সববাংলায়

ছোট শিখ সঙ্গত গুরুদ্বার | গুরুদুয়ারা ছোটা শিখ সঙ্গত, কলকাতা

বঙ্গদেশে নানা ধর্মের পাশাপাশি সহাবস্থান। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ সকলেই তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলার বুকে। কেবলমাত্র কলকাতা শহরের দিকে তাকালেই এই সব ধর্মের উপাসনালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে। শিখদের অনেকগুলি গুরুদ্বার রয়েছে কলকাতা শহরে। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পন্ন একটি গুরুদ্বার হল ছোট শিখ সঙ্গত গুরুদ্বার (Gurudwara Chhota Sikh Sangat)। বড়বাজার অঞ্চলে ১১২, কটন স্ট্রীট, রাজা কাটরায় এই গুরুদ্বারের অবস্থান। একটি বাড়ির অভ্যন্তরে এটি অবস্থিত এবং এর নাম থেকেই আন্দাজ করা যায় যে, আকারে গুরুদ্বারটি বড় শিখ সঙ্গতের তুলনায় ছোট। দুজন ইতিহাসখ্যাত শিখগুরু এককালে এখানে এসেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, সেকারণে স্থানটি বিশেষত শিখধর্মের মানুষদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় এবং আকারে ছোট হলেও সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী এই ছোট শিখ সঙ্গত গুরুদ্বার পরিদর্শনের জন্য আসেন। বয়সের দিক থেকে এটি যেমন প্রাচীন তেমনই ঐতিহাসিকভাবেও গুরুদ্বারটির গুরুত্ব অপরিসীম।

শিখধর্মের প্রথম দিকে ধর্মীয় উপাসনার স্থলকে গুরুদুয়ারার বদলে ধর্মশালা বলা হত। জনম সখীদের মতে, গুরু নানক যেখানেই গিয়েছিলেন সেখানেই তাঁর অনুসারীদের ধর্মশালা প্রতিষ্ঠা করবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। গুরু হরগোবিন্দের (১৫৯৫-১৬৪৪) সময় থেকে ধর্মশালাগুলিকে গুরুদুয়ারা বলা শুরু হয়েছিল। যদিও গুরুদুয়ারা বলতে গুরুর গৃহ বা ঘর মনে হতে পারে, কিন্তু সঠিকভাবে গ্রন্থসাহেবে উল্লিখিত শব্দটি ও তার বানান লক্ষ করলে বোঝা যাবে উচ্চারণটি হল ‘গুরদুয়ারা’। গুর শব্দের অর্থ গুরু কিন্তু দুয়ারা বলতে ‘মাধ্যমে’ বা ‘সাহায্যে’ বোঝায়। আসলে একজন শিখের বিশ্বাস হল প্রতিটি জিনিসই গুরুর মাধ্যমে বা কৃপাতেই অর্জিত হয়ে থাকে।

এখানে উল্লেখ্য যে, শিখধর্মে কোন বিশেষ প্রতীক বা আচার-অনুষ্ঠানের স্থান নেই। সেইজন্য শিখদের গুরুদুয়ারাতে কোনরকম বিগ্রহ দেখা যায় না। তবে প্রত্যেকটি গুরুদুয়ারাতে মূর্তির বদলে শিখদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত পবিত্র গুরু গ্রন্থসাহেবের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, যেটি সদগুরু নামেও পরিচিত। এটিই হল যে-কোন গুরুদুয়ারার কেন্দ্রবিন্দু। পবিত্র মণ্ডলী অর্থাৎ সঙ্গতেরা শিখ গুরুদের নীতি ও আদর্শকে যা গ্রন্থসাহেবে সংকলিত রয়েছে, সেগুলি বিনম্র আনুগত্যে মেনে চলেন। এই ধর্মের সর্বাধিক বিশ্বস্ত অনুগামীরা গুরু গ্রন্থসাহেব গ্রন্থভুক্ত আদেশগুলির প্রতি উচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেন এবং সেগুলিকে যে-কোনও মূল্যে পালন করে থাকেন। গুরু গ্রন্থসাহেব রাখা থাকে বলেই ধর্মশালাকে গুরুদুয়ারা বলা হতে থাকে।

খোদ কলকাতা শহরে এরকম শিখ গুরুদুয়ারা বেশ কয়েকটি রয়েছে। সেগুলির মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য একটি গুরুদুয়ারা হল ছোট শিখ সঙ্গত গুরুদুয়ারা৷ বলা হয়ে থাকে যে নবম শিখগুরু তেগ বাহাদুর এবং দশম এবং সর্বশেষ শিখগুরু গুরু গোবিন্দ সিং উভয়েই এই স্থানে কয়েকদিন অতিবাহিত করেছিলেন৷ ফলত স্থানটি ঐতিহাসিকভাবে তো বটেই ধর্মের দিক থেকেও শিখদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয়। নির্মলা সাধু এই গুরুদুয়ারাটির সযত্নে দেখাশোনা করেন।

আকারে ছোট হলেও শিখদের গুরুদুয়ারাগুলির স্থাপত্যের নানা ধরন এই ছোট শিখ সঙ্গত গুরুদুয়ারাতেও দেখতে পাওয়া যায়। গুরুদুয়ারগুলির জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থাপত্যরীতিই যে আবশ্যক তেমন নয়, কেবলমাত্র প্রত্যেকটি গুরুদুয়ারার ভিতরে গুরু গ্রন্থসাহেবের জন্য একটি বিশেষ জায়গা থাকতেই হবে। সাধারণত মেঝের থেকে একটু উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপরে, একটি সুদৃশ্য ছাউনি দেওয়া আসনের ওপরে গ্রন্থসাহেবটি রাখা থাকে। অধিকাংশ গুরুদ্বারই মূলত হরিমান্দর প্যাটার্নে (অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির এই প্যাটার্নেই নির্মিত) অর্থাৎ ইন্দো-পারসিয়ান স্থাপত্যের মিশ্রণের অনুকরণে তৈরি হয়ে থাকে। তবে একেবারে ব্যস্ত রাস্তার একধারে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট শিখ সঙ্গত গুরুদ্বারটিকে বাইরে থেকে দেখলে প্রথম দর্শনে সাধারণ দ্বিতল সাদা একটি বাড়ি বলে মনে হবে। তবে প্রবেশপথটির বিশেষ নকশা থেকে আন্দাজ করা যায় এটি এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। প্রবেশদ্বারে মার্বেল ফলকের ওপর খোদাই করা রয়েছে ‘গুরুদুয়ারা ছোটা শিখ সঙ্গত’। তারপর দাবার ছককাটা মার্বেল বাঁধানো সরু প্যাসেজ পেরিয়ে গেলেই গুরুদুয়ারাগুলিতে যেমন বর্গাকৃতি বিশাল হলঘর দেখতে পাওয়া যায়, তেমন একটি বিশাল হলঘরে পৌঁছে যাওয়া যাবে। সেই হলঘরে কিন্তু একটি নয় চারিদিকে বেশ কয়েকটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। তবে হলঘরে প্রবেশের মূল দুটি বড় বড় দ্বারের মাঝখানে এবং দুপাশে রয়েছে সবুজ রঙ করা রাজকীয় স্তম্ভ। মাথার ওপর প্রাচীন কড়িকাঠের ছাদের আদল। ভিতরের দেওয়ালে শিখধর্মের কয়েকজন গুরুর ছবিও দেখা যায়। হলঘরের একেবারে সোজাসুজি প্রান্তদেশে রয়েছে সেই ছাউনি দেওয়া সিংহাসন। সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি বর্গাকৃতি আসনটির চতুর্দিকে সরু সরু অনেকগুলি স্তম্ভ। আসনের শীর্ষদেশ গম্বুজাকৃতি তবে তা চ্যাপ্টা ধরনের। সিংহাসনে গ্রন্থসাহেবের পাশাপাশি রয়েছে গুরু গোবিন্দ সিং-জীর একটি বাঁধানো ফোটোফ্রেম।

বছরের বিভিন্ন সময়ে শিখদের বিশেষ বিশেষ উৎসবের দিনগুলিকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হয় এই ছোট শিখ সঙ্গত গুরুদুয়ারাতে। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য গুরু নানকের জন্মদিন, যা সাধারণভাবে গুরু নানক জয়ন্তী নামে পরিচিত। নিত্তনৈমিত্তিক যে প্রার্থনা, গ্রন্থসাহেব থেকে বাণী পাঠ, ধর্মীয় গান ইত্যাদির আয়োজন হয়ে থাকে সেগুলি ছাড়াও ওই সময়তে বিশেষভাবে সাজানো হয় গুরুদ্বারটি। অসংখ্য শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ এসে ভিড় করেন এখানে। এছাড়াও এই ছোট শিখ সঙ্গত গুরুদ্বারই একমাত্র হোল্লা মোহাল্লা নগরকীর্তনের আয়োজন করে থাকে। কলকাতার রাস্তায় শিখ মানুষদের আকর্ষণীয় মিছিল বের হয়। সেই নগরযাত্রায় বিচিত্র আয়োজন দেখতে পাওয়া যায়। ঘোড়ার পিঠে চড়ে একদল শিখ চলেছেন কোথাও, কোথাও আবার ধর্মীয় চিহ্ন আঁকা পতাকা বহন করছেন একদল শিখ, মাথায় সকলের পাগড়ি বাঁধা। ফুল দিয়ে সাজানো চলমান গাড়ির ওপরে শিখগুরুদের পুষ্পসজ্জিত ছবি যাত্রার শোভা বাড়িয়ে তোলে। কিশোর থেকে শুরু করে প্রৌঢ় শিখ মানুষেরা এই মিছিলে রঙিন জামাকাপড় পড়ে অংশগ্রহণ করেন। বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে অনেকেই গান গাইতে গাইতে চলেন। কোথাও আবার দেখা যায় রাস্তার মাঝখানে কয়েকজন ঢাল-তলোয়ার, লাঠি ইত্যাদি নিয়ে যুদ্ধের মতো খেলা প্রদর্শন করছে। বিশাল এই শোভাযাত্রা কলকাতা শহরের মানুষ রাস্তার দুপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading