সববাংলায়

খাণ্ডব দাহন

বিভাগঃ ,

মহাভারতের আদিপর্বের একেবারে শেষের দিকে ‘দ্বাবিংশত্যধিক দ্বিশততম’ অধ্যায় অর্থাৎ ২২২তম  অধ্যায় থেকে ‘চতুস্ত্রিংশদধিক দ্বিশততম’ অধ্যায় অর্থাৎ ২৩৪তম অধ্যায় জুড়ে  কৃষ্ণ ও অর্জুনের দ্বারা খাণ্ডব দাহন এর কথা বর্ণিত আছে। কৃষ্ণের বোন সুভদ্রার সঙ্গে অর্জুনের বিবাহ হওয়ার পর বারো বছরের বনবাস শেষ হলে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রার সঙ্গে অর্জুন পান্ডবদের রাজধানী খান্ডবপ্রস্থে ফিরে আসেন। একদিন কৃষ্ণ ও অর্জুন যমুনার তীরে বসে কথাবার্তা বলছিলেন। এমন সময়ে জটাধারী, পিঙ্গল বর্ণের দাড়ি-গোঁফ বিশিষ্ট দীর্ঘাকৃতি এক ব্রাহ্মণ এসে তাঁদের সামনে উপস্থিত হলেন। তাঁর রং কাঁচা সোনার মতো, আর তেজ প্রভাতের সূর্যের মতো। সেই ব্রাহ্মণ নিজের অপরিমিত আহার করার অভ্যাসের কথা জানিয়ে কৃষ্ণ ও অর্জুনের কাছে কিছু জলযোগ করার প্রার্থনা করলেন। জলযোগের প্রকৃতি ও পরিমাণ জানতে চাইলে ব্রাহ্মণ বলেন যে তিনি খাণ্ডব নামক বনটিকে পুড়িয়ে খেতে চান। এমন প্রার্থনা শুনে কৃষ্ণ ও অর্জুন যথেষ্টই অবাক হলেন। তখন সেই ব্রাহ্মণ নিজের পরিচয় দিলেন। 

তিনি ছিলেন স্বয়ং অগ্নিদেব। এমন ইচ্ছার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, শ্বেতকী নামে এক রাজা ছিলেন, যিনি ক্রমাগত বিশাল বিশাল যজ্ঞ করতেন। রাজার যজ্ঞে অত্যধিক পরিশ্রম করতে করতে তাঁর পুরোহিতেরা দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলেন, ধোঁয়ার কারণে তাঁদের চোখও নষ্ট হয়ে যেতে লাগলো। বাধ্য হয়ে তাঁরা রাজার কাজ ছেড়ে দিলেন। 

রাজা শ্বেতকী এতে খুব দুঃখিত হয়ে শিবের তপস্যা শুরু করলেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব বললেন, যদি রাজা ক্রমাগত বারো বছর ধরে অগ্নিদেবকে ঘি উৎসর্গ করে খুশি করতে পারেন তবেই শিব রাজার সাহায্য করবেন। শিবের কথামত শ্বেতকী তাই করলেন। তখন মহাদেব দুর্বাসা মুনিকে পুরোহিত করে রাজার যজ্ঞ করিয়ে দিলেন। কিন্তু এতো ঘি অগ্নিদেবের সহ্য হল না। তাঁর ‘ক্ষুধামান্দ্য’ (খিদের অভাব) দেখা দিলো। তখন তিনি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। সকল কথা শুনে ব্রহ্মা তাঁকে বেশি পরিমাণে মাংস খাওয়ার কথা বললেন এবং পরামর্শ দিলেন খাণ্ডব বনে বসবাসকারী জীব-জন্তুদের পুড়িয়ে খেতে। কিন্তু খাণ্ডব বনে দেবরাজ ইন্দ্রের বন্ধু তক্ষক নামক নাগ বাস করে।  তাই যখনই অগ্নি সেই বন পোড়াতে যান, ইন্দ্রদেব বৃষ্টির মাধ্যমে আগুন নিভিয়ে দেন। পরপর সাতবার বিফল হয়ে অগ্নিদেব কৃষ্ণ ও অর্জুনের কাছে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এসেছেন। 

এই সকল বৃন্তান্ত শুনে কৃষ্ণ ও অর্জুন অগ্নিকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু তাঁদের ভালো অস্ত্র ও রথ না থাকায় আগে তার ব্যবস্থা করতে হল অগ্নিদেবকে। তিনি বরুণদেবের কাছ থেকে ‘গাণ্ডীব’ নামক ধনুক, ‘অক্ষয়’ নামক তূণ এবং ‘কপিধ্বজ’ নামক রথ এনে অর্জুনকে দিলেন। এই রথের উপর এক বিশালাকায় বানরের মূর্তি থাকার জন্য এর নাম কপিধ্বজ হয়েছিল। কৃষ্ণকে দিলেন সুদর্শন নামক চক্র ও কৌমদকী নামক একটি গদা। এ সকল অস্ত্র পেয়ে কৃষ্ণ ও অর্জুন অগ্নিদেবকে বন দাহন শুরু করতে বললেন। তখন খাণ্ডব বনে ভয়ানক আগুন জ্বলে উঠল। ভীষণ শব্দ করে আগুনের লকলকে শিখায় আকাশ ছেয়ে গেলো, আর তার সঙ্গে পর্বতাকার কালো ধোঁয়া উজ্জ্বল দিনকে অমাবস্যার রাত্রির মতো অন্ধকার করে তুললো। জীব-জন্তু সকলে প্রাণভয়ে ছুটে পালাতে চাইলেও কৃষ্ণ ও অর্জুনের জন্য পারলো না। কৃষ্ণের চক্র ও অর্জুনের তীরে সকলেই কাটা পড়তে লাগলো। রথে চড়ে বাতাসের বেগে কৃষ্ণ ও অর্জুন বনের চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কত জন্তু, কত পাখি পুড়ে মারা গেলো তার কোনো হিসাব নাই! খাল-বিল এবং সকল জলাশয়ের জল টগবগ করে ফুটতে লাগলো, ফলে সকল জলজ প্রাণী সিদ্ধ হয়ে গেলো। আগুনের শব্দ ও জন্তুদের চিৎকার মিলে ঝড়, বজ্রপাত আর সমুদ্রের গর্জনকেও ছাপিয়ে গেলো। এই ভয়ঙ্কর ঘটনা দেখে স্বর্গের দেবতারা প্রাণভয়ে দেবরাজের কাছে আশ্রয় নিতে গেলেন। দেবরাজ তখন এই ভীষণ আগুন নেভানোর জন্য উনপঞ্চাশ জন পবন (ঝড়ের দেবতা) আর মেঘদের আদেশ করলেন। কিন্তু আগুনের ভয়ানক তেজে সেই মেঘ-বৃষ্টি আকাশেই শুকিয়ে গেলো। তখন ইন্দ্র সাধারণ মেঘের থেকেও বেশি ক্ষমতাশালী মহামেঘদের ডাকলেন, যারা ইচ্ছা করলে সারা পৃথিবীকে জলে ডুবিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই সাংঘাতিক মেঘও অর্জুনের তীরে উড়ে গেলো।        

সেই বনে ইন্দ্রের বন্ধু তক্ষক নাগ বাস করতেন। তক্ষক তখন বাড়িতে ছিলেন না, কিন্তু তাঁর স্ত্রী-পুত্র ছিল। তক্ষকের স্ত্রী আগুনে পুড়ে মারা গেলেও পুত্র অশ্বসেন কোনোরকমে বেঁচে গেলেন। এইভাবে বৃষ্টি করে, বজ্রপাত করে বা পর্বত ছুঁড়ে…কিছুতেই ইন্দ্র কৃষ্ণ ও অর্জুনকে আটকাতে পারলেন না। তখন দেবতারা হার স্বীকার করে চলে গেলেন। তারপর আর খান্ডব বন পোড়াতে কোনো বাধা এলো না। তৃপ্তি করে অগ্নিদেব জলযোগ করলেন।     

পনেরো দিন ধরে ক্রমাগত খাণ্ডব দাহন চলেছিল। সেই ভীষণ আগুন থেকে কেবল ছয়টি প্রাণী রক্ষা পেয়েছিল। এর মধ্যে ছিলেন তক্ষকের পুত্র অশ্বসেন এবং ময় নামক দানব। ময় অর্জুনকে অনেক কাকুতিমিনতি করায় দয়া করে অর্জুন তাঁর প্রাণ বধ করেন নি। আর চারটি প্রাণী ছিল জরিতারি, সারিসৃক্ক, স্তম্বমিত্র ও দ্রোণ নামক চারটি বকের ছানা। এদের পিতা মহর্ষি মন্দপাল অগ্নিদেবকে অনুরোধ করায় অগ্নি এদের পোড়াননি। এরা ছাড়া আর সব জন্তুরাই পুড়ে মারা গিয়েছিল।       

মনমতো জলযোগ পেয়ে অগ্নি খুব খুশি হয়ে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে অনেক আশীর্বাদ করে স্বর্গে ফিরে গেলেন। এই ঘটনার পরে কৃতজ্ঞতাবশত ময়দানব মহারাজ যুধিষ্ঠিরের জন্য এক আশ্চর্য সভাগৃহ তৈরি করে দিয়েছিলেন। তা ছাড়াও ভীমের জন্য দানবরাজ বৃষপর্বার সোনার গদা এবং অর্জুনের জন্য বরুণদেবের ‘দেবদত্ত’ নামক বিশাল শঙ্খও এনে দিয়েছিলেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘মহাভারত’, শ্রী কালীপ্রসন্ন সিংহ, আদিপর্ব, অধ্যায় ২২২-২৩৪, পৃষ্ঠা ২৮৭-৩০২
  2. ‘উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র’, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ‘ছেলেদের মহাভারত’, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২০৬-২১০

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading