ধর্ম

গুড ফ্রাইডে ।। হোলি ফ্রাইডে ।। ব্ল্যাক ফ্রাইডে ।। গ্রেট ফ্রাইডে

গুড ফ্রাইডে খ্রিষ্টানদের কাছে পালনীয় একটি পবিত্র ছুটির দিন। এই দিনটির আরও নাম আছে। যেমন  হোলি ফ্রাইডে (ইংরেজি: Holy Friday, “পবিত্র শুক্রবার”), ব্ল্যাক ফ্রাইডে (ইংরেজি: Black Friday, “কালো শুক্রবার”) বা গ্রেট ফ্রাইডে (ইংরেজি: Great Friday, “মহান শুক্রবার”)।এই দিনটি মুলত গলগথায় যীশু খ্রিষ্টকে  ক্রুসবিদ্ধ করে হত্যা করার পর , সমাধিমন্দির থেকে তাঁর পুনর্জীবন লাভ করাকে কেন্দ্র করেই  এই উৎসবটি পালিত হয়। খ্রিস্ট ধর্ম অনুযায়ী পবিত্র সপ্তাহে ইস্টার রবিবারের ঠিক আগের  শুক্রবারটিতে এই উৎসব পালন করা হয়। প্রায়শই গুড  ফ্রাইডে ইহুদিদের উৎসব পাসওভারের সঙ্গে একই দিনে উদযাপিত হয়ে থাকে।

এখন প্রশ্ন কেউ করতেই পারে এ দিন তো চরম শোকের দিন।খ্রিষ্ট ধর্মের মুল ভিত্তিটাই যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার মৃত্যুর দিন কি করে ‘গুড’ হতে পারে! গুড ফ্রাইডের এই ‘গুড’ শব্দটি নিয়ে নানা মুনির নানা মত।কারও মতে ‘গুড’ বলতে ‘পবিত্র’ বোঝায়।আবার কারও মতে ‘গুড’ শব্দটি ‘গড’ শব্দটির অপভ্রংশ।অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধান অবশ্য ‘গুড’ বলতে ‘পবিত্র’ মতটির পক্ষেই রায় দিয়েছে।

যীশুর শিষ্য জুডাস ইসকারিয়োটের সাহায্যে  মন্দিরের রক্ষীদল গেৎশিমানি বাগানে যীশুকে গ্রেফতার করে। যীশুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার পুরস্কার হিসেবে  জুডাসকে ৩০টি রূপোর কয়েন  দেওয়া হয়েছিল। জুডাস রক্ষীদলকে বলে রেখেছিলেন যে তিনি যাঁকে চুম্বন করবেন তিনিই হবেন যীশু। যীশুকে হাননের প্রাসাদে নিয়ে আসা হল। হানন ছিলেন সেই বছরের জন্য নিযুক্ত প্রধান পুরোহিত কায়াফারের শ্বশুর। সেখানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে বিশেষ ফল না হওয়ায় তাঁকে প্রধান পুরোহিত কায়াফারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সানহেড্রিয়ানরা(প্রাচীন ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃপক্ষ) একসাথে জড়ো হয়।

যীশুর বিচারসভায় বিভিন্ন সাক্ষী পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্যপ্রদান করেছিল। যীশু সেই প্রসঙ্গে একটি কথাও উচ্চারণ করেননি। অবশেষে প্রধান পুরোহিত নিজে উঠে যীশুকে শপথ নিয়ে নিজ বক্তব্য জানাবার আদেশ দিলেন। তিনি বললেন, “জীবনময় ঈশ্বরের দোহাই, আমাদের বল, তুমিই কি ঈশ্বরের পুত্র সেই খ্রিষ্ট?” যীশু উত্তর দিলেন, “আপনি নিজেই তা বললেন। তাছাড়া আমি আপনাদের বলেছি, এখন থেকে আপনারা দেখবেন মানবপুত্র সর্বশক্তিমানের ডানদিকে থাকবে। আবার মেঘে চেপেও তাঁকে নেমে আসতে দেখবেন।”প্রধান পুরোহিত এই কথার জন্য যীশুকে ঈশ্বরনিন্দার দায়ে অভিযুক্ত করলেন। যীশুর সানহেড্রিয়ন বিচার শেষ হল তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মাধ্যমে। এদিকে বিচার চলাকালীন উঠোনে অপেক্ষমাণ পিটার বিচার দেখতে আসা জনগণের নিকট তাঁর সঙ্গে যীশুর সম্পর্কের কথা তিন বার অস্বীকার করলেন। যীশু অবশ্য আগে থেকেই জানতেন যে তাঁকে পিটার তিনবার অস্বীকার করবেন।

পরদিন সকালে সমস্ত সভাসদরা যীশুকে রোমান রাজ পন্টিয়াস পাইলেট এর কাছে নিয়ে গেল। তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ, সিজারকে রাজস্বদানে বাধা ও নিজেকে রাজা ঘোষণা করার অভিযোগ আনা হল । পাইলেট ইহুদি সমাজপতিদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী যীশুর বিচার ও শাস্তিদানের অনুমতি দিলেন। কিন্তু ইহুদি সমাজপতিরা জানালেন রোমান আইন অনুযায়ী তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অনুমতি নেই ।

পাইলেট নিজে যীশুকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন ও ইহুদি বিচারকদের জানালেন যে তিনি যীশুকে শাস্তিদানের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। যীশু গালিলের লোক জেনে তিনি গালিলের শাসক রাজা হেরোডের উপর যীশুর বিচারের ভার ছেড়ে দিলেন। হেরোড পাসওভারের ভোজসভা উপলক্ষে সেই সময় জেরুজালেমেই ছিলেন। হেরোড যীশুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনো উত্তর পেলেন না। তিনি পুনরায় যীশুকে পাঠিয়ে দিলেন পাইলেটের কাছে। পাইলেট সমাজপতিদের জানালেন যে তিনি বা হেরোড কেউই যীশুকে দোষী মনে করছেন না। শেষে পাইলেট সমস্যা সমাধানের জন্য যীশুকে শুধুমাত্র চাবুক মেরে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব রাখলেন ।

পাসওভার ভোজসভার রীতি অনুযায়ী এই দিন ইহুদিদের অনুরোধক্রমে রোমানরা একজন বন্দীকে ছেড়ে দিতেন। পাইলেট জনসাধারণকে জিজ্ঞাসা করলেন যে তারা কার মুক্তি চাইছে। প্রধান পুরোহিতের অঙ্গুলি হেলনে জনগণ খুনি বারাব্বাসের মুক্তি চাইল। পাইলেট যীশুকে নিয়ে কি করা উচিত সেই ব্যাপারে সকলের মতামত চাইলে সকলেই এক বাক্যে বলল “ওকে ক্রুসবিদ্ধ করুন।” পাইলের-এর স্ত্রী আগের রাতে যীশুকে স্বপ্নে দেখেছিলেন। তিনি পাইলেট কে সাবধান করে দিয়ে বললেন, “এই ধার্মিক মানুষটির ক্ষতি কোরো না।”

পাইলেট যীশুকে চাবুক মেরে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে আবার সর্বসমক্ষে নিয়ে এলেন। প্রধান পুরোহিত তখন যীশুর বিরুদ্ধে ঈশ্বরদ্রোহিতার নতুন অভিযোগটি আনলেন। ভয় পেয়ে পাইলেট পুনরায় যীশুকে জিজ্ঞাসাবাস করার জন্য ভিতরে নিয়ে গেলেন।

জনতার সম্মুখে এসে পাইলেট আবার যীশুকে নিরপরাধ ঘোষণা করলেন। তিনি জলে হাত ধুয়ে জানিয়ে দিলেন, যীশুর বিচারে আর তিনি অংশ নেবেন না। তবে সম্ভাব্য দাঙ্গা রোখার জন্য এবং নিজের চাকরি রাখতে পাইলেট যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন। “নাজারেথের যীশু, ইহুদিদের রাজা” লেখা একটি ক্রুস যীশু বয়ে নিয়ে চললেন গলগথা নামক স্থানে। তাঁকে ক্রুস বহনে সাহায্য করেছিলেন সাইরিনের সিমন। গলগাথায় অপর দুই অপরাধীর সঙ্গে তাঁকে ক্রুসবিদ্ধ করা হল ।

ছয় ঘণ্টা যীশু ক্রুসে যন্ত্রণাভোগ করেন। শেষ তিন ঘণ্টায় (দুপুর তিনটে থেকে) অন্ধকারে সমগ্র অঞ্চলটি ঢেকে যায়।চিৎকার করে যীশু প্রাণত্যাগ করেন। ভূমিকম্প হয়, সমাধিপ্রস্তরগুলি ভেঙে যায় এবং প্রধান মন্দিরের পর্দা উপর থেকে নিচ অবধি ছিঁড়ে যায়। যে সেঞ্চুরিয়ন ক্রুসবিদ্ধকরণের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন, “ইনি সত্য সত্যই ঈশ্বরপুত্র ছিলেন।”

সানহেড্রিয়ানের সদস্য যীশুর গোপন অনুগামী আরিমাথিয়ার যোসেফ যীশুর বিচারে সম্মতি দেননি। তিনি পাইলেটের নিকট যীশুর দেহ চেয়ে নেন । নিকদিম নামে যীশুর আর এক গোপন অনুগামী তথা সানহেড্রিয়ানের সদস্য একশো পাউন্ড ওজনের মশলার মিশ্রণ নিয়ে যীশুর দেহ কাপড়ে মুড়তে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন । যীশুর মৃত্যু হয়েছে কিনা তা জানতে পাইলেট সেঞ্চুরিয়নকে আদেশ দিলেন । এক সৈনিক যীশুর দেহে বর্শার আঘাত করাতে ক্ষতমুখ দিয়ে রক্ত ও জল বেরতে লাগলো। সেঞ্চুরিয়ন পাইলেটকে যীশুর মৃত্যুসংবাদ দিলেন ।

আরিমাথিয়ার যোসেফ যীশুর দেহ পরিষ্কার লিনেন-এর কাপড়ে মুড়ে যেখানে ওনাকে ক্রুসবিদ্ধ করা হয় সেখান থেকে দূরে একটি বাগানে তাঁর নিজের জন্য নির্মাণ করা পাথর খোদিত সমাধিমন্দিরে রেখে দিলেন । নিকডিম এলেন সোয়া মণ গন্ধরস মেশানো আরও কিছু ভেষজ নিয়ে। ইহুদি সৎকার প্রথা অনুযায়ী সেগুলি রেখে দিলেন আচ্ছাদন বস্ত্রে যীশুর দেহের সঙ্গে । একটি বড়ো পাথর দিয়ে তাঁরা সমাধির মুখ আটকে দিলেন । সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘরে ফিরে এলেন । তৃতীয় দিন, রবিবার, যীশু পুনরুজ্জীবিত হলেন। ইস্টার চল্লিশ দিন ব্যাপী উপবাস, প্রার্থনা এবং অনুশোচনার মাধ্যমে পালন করা হয়। চল্লিশ দিন ব্যাপী উপবাসের শেষ সপ্তাহকে পুণ্য সপ্তাহ বলা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!