সববাংলায়

ইন্দ্রপ্রস্থে ময়দানবের সভাগৃহ নির্মাণ

মহাভারতের সভাপর্বে প্রথম থেকে তৃতীয় অধ্যায় জুড়ে বর্ণিত আছে পান্ডবদের জন্য অতুলনীয় কারিগর ময় দানবের এক অতি সুন্দর সভাগৃহ নির্মাণ করার কথা। অগ্নিদেবের অনুরোধে কৃষ্ণ ও অর্জুন খান্ডব বন দহন করে অগ্নিদেবকে জলযোগ করিয়েছিলেন। সেই বনে বাস করত ময় নামে এক দানব, যে ছিল শিল্পী। ময় অর্জুনকে অনেক কাকুতিমিনতি করলে দয়া করে অর্জুন তাকে বধ করা থেকে অব্যাহতি দেন। সেই কৃতজ্ঞতা বশত সে অর্জুনের কোনো উপকার করতে চাইলে অর্জুন তাতে সম্মত হননি। অনেক অনুরোধ করার পর অর্জুন ময়কে বলেন কৃষ্ণের জন্য কোনো কাজ করে দিতে। একথা শুনে কৃষ্ণ ময়কে আদেশ করেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের জন্য এমন একটি সভাগৃহ তৈরি করে দিতে যা কোনোভাবেই কেউ অনুকরণ করতে না পারে। সেই সভায় যেন দেবতা, মানুষ ও অসুরদের জীবনকাহিনী অঙ্কিত থাকে। ময় অত্যন্ত খুশি হয়ে কৃষ্ণের প্রস্তাবে রাজি হল। কৃষ্ণ ও অর্জুন তাকে সঙ্গে নিয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের কাছে গেলেন। সব কথা শুনে আনন্দিত পান্ডবরা সকলেই ময়কে অনেক আদর-যত্ন করলেন। তারপর শুরু হল ইন্দ্রপ্রস্থে ময়দানবের সভাগৃহ নির্মাণ ।

ইন্দ্রপ্রস্থে ময়দানবের সভাগৃহ নির্মাণ | সববাংলায়
ভিডিওটি দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

অনেককাল আগে দানবরাজ বৃষপর্বা এক যজ্ঞের জন্য কৈলাস পর্বতের উত্তরে এক সভাগৃহ তৈরি করিয়েছিলেন। সেই সভাও তৈরি করেছিল ময়। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের সভাগৃহের উপকরণ আনার জন্য ময় চলে গেল সেই স্থানে। নিয়ে এলো দানবরাজের সভার মণি, মুক্তো আর স্ফটিক। সেই স্থানে ছিল বিন্দু নামে এক বিশাল সরোবর। তার ভিতরে গোপনে রক্ষিত ছিল বৃষপর্বার সোনার গদা ও বরুণদেবের ‘দেবদত্ত’ নামক মহাশঙ্খ। সেগুলিও ময় নিয়ে আসে।

ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এসে ময় সেই গদাটি ভীমকে এবং শঙ্খটি অর্জুনকে প্রদান করে। শুরু হয় সভাগৃহ নির্মাণের কাজ। ইটের বদলে তা তৈরি হয় স্ফটিক দিয়ে। তার তেজে সূর্যের জ্যোতিও ম্লান মনে হতে থাকে। অপূর্ব সুন্দর সেই সভায় বাগানের গাছগুলি ছিল সোনার, তাতে মণি ও মানিকের ফুল। আরো ছিল একটি বিশাল সরোবর। তার পাড় বাঁধানো ছিল স্ফটিক দিয়ে। জল ছিল অতি স্বচ্ছ। নানারকম জলচর পাখি সেই জলে খেলে বেড়াতো। জলে ফুটতো সোনার পদ্মফুল, যার ডাঁটি ছিল বৈদুর্য্যমণির। চারিধারে মুক্তো ও নানা মূল্যবান রত্ন ছড়ানো ছিল। রাজারা সেই সরোবরের ধারে এসেও তাকে জল বলে চিনতে পারেননি। এতটাই স্বচ্ছ ও কালিমাশূন্য ছিল সেই জল। 

ইন্দ্রপ্রস্থে ময়দানবের সভাগৃহ নির্মাণ হতে সময় লেগেছিল চৌদ্দ মাস। সভাগৃহটি লম্বায় ছিল পাঁচ হাজার হাত। আটহাজার ভয়ঙ্কর রাক্ষস সবসময় এই সভায় পাহারা দিত, এবং প্রয়োজন হলে বহন করে অন্যত্রও নিয়ে যেত। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার তৈরি করা দেবরাজ ইন্দ্রের সভা ও ব্রহ্মার সভাও ময় নির্মিত পান্ডবদের এই সভার সৌন্দর্য্যের কাছে তুচ্ছ ছিল। সভাগৃহ সম্পূর্ণ হওয়ার পরে পৃথিবীর সকল রাজা ও মুনি-ঋষিরা এই সভা দেখতে এসেছিলেন। বাদ যাননি নারদ, পারিজাত, অসিত, দেবল, রৈবত প্রভৃতি দেবর্ষিরাও। রাজসূয় যজ্ঞের সময় এই সভার অতুল সৌন্দর্য্য দেখেই দুর্যোধনের মনে হিংসা জাগে এবং মামা শকুনির পরামর্শে পাশাখেলার জন্য পান্ডবদের আহ্বান করে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1.  ‘মহাভারত’, শ্রী কালীপ্রসন্ন সিংহ, বনপর্ব, অধ্যায় ১-৩, পৃষ্ঠা ৩০৫-৩০৮
  2. ‘উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র’,উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, ‘ছেলেদের মহাভারত’, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২১০-২১১

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading