এরল চন্দ্র সেন (Erroll Chunder Sen) একজন ভারতীয় বাঙালী বিমানচালক যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনার রয়্যাল মেরিন কর্পস ও রয়্যাল এয়ার ফোর্সের হয়ে যুদ্ধ বিমান চালিয়েছিলেন।
১৮৯৯ সালের ১৩ মার্চ ব্রিটিশ শাসনাধীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে এরল চন্দ্র সেনের জন্ম হয়। তাঁর সম্পূর্ণ নাম এরল শুভ চন্দ্র সেন। তাঁর বাবা মায়ের নাম সেরকমভাবে জানা যায়না। তাঁর ঠাকুরদা ছিলেন বিখ্যাত বাঙালি সমাজ সংস্কারক কেশবচন্দ্র সেন। তাঁর পিসি ছিলেন কোচবিহারের মহারানী সুনীতি দেবী । বাল্যকালেই এরল তাঁর পরিবার সহ ইংল্যান্ডে স্থানান্তরিত হয় যান।
ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের ফ্লিটউডে অবস্থিত রোসাল স্কুলে তাঁর স্কুল শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর তিনি অফিসার ট্রেনিং কর্পসে ভর্তি হন সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য।
এরল চন্দ্র ১৯১৬ সালে প্রথমবার রয়্যাল ফ্লাইং কর্পসে ভর্তির জন্য আবেদন জানান। কিন্তু ভর্তির জন্য উপযুক্ত বয়স না হওয়ার কারণে তাঁর আবেদনপত্রটি নাকচ হয়ে যায়। একরকম বাধ্য হয়েই তিনি আঠারো বছর বয়স না হওয়া অবধি একটি ব্যাংকে কাজ করেন।১৯১৭ সালে আঠারো বছর বয়স হলে তিনি রয়্যাল ফ্লাইং কর্পসে ভর্তির জন্য পুনরায় আবেদন করেন এবং ভর্তিও হয়ে যান। তাঁকে দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে অস্থায়ী ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁকে রিডিংয়ে অবস্থিত তৎকালীন ইংল্যান্ডের সামরিক বিমান চালনা প্রশিক্ষণের শ্রেষ্ঠ স্কুলে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। এখানে প্রায় সত্তর ঘন্টা বিমান ওড়ানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তাঁকে পশ্চিম ফ্রন্টে বেলজিয়ামে যুদ্ধ করবার জন্য পাঠানো হয় একটি এক আসন বিশিষ্ট যুদ্ধ বিমান সহ। এর এক মাস বাদে আকাশে সামরিক টহলদারির সময় হঠাৎ তাঁর বিমানে জ্বালানী সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে তিনি বিমানটিকে জরুরি অবতরণ করবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন। চেষ্টা করতে করতে মেঘের মধ্যে প্রবেশ করেন তিনি। মেঘ থেকে কিছুক্ষণের মধ্যে বেরোতেই শত্রুপক্ষের ৪টি বিমান তাঁর বিমানকে আক্রমণ করে। তাঁর বিমানের দুটি জ্বালানি ট্যাঙ্ক ই এই আক্রমণে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি কোনক্রমে বিমানটিকে বেলজিয়ামের মেনিন প্রদেশে অবতরণ করান।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এরল চন্দ্র যুদ্ধবন্দী হিসেবে হোলজমিন্ডেন যুদ্ধবন্দী শিবিরে বন্দী থাকেন। এই হোলজমিন্ডেন যুদ্ধবন্দী শিবিরটি জার্মানিতে অবস্থিত একটি বন্দী শিবির ছিল যেটি মূলত স্থাপন করাই হয়েছিল। ব্রিটিশ সৈন্য ও অফিসারদের বন্দী রাখার জন্য। ১৯১৮ সালের ২৪ জুলাইয়ের রাতে একটি সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং বিখ্যাত বন্দী পলায়ন ঘটেছিল। এই সুড়ঙ্গটি প্রায় নয় মাস ধরে খনন করা হয়েছিল যার প্রবেশদ্বারটি শ্রমিকদের কোয়ার্টারের সিঁড়ির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মোট ৮৬ জন অফিসার এই শিবির থেকে পালানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। এরল চন্দ্র সেন ও ছিলেন তাদের মধ্যে। কিন্তু ২৯ জন অফিসার পালানোর পর ৩০ তম অফিসারের ওপর সুড়ঙ্গটি ভেঙে পড়ে । এরল চন্দ্র ৩০ জনের পর ছিলেন। সুতরাং তাঁর পালানোর স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। ১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষে তাঁকে ইংল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়।
ইংল্যান্ডে ফেরত আসার পর এরল চন্দ্র কে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। ভারতে তিনি ইন্ডিয়ান ইম্পেরিয়াল পুলিশে সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট হিসাবে কুমিল্লায় যোগদান করেন। এরল চন্দ্র এবং তার ভাইকে পরবর্তীকালে বার্মার রেঙ্গুনে স্থানান্তরিত হন। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে পার্ল হারবারে জাপানি আক্রমণের পর, এরল চন্দ্র রয়্যাল এয়ার ফোর্সে পুনরায় তালিকাভুক্ত হন। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন বার্মা ছেড়ে যাওয়ার কিন্তু বার্মা ছেড়ে যাওয়ার কোন উপায় খুঁজে পাননি। তিনি দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, এবং সেই চেষ্টাতেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে মনে করা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to আজকের দিনে ।। ১৩ মার্চ | সববাংলায়Cancel reply