা, দিদিমা কিংবা বিধবা মহিলারা সবজি কাটতেন আর ঊনুনে রান্নার শ্রমসাধ্য কাজটি করতেন। বাঙালি হিন্দুর রান্নাঘরে কাটাকুটি বা কুটো-কাটার কাজটি দৈনন্দিন ধর্মীয় রীতি পালনের মতোই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলা যায়। বাঙালি তরুণী যখন হাসিমুখে বঁটি দিয়ে খাদ্য কাটাকুটি করেন, তখন তা নারীর সূক্ষ্ম কাজ করার দক্ষতাকে প্রকাশ করে। আগেকার দিনে গ্রাম-বাংলায় যখন বিয়ে পারিবারিকভাবে ঠিক হতো, তখন বরপক্ষের পরিবারের সদস্যরা কনের রান্নার দক্ষতা দেখতে চাইতেন। তাঁরা বিশেষভাবে দেখতেন হবু বধূ বঁটি দিয়ে কাটাকুটি করতে কতটা দক্ষ! অধুনা বাংলাদেশের বরিশালে যেকোনো সবজি কেটে দেখালেই চলত না, হবু বধূকে কলাই শাক কেটে দক্ষতা দেখাতে হতো। কারণ কলাই শাক খুব সূক্ষ্মভাবে কাটতে হয়। বরিশালে বঁটি ব্যবহারের দক্ষতার আরো কিছু সুবিধা ছিল। এ জেলায় ধনীদের বাড়িতে প্রায়ই ডাকাতের আক্রমণ হতো, তখন ঘরের নারীরা এই বঁটি দিয়ে নিজেদের আত্মরক্ষা করতেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘Gastronomica’ ইংরেজি পত্রিকায় (Spring, 2001) শ্রীমতী চিত্রিতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিত প্রবন্ধ, Page 23-26
- Calcutta Cookbook: A Treasury of Recipes From Pavement to Place by M Dasgupta, Penguin Books Limited (২০০০), page 39
- https://bn.wikipedia.org/wiki/বঁটি


আপনার মতামত জানান