সববাংলায়

এডউইন হাবল

এডউইন হাবল (Edwin Hubble) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যাঁর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বহিঃছায়াপথ জ্যোতির্বিদ্যা (extragalactic astronomy) ও মহাবিশ্বতত্ত্বে (cosmology) তাঁর অবদান এমন পর্যায়ের যে তাঁকে প্রায়শই “আধুনিক মহাজাগতিক বিজ্ঞানের জনক” বলা হয়। বিশেষত অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার দূরত্ব নিরূপণ, বহুসংখ্যক ছায়াপথের অস্তিত্বের স্বীকৃতি প্রদান এবং রেডশিফ্ট-দূরত্ব সম্পর্কিত হাবলের সূত্র (Hubble’s Law) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি মহাবিশ্বের প্রসারণশীল প্রকৃতি উদঘাটনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন।

১৮৮৯ সালের ২০ নভেম্বর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি রাজ্যের মার্শফিল্ড শহরে এডউইন হাবলের জন্ম হয়। তাঁর পিতা জন পাওয়েল হাবল পেশাগতভাবে ছিলেন ন্যাশনাল ফায়ার ইন্স্যুরেন্স অফ হার্টফোর্ড কোম্পানির ম্যানেজার, আর মা ভার্জিনিয়া লুইস জেমস হাবল গৃহিণী ছিলেন। এডউইন হাবল সহ তাঁদের আটটি সন্তান ছিল। ১৯২৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এডউইন হাবল গ্রেস বার্ককে বিয়ে করেন। এডউইন আর গ্রেসের কোনও সন্তান ছিল না। গ্রেস পরবর্তী জীবনে হাবলের গবেষণা ও ব্যক্তিগত নথিপত্র সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

হুইটন হাই স্কুলে পড়াশোনা করার সময় হাবলের মনোযোগ পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলার দিকে বেশি ছিল। তিনি স্কুলের অ্যাথলেটিক্স টিমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। ফুটবল তাঁর প্রিয় খেলা হলেও তিনি ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্টেও নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। পড়াশোনায় খুব মনোযোগী না হলেও তাঁর মেধা এবং স্বাভাবিক নেতৃত্বদানের ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।

এক নজরে এডউইন হাবলের জীবনী:

  • জন্ম: ২০ নভেম্বর, ১৮৮৯
  • মৃত্যু: ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৩
  • কেন বিখ্যাত: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল বহিঃছায়াপথ জ্যোতির্বিদ্যা ও মহাবিশ্বতত্ত্বে অপরিসীম অবদান রেখেছেন। মহাবিশ্বে একের বেশি ছায়াপথের অবস্থান, সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা সবই তাঁর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ফসল।
  • পুরস্কার ও স্বীকৃতি: এডউইন হাবলকে প্রায়শই “আধুনিক মহাজাগতিক বিজ্ঞানের জনক” বলা হয়। তাঁর নামে মহাকাশে একটি টেলিস্কোপ পাঠানো হয় যা ‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ’ নামে পরিচিত। এছাড়াও ফ্রাঙ্কলিন মেডেল, বার্নার্ড মেডেল ইত্যাদি পুরস্কার পেয়েছেন।

১৯০৬ সালে হাই স্কুল শেষ করার সময় তাঁর অধ্যক্ষ মজা করে মন্তব্য করেছিলেন—“এডউইন, আমি চার বছর ধরে তোমাকে দেখছি, কিন্তু কখনও দশ মিনিটও পড়াশোনায় মন দিতে দেখিনি।” অথচ পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহী এই তরুণই ১৯০৬ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃত্তি লাভ করেন। যদিও এই বৃত্তি অন্য একজন ছাত্রও পেয়েছিল, ফলে বৃত্তির টাকার অর্ধেক আর্থিক সহায়তা হিসেবে পেয়েছিলেন। বাকি অর্থ তিনি ব্যক্তিগত টিউশনি, গ্রীষ্মকালীন কাজ, পদার্থবিদ্যায় জুনিয়র ফেলোশিপ এবং বিখ্যাত পদার্থবিদ রবার্ট মিলিকানের সহকারী হিসেবে কাজ করে জোগাড় করেছিলেন যিনি পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

১৯১০ সালে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। তিনি ইলিনয় থেকে রোডস স্কলার হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পান। বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও মূলত বাবার ইচ্ছাতেই তিনি আইন নিয়ে অক্সফোর্ডের কুইন্স কলেজে ভর্তি হন। সেখানে রোমান এবং ইংরেজি আইন বিষয়ে তিন বছর পড়াশোনা করেন তিনি। তাঁকে কুইন্স কলেজের সম্মানসূচক ফেলো করা হয়েছিল। এরপর ১৯১৩ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক বছর কেনটাকির লুইসভিলে আইন অনুশীলনও করেন হাবল। কিন্তু মননে বৈজ্ঞানিক হাবল চাইতেন বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে বৈজ্ঞানিক হতে। তাই ১৯১৩ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি কোনও দিকে না তাকিয়ে বৈজ্ঞানিক হওয়ার পথ বেছে নেন।

১৯১৩ সালের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পর, এডউইন হাবল ইন্ডিয়ানার উচ্চ বিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য অধ্যাপনা করেন। এরপর, ১৯১৪ সালে তিনি ফের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। সেখানে জ্যোতির্বিদ্যায় স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৭ সালের গোড়ার দিকে ডক্টরেটের কাজ শেষ হয়ে আসে। এই সময় হাবলকে ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে এটি ছিল বেশ বড় সুযোগ কিন্তু ভাগ্য তাঁর সঙ্গ দেয় না। আমেরিকা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পরে। পিএইচডি থিসিস “ফ্যায়েন্ট নেবুলার ফটোগ্রাফিক ইনভেস্টিগেশনস” শেষ করে মৌখিক পরীক্ষা দেওয়ার পরও আমন্ত্রণ ছাড়তে হয় তাঁকে। বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার পদাতিক বাহিনীতে যোগদান করেন তিনি। যুদ্ধ শেষে তিনি অবশ্য মাউন্ট উইলসনে যোগ দেন।

মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রথমে তিনি প্রতিফলন নীহারিকা (reflection nebulae) ও সর্পিল নীহারিকা (spiral nebulae) নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তখনও বৈজ্ঞানিক মহলে বিতর্ক চলছিল — এই সর্পিল নীহারিকাগুলো কি আকাশগঙ্গার অংশ, নাকি স্বতন্ত্র জগৎ?

১৯২৩ সালে এডউইন হাবল অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকায় (M31) সেফিড পরিবর্তনশীল নক্ষত্র আবিষ্কার করেন। সেফিড নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা ও সময়কাল নির্ধারণের মাধ্যমে তিনি অ্যান্ড্রোমিডার দূরত্ব নির্ণয় করেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী এটি ছিল প্রায় ৯,০০,০০০–১০,০০,০০০ আলোকবর্ষ দূরে। যদিও বর্তমান গবেষণা অনুযায়ী এর প্রকৃত দূরত্ব প্রায় ২.৪৮ মিলিয়ন আলোকবর্ষ, তবুও সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে হাবলের অনুমান বিপ্লবাত্মক ছিল। তাঁর এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে অ্যান্ড্রোমিডা কেবল একটি নীহারিকা নয়, বরং আমাদের আকাশগঙ্গার বাইরে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ ছায়াপথ। পরবর্তীতে এটি অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি নামে পরিচিত হয়। অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা এবং অন্যান্য সর্পিল নীহারিকা নিয়ে হাবলের গবেষণার পর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছিলেন যে মহাবিশ্বে অসংখ্য ছায়াপথ রয়েছে।

১৯২৯ সালে এডউইন হাবল একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তিনি বিভিন্ন গ্যালাক্সির দূরত্ব ও রেডশিফ্ট (ডপলার এফেক্টের কারণে তাদের বর্ণালীর লাল দিকের স্থানান্তর) পর্যালোচনা করে দেখান যে দূরত্ব যত বেশি, রেডশিফ্টও তত বেশি। অর্থাৎ ছায়াপথগুলো একে অপর থেকে সরে যাচ্ছে।

এই পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি যে সম্পর্ক দাঁড় করালেন, তা-ই আজ “হাবলের সূত্র” নামে পরিচিত:

V = H₀ × D
V = গ্যালাক্সির পশ্চাদপসরণের বেগ
D = গ্যালাক্সির দূরত্ব
H₀ = হাবল ধ্রুবক

এই সূত্র থেকে মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে—এই ধারণাই পরবর্তী কালে বিগ ব্যাং থিয়োরির (Big Bang Theory) ভিত্তি হয়ে ওঠে।

যদিও তিনি নিজে সরাসরি “রেডশিফ্ট মানেই প্রসারণের বেগ” এই ব্যাখ্যা দিতে চাইতেন না, তাঁর পর্যবেক্ষণ পরবর্তী পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য মহাবিশ্বতত্ত্বে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

১৯১৭ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণাপত্র “Kosmologische Betrachtungen zur Allgemeinen Relativitätstheorien” (“Cosmological Considerations on the General Theory of Relativity”) প্রকাশের পর বেশ কিছু পদার্থবিদ, গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের বৃহত্তর স্তরের বৈশিষ্ট্যের (large-scale properties of the universe) সঙ্গে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের (general relativity) মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে চেষ্টা করছিলেন। হাবল এবং তাঁর সহকারী গবেষক মিল্টন হুমাসন (Milton Humason) দ্বারা পরিবেশিত রেডশিফ্ট ও দূরত্ব সম্পর্কটি বিভিন্ন তাত্ত্বিকদের সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের (expanding universe) সাধারণ আপেক্ষিকতা-ভিত্তিক তত্ত্বের সাথে মিলে যায়। এর ফলে ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রেডফিফ্ট-দূরত্ব সম্পর্ককে সাধারণত বেগ-দূরত্ব সম্পর্ক হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু হাবল নিজে রেডফিফ্টকে বেগের পরিবর্তন হিসাবে চিহ্নিত করার পক্ষপাতী ছিলেন না। এমনকি হাবলের আবিষ্কারের পর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে এসেছিলেন। আইনস্টাইন তাঁর মহাবিশ্বের স্থির মডেল (Static Universe) থেকে সরে এসে হাবলের সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের তত্ত্বকে সমর্থন জানান।

১৯৪২ সাল পর্যন্ত এডউইন হাবল মাউন্ট উইলসনে গবেষণা চালিয়ে যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবারও বৈজ্ঞানিক কাজ ছেড়ে তাঁকে সামরিক প্রশাসনিক পদে যোগ দিতে হয়। তিনি মেরিল্যান্ডের অ্যাবারডিন প্রোভিং গ্রাউন্ডসে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ শেষে তাঁর অবদানের জন্য ১৯৪৬ সালে মার্কিন সরকার তাঁকে Medal of Merit প্রদান করে।

এরপর তিনি পুনরায় মাউন্ট উইলসনে ফিরে আসেন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। পাশাপাশি তিনি নতুন ও আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিজ্ঞান মহলকে উৎসাহিত করেছিলেন।

হাবল শুধু মহাবিশ্বের প্রসারণ আবিষ্কার করেননি, তিনি বিভিন্ন ছায়াপথের শ্রেণীবিভাগও করেছিলেন। তিনি ছায়াপথগুলিকে তাদের আকার ও গঠন অনুসারে কুণ্ডলাকার (Spiral), উপবৃত্তাকার (Elliptical) এবং সর্পিলাকার (Barred Spiral) হিসাবে ভাগ করেন। এই শ্রেণীবিভাগটি “হাবল সিকোয়েন্স” বা “হাবলের টিউনিং ফর্ক” (Hubble’s Tuning Fork) নামে পরিচিত।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে এডউইন হাবলের অবদানের জন্য ১৯৩১ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বার্নার্ড মেডেল, ১৯৩৯ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন ইনস্টিটিউট, ফিলাডেলফিয়া থেকে থেকে ফ্র্যাঙ্কলিন মেডেল, ১৯৪০ সালে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি থেকে গোল্ড মেডেল অব দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি ইত্যাদি পুরস্কার পান। তবে তাঁর জীবদ্দশায় জ্যোতির্বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার দেওয়া হত না বলে নোবেল পুরস্কার পাননি। পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিদ্যাকে পদার্থবিদ্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৫৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান মারিনোতে সেরিব্রাল থ্রম্বোসিসে (মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধা) আক্রান্ত হয়ে এডউইন হাবলের মৃত্যু হয়। হাবলের গবেষণার কাগজ, চিঠিপত্র, ছবি ইত্যাদি ক্যালিফোর্নিয়ার সান মারিনোর হান্টিংটন লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। মহাকাশবিজ্ঞানী এডউইন হাবল মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা পালটে দিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে মহাকাশে একটি টেলিস্কোপ পাঠানো হয় যা ‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ’ নামে পরিচিত। হাবল টেলিস্কোপ আজও মহাকাশের বিভিন্ন ছবি তুলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading