সববাংলায়

৪ মে | কয়লাখনি শ্রমিক দিবস (ভারত)

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশেই কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতের পালনীয় সেই দিবসগুলির মধ্যে একটি হল কয়লাখনি শ্রমিক দিবস (Coal Miner’s Day)।

প্রতি বছর ৪ মে তারিখে সমগ্র ভারত জুড়ে শিল্প বিপ্লবের মহান শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমকে স্বীকৃতি জানাতে কয়লাখনি শ্রমিক দিবস পালন করা হয়ে থাকে। কয়লাখনির শ্রমিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন এবং তাঁদের কৃতিত্বকে সম্মান জানাতে মূলত কয়লাখনি শ্রমিক দিবস পালিত হয়ে থাকে। বছরের বেশিরভাগ দিনই খনি শ্রমিকরা খনন, সুড়ঙ্গ তৈরি, খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে দিন অতিবাহিত করে এবং এর ফলেই অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়ে আমাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন অব্যাহত থাকে। কয়লা খনন এক কঠোর পরিশ্রমসাধ্য পেশা। কয়লাখনি শ্রমিক দিবস উপলক্ষ্যে বেশ কিছু সংস্থা ও সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে কয়লাখনির এলাকাভুক্ত সংস্থাগুলিকে তথ্য সরবরাহের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে থাকে।

শক্তির মৌলিক রূপগুলির মধ্যে একটি হল কয়লা, একইসঙ্গে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক জীবাশ্ম জ্বালানি যা পূর্ণমাত্রায় কার্বন সমৃদ্ধ। খনি শ্রমিকরা প্রতিদিনই সুড়ঙ্গ খনন ও কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে তাঁদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। বহু খনি শ্রমিক সারা দিন কয়লার গুঁড়ো ধুলোর সঙ্গে নিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে ফুসফুসে জমতে জমতে ফুসফুসের ব্যাধি দেখা দেয়। ভারতে বাণিজ্যিক শক্তির চাহিদার অধিকাংশই পূরণ হয় কয়লা দ্বারা। শক্তি উৎপাদন, ইস্পাত এবং সিমেন্ট তৈরির জন্য জ্বালানি নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়লা একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।

কয়লাখনি শ্রমিক দিবসের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে এই খনি শ্রমিকেরাই ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে যে শিল্প বিপ্লব ঘটেছে, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সেই সময়পর্বে, জ্বালানির কাজে, লোকোমোটিভ ইঞ্জিন চালাতে এমনকি ফার্নেসগুলিতেও বহুল পরিমাণে কয়লা ব্যবহৃত হত। উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই কয়লাখনির শ্রমিকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষ অথবা সরকারের একটা না একটা গোলযোগ বেধেই চলছিল। অতি-বাম রাজনৈতিক ভাবাদর্শের সঙ্গেও এই সকল খনি শ্রমিকদের খানিক সংস্পর্শ গড়ে উঠেছিল। ক্রমে ক্রমে এই অতি-বাম আন্দোলনই খনি শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নগুলির একমাত্র সম্বল হয়ে ওঠে, বিশেষত গ্রেট ব্রিটেনে।

অন্যদিকে ফরাসি কয়লাখনির শ্রমিকেরা তুলনায় অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিল। ভারতে ১৭৭৪ সালে কয়লা খনন শুরু হয়, যখন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি দামোদর নদীর পশ্চিম পাড় জুড়ে অবস্থিত রানিগঞ্জ কয়লাখনিটিকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন সামার এবং সুটোনিয়াস গ্রান্ট হিটলি রানিগঞ্জের কয়লাখনি থেকে বাণিজ্যিক উদ্যোগে কয়লা খনন ও উত্তোলন শুরু করেছিলেন। ১৮৫৩ সালে বাষ্পচালিত ইঞ্জিনগুলি কয়লার চাহিদা ও উৎপাদন প্রচুর বাড়িয়ে তোলে।

ভারতের কয়লা সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলি হল – ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড় এবং মধ্য ভারত ও দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু অঞ্চল। বেসরকারি স্তরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অবৈজ্ঞানিকভাবে যথেচ্ছ কয়লার উত্তোলনের ঘটনায় সেই সময় সরকার সচকিত হয় এবং ক্রমেই বেসরকার তথা ব্যক্তিগত কয়লাখনিগুলিকে রাষ্ট্রায়ত্তকরণের কথা ভাবা হতে থাকে।

বর্তমানে যে সমস্ত খনি অঞ্চলে কয়লার সঞ্চয় ফুরিয়ে গিয়েছে, সেখানে ইকো-পার্ক, জলের নানাবিধ খেলা, পাতাল প্রদর্শন, গল্‌ফের মাঠ, বিনোদনের বিভিন্ন পরিসর, পাখি দেখার স্থান ইত্যাদি নানাভাবে পুনর্নির্মাণ করা যেতে পারে। যুগ যুগ ধরে কয়লার সংস্থাগুলি উদ্যোগ নিয়ে ১৫টিরও বেশি ইকো-পার্ক স্থাপন করেছে তাদের দীর্ঘস্থায়ী খনি বন্ধের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। এই সমস্ত খনি অঞ্চলগুলি বর্তমানে তাই স্থিতিশীল এবং পরিবেশগত দিক দিয়েও টেকসই। আর তাছাড়া এভাবে সমগ্র অঞ্চলের নৈসর্গিক দৃশ্যটাও অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর হয়। কয়লার জন্য দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে উন্নত কয়লা উৎপাদনকারী দেশগুলির সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রার্থনা করা হয় –

  • কয়লা শিল্পের দক্ষ পরিচালন ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ ইত্যাদির জন্য ভূগর্ভস্থ ও উন্মুক্ত উভয় ক্ষেত্রেই নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসা।
  • দেশে তৈরি হয় না এমন যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য দ্বিপাক্ষিক তহবিল চাওয়া।
  • বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে বৈদেশিক আর্থিক সহায়তা যোগান দেওয়া।
  • খনি শ্রমিকদের প্রচেষ্টা কমাতে কয়লা খনির উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।
  • ওয়েট ড্রিলিং অনুশীলনের মাধ্যমে ধূলিকণা কমাতে সাহায্য করা।
  • সারফেস মাইনাররা (Surface Miner) ড্রিলিং ও ব্লাস্টিং-এর প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে এবং তার ফলে দূষণের ভারও কমে গেছে।

এই প্রকল্পগুলি যে শুধু বায়ুদূষণ কমিয়ে আনতে সাহায্য করেছে তা নয়, বরং কার্বনের পরিমাণও যথেষ্ট হারে কমিয়ে দিয়েছে। আজও, কয়লা খনির শ্রমিকরা এমন পরিবেশে কাজ করে চলেছে যা কিনা স্বাভাবিকভাবেই বিষাক্ত এবং অস্বাস্থ্যকর। স্বাস্থ্যগত প্রতিবন্ধকতা এখনও তাঁদের রয়েছে, তার পাশাপাশি অন্যান্য মানুষদের তুলনায় তাঁদের জীবনকাল অনেকাংশেই সংক্ষিপ্ত। ভারতের অর্থনীতিতে এই খনি থেকে আকরিক ও কয়লা সংগ্রহ এক বিরাট অবদান রাখে। স্বাধীনতার পরে ভারত সরকার আরও বেশি করে এই খনন শিল্পের উপর জোর দিয়েছে এবং পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে খনিগুলির মানোন্নয়নের চেষ্টা করেছে।

বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে ভারত কয়লা, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, অধাতব খনিজের সম্ভার হিসেবে এক বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। ১৯৭১ সালে ভারত সরকার কোকিং ও নন-কোকিং কয়লাখনির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বিসিসিএল (ভারত কোকিং কোল লিমিটেড) এবং সিএমএএল (কোল মাইনস অথরিটি লিমিটেড) সমস্ত কয়লা খনি অধিগ্রহণ করেছে। এই দুই সংস্থাই পরে একত্রিত হয় এবং ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করে ‘কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড’।

বর্তমানে দুটি পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হয় –

  • পৃষ্ঠ খনন (Surface Mining) – তুলনায় কম ব্যয়বহুল এই পদ্ধতিতেই বেশিরভাগ সময় কয়লা উত্তোলন হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এক্ষেত্রে বিরাট বিরাট যন্ত্রের সাহায্যে ২০০ ফুট গভীরে থাকা কয়লার উপরকার মাটি সরিয়ে সেই কয়লার স্তরকে বের করা হয়। কয়লা সংগ্রহ করার পরে পুনরায় সেই ধুলো-বালি আর মাটি আগের মতোই চাপা দেওয়া হয়।
  • গর্ভ খনন (Underground Mining) – এই পদ্ধতির আরেক নাম ডিপ মাইনিং (Deep Mining)। যদি কয়লার স্তর মাটির নীচে কয়েকশ ফুট নীচে থাকে, তখন এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।

১৯৭৮ সাল থেকে নতুন ও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে পৃষ্ঠ খনন প্রক্রিয়ায় আগের থেকে তিন গুণ বেশি পরিমাণ কয়লা উত্তোলন সম্ভব হয়েছে। তাই এই অগ্রগতির কথা স্মরণ করতেই কয়লাখনি শ্রমিক দিবস পালিত হয়। প্রতি বছর কয়লাখনি শ্রমিক দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ থিম বা প্রতিপাদ্য ঘোষণা করা হয়।

কয়লাখনি শ্রমিক দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য

  • ২০২৫ – পৃথিবীর নীচে, সীমা ছাড়িয়ে (Beneath the Earth, Beyond the Limits)
  • ২০২৪ – কয়লাখনি শ্রমিক দিবসের কোনও থিম ঘোষণা করা হয়নি
  • ২০২৩ – কয়লাখনি শ্রমিক দিবসের কোনও থিম ঘোষণা করা হয়নি
  • ২০২২ – কয়লাখনির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ান (raise awareness about the importance of coal mining)।
  • ২০২১ – অধ্যবসায়, অংশীদারিত্ব এবং অগ্রগতি’ (Perseverence, Partnership and Progress)

সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading