সববাংলায়

বাঙালি ডাক্তার ও ডাবর কোম্পানি

বাঙালির সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড যেমন ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও জয়ধ্বজা উড়িয়েছে, তেমনি অন্যান্য ক্ষেত্রের বহু বাঙালির দৌলতে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভারত অত্যন্ত সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত। বাংলা তথা ভারতবাসীর জীবনের সঙ্গে প্রাচীন একটি ব্র্যান্ড আজও ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে রয়েছে এবং তার নেপথ্যের মূল কান্ডারি এক বাঙালি ডাক্তার। কেবল কলকাতা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে আয়ুর্বেদিক ফর্মুলার ভিত্তিতে নিজের বানানো ওষুধ দুঃস্থ, নিম্নবিত্ত রোগাক্রান্ত মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতেন তিনি। তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত সেই আয়ুর্বেদিক ওষুধ থেকে শুরু হয়ে আজ আয়ুর্বেদিক নানা খাদ্যসামগ্রীও কোম্পানিটির প্রধানতম পরিচয় হয়ে উঠেছে। ঔপনিবেশিক আমলের সেই সেবাপরায়ণ বাঙালি ডাক্তারের নাম এস কে বর্মণ (S. K. Burman) এবং তাঁর কোম্পানির নাম হল ডাবর (Dabur)। বর্তমানে, পৃথিবীর প্রায় ১০০টি দেশে ডাবরের পণ্য ভীষণ জনপ্রিয়।

বিশ্বের বৃহত্তম আয়ুর্বেদিক ও প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ডাবরের ব্যবসার রমরমা বিশ্বব্যাপী। বর্তমানে এই কোম্পানিটির ২৫০টিরও বেশি আয়ুর্বেদিক পণ্য রয়েছে। কেবলমাত্র আয়ুর্বেদিক ওষুধের মধ্যেই আর তারা সীমাবদ্ধ নেই, বরং ভেষজ উপাদান দ্বারা নির্মিত আয়ুর্বেদীয় খাদ্যসামগ্রীর জন্যও এই কোম্পানি খুবই জনপ্রিয়। প্রাচীন আয়ুর্বেদের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ডাবর কোম্পানি যুগান্তকারী এক সংস্থা নির্মাণ করে তুলেছে এবং প্রাচীন সেই গরিমাকে এতটুকু ম্লান হতে না দিয়ে একে এগিয়ে নিয়ে চলেছে সসম্মানে। কেবল একটি বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে ডাবর নিজেকে তুলে ধরে না বরং একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে তারা। এই যে তাদের আদর্শ এটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবেই বা আয়ুর্বেদকে এই আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও গুরুত্ব সহকারে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল তারা, এসব জানতে ও বুঝতে হলে ডাবরের জন্মলগ্ন এবং তার নেপথ্যের ঘটনাতে চোখ রাখতে হবে৷

উনিশ শতকের শেষদিকে, আটের দশকের কথা। কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সেই সময়ে কলেরা, ম্যালেরিয়া এবং প্লেগের মতো মারণরোগ লেগেই থাকত। তখন এস.কে বর্মণ নামের এক বাঙালি ডাক্তার ভেষজ নানা গাছগাছড়ার সাহায্যে বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা আয়ুর্বেদ গ্রন্থগুলিতে উল্লিখিত ফর্লুমা মেনে ওষুধ তৈরি করতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। তাঁর সেই বহু সাধনায় তৈরি আয়ুর্বেদিক ওষুধে যখন কলকাতার মানুষ কলেরা, ম্যালেরিয়ার মতো রোগ থেকে সেরে উঠতে শুরু করল তখন ধীরে ধীরে ডাক্তার বর্মণের ওষুধের নাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এস.কে বর্মণ কিন্তু কেবল এই শহুরে মানুষদের সারিয়ে তুলেই সন্তুষ্ট হয়ে রইলেন না। শহরের এই গন্ডী ছাড়িয়ে নিম্নবিত্ত, অসহায় মানুষদের কাছে তিনি তাঁর এই আয়ুর্বেদিক উপায়ে বানানো নতুন ওষুধ কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় সেই চিন্তা করতে লাগলেন। অনেক ভেবে মেইল অর্ডারের সাহায্যে গ্রামেগঞ্জে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন তিনি। শোনা যায় নিজে তিনি সাইকেলে চড়ে এই বাংলায় তাঁর ওষুধ বিলি করে বেড়িয়েছেন। তাঁর সেবাপরায়ণতায় মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল আপামর বাংলার মানুষ।

আরও বেশি মানুষের কাছে ওষুধ যাতে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেকারণে উৎপাদনও বেশি করতে লাগলেন। অবশেষে ১৮৮৪ সালে তিনি কলকাতা শহরের বুকে ছোট্ট একটি আয়ুর্বেদিক ঔষধ কোম্পানি তৈরি করেন এবং তার নাম রাখেন ডাবর।

এই ডাবর শব্দটির উৎপত্তি ‘ডাক্তার বর্মণ’ এই আখ্যাটি থেকে। ডাক্তারের ‘ডা’ (Da) এবং বর্মণ থেকে ‘বর’ (Bur)—এই দুটি জুড়েই ‘ডাবর’ শব্দটি তৈরি হয়েছিল এবং তখন থেকেই ডাবরের ওষুধের জনপ্রিয়তা লোকের মুখে মুখে বহুদূর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে দিয়েছিল। সেই অত্যন্ত লোকপ্রিয়তার ঐতিহ্য আজও সমানভাবে বর্তমান। বাংলা তথা ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে তা বিশ্বের দরবারেও জায়গা করে নিয়েছে এবং মানুষের ভালবাসা পেতে সক্ষম হয়েছে।

একটি ব্যাপার এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের বুকে, বিদেশি পণ্যের রমরমার কালে এবং স্বদেশী আন্দোলনেরও প্রাক্কালে একজন বাঙালি ডাক্তার সম্পূর্ণ স্বদেশী পদ্ধতি অবলম্বন করে একটি পণ্যের কোম্পানি তৈরি করেছিলেন—ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে নিঃসন্দেহেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাঙালিদের ব্যবসার যে ইতিহাস, তাকে অনেকসময় খাটো করে দেখা হলেও, ডাবরের মতো কোম্পানির ইতিহাসকে ভুলে গেলে চলবে না। স্বদেশী আন্দোলনের সময় যখন ভারতবর্ষের চিন্তানায়কেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পথ নির্দেশ করছেন, তখন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কথাও তো জড়িয়ে ছিল তার মধ্যে। এস.কে বর্মণের মত মানুষ বাঙালিকে কিংবা বলা যায় ভারতবাসীকে নিজেদের দেশীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সফল হওয়ার যে পথ দেখিয়েছিলেন তা যেন এক দৃষ্টান্তস্বরূপই ছিল। ডাবর কোম্পানির ইতিহাসের সঙ্গে তাই যেমন নিঃস্বার্থ সেবাপরায়ণতার কথা জড়িয়ে আছে, তেমনি পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র পথে হাঁটার দিশা দেখিয়েছিলেন একজন বাঙালি, সেকথাও গর্বের সঙ্গে স্মরণীয়।

এস.কে বর্মণের হাতে শুরু হলেও পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরসূরীরা এই ডাবর কোম্পানি এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ডাবর কোম্পানির বিবর্তনের যে ইতিহাস তা সংক্ষেপে এখানে একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে। ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ১৮৯৬ সালে প্রথম গড়িয়াতে ডাবর কোম্পানির একটি প্রোডাকশন ইউনিট গঠিত হয়েছিল। ১৯০০ সালে ডাবর প্রাকৃতিক ভেষজ ওষুধ তৈরি করা শুরু করেছিল। ১৯১৯ সালে এস. কে. বর্মণের ছেলে সি. এল. বর্মণ প্রথম এই কোম্পানির আর অ্যান্ড ডি (R&D) ইউনিট তৈরি করেছিলেন। ১৯২০ সালে নরেন্দ্রপুর ও ডাবু গ্রামে তৈরি ডাবরের ওষুধ পৌঁছে যেতে শুরু করল বিহার এবং উত্তর-পশ্চিমদিকে। ১৯৩০ সালে আয়ুর্বেদিক পণ্য উৎপাদনের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সূচনা হয়েছিল। ১৯৩৬ সালে কোম্পানি হিসেবে ডাবরকে (Dabur India (Dr. S K Burman) Pvt. Ltd.) সম্পূর্ণভাবে নথিভুক্ত করা হয়। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৭০-এর দশকের গোড়ায় কলকাতা শহরে নকশাল আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে। এছাড়াও সেই সময়ে কলকাতায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে সি এল বর্মণের নাতি জি সি বর্মণ শ্রমিকদের দ্বারা ঘেরাও হন এবং সেই কারণেই ১৯৭২ সালে ডাবর কোম্পানির প্রধান কার্যালয় দিল্লিতে স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয় বর্মণ পরিবার। পরবর্তীকালে তাঁর ভাইয়েরা দিল্লিতে চলে গিয়েছিলেন। মূলত বিংশ শতাব্দীর নয়ের দশকের শেষাশেষি ব্যবসায় আরও দ্রুত উন্নতিলাভের জন্য বর্মণ পরিবারের নতুন প্রজন্ম বাইরের পেশাদার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। তারা ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানির পরামর্শ চায়। এই ম্যাককিনসে কোম্পানির হাতেই পরে ডাবর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে চলে গেলেও অবশ্য বর্মণ পরিবারের সদস্যরাও কিন্তু ডাবরের খুব গুরুত্বপূর্ণ পদে রইলেন। বর্তমানে ডাবর কোম্পানির নেতৃত্বে আছেন মোহিত মালহোত্রা এবং ২০১৯ সালে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান পদে বসেন অমিত বর্মণ।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading