বঙ্গদেশে নানা ধর্মের সহাবস্থান। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ সকলেই তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলার বুকে। কেবলমাত্র কলকাতা শহরের দিকে তাকালেই এই সব ধর্মের উপাসনালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে। শিখদের অনেকগুলি গুরুদ্বার রয়েছে কলকাতা শহরে। সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পন্ন গুরুদ্বারটি হল বড় শিখ সঙ্গত গুরুদ্বার, যেটি আবার গুরুদুয়ারা বড়ি সঙ্গত (Gurudwara Bari Sangat) নামেও পরিচিত।
কলকাতার বড়বাজারের মতো সদাব্যস্ত, কোলাহলপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে শ্বেতশুভ্র এই গুরুদ্বারটির অবস্থান। এখানে অবস্থিত ফলকে খোদিত ইতিহাস থেকে গুরুদ্বারটির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে এবং কেন একে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুরুদ্বার বলে বিবেচনা করা হয় তা জানতে পারা যায়। গুরু নানক এবং নবম শিখগুরু তেগ বাহাদুরের নামও জড়িত রয়েছে এই গুরুদ্বারের সঙ্গে। বহু বন্ধুর পথ অতিক্রম করে বড় শিখ সঙ্গত গুরুদ্বারটি বর্তমানে একটি সুস্থির অবস্থায় আসতে পেরেছে। বিশেষ সব উৎসবের দিনে এখানে জাঁকজমক যেমন হয় তেমনই বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসে ভিড় করেন।
শান্ত, ভ্রাতৃত্ব এবং মানবতা প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে গুরু নানক যখন পূর্ব ভারতে এসেছিলেন, কথিত আছে ঢাকা থেকে পাঞ্জাবে ফেরবার সময় তখন তিনি কলকাতায় পদার্পণ করেন। আরও বিশদে বললে ১৫১০ সালের ২ জানুয়ারি এখানে এসেছিলেন তিনি। এই স্থানটি তখন মহামারীতে জর্জরিত, তাতে মানুষের দুর্দশার অন্ত নেই। সেই সময় গুরু নানকের ঐশ্বরিক নিরাময় ক্ষমতার বলে সেখানকার মানুষ রোগ থেকে মুক্তি পেয়ে সেরে উঠেছিলেন। মানুষকে নিরাময়ের জন্য গুরু নানক ‘গ্রন্থসাহেব’ থেকে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘চঞ্চল চিৎ না পাভে পরে আভাত জাত না লাগে বারা।’ অন্য আরও একটি মত অনুসারে, ১৫০৮ সালে গুরু নানক বাংলার ভক্তি আন্দোলনের কান্ডারি মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে দেখা করবার জন্য পুরীতে যাত্রা করবার সময় এই স্থানটি পরিদর্শন করেন। এখানে তিনি গুরু কি সঙ্গত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মোট বারোদিন এখানে অবস্থান করেছিলেন তিনি।
কথিত আছে গুরু নানকের পরে পরবর্তীকালে নবম শিখগুরু তেগ বাহাদুরজী স্বয়ং তাঁর বাংলা ও আসাম ভ্রমণের সময় এখানে এসেছিলেন। ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, ১৬৬৮ সালের এপ্রিল মাসে তেগ বাহাদুর এই স্থানটি পরিদর্শন করেন এবং ‘গ্রন্থসাহেব’-এর গুরুবাণী ‘হর কি গাত না কোই জানে’ পাঠ করেন। এমনকি এই গুরু কি সঙ্গতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান চালিয়ে যেতে এবং নিয়মিত দিওয়ান অর্থাৎ ধর্মীয় সমাবেশ করবার নির্দেশ দিয়ে যান। এমন দুই মহান শিখগুরুর পদধূলি এই গুরুদ্বারে পড়েছিল বলে অনুমিত হয় বলেই এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ গুরুদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
যে-স্থানে বড় শিখ সঙ্গত গুরুদ্বার অবস্থিত সেটি রাজা হাজারীচাঁদের এস্টেটের অংশ ছিল এবং তিনিই এটি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলেন। সেই রাজার মৃত্যুর পর তাঁর কন্যা শ্যাম কৌর এবং লীলা কৌর এর দেখাশোনা করতেন। পরবর্তীকালে অবশ্য অযোগ্য ম্যানেজমেন্টের হাতে এটি চলে যায়। ১৮৫২ সালে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হয় এবং তারা গুরুদ্বারের দায়িত্ব নিয়ে এর কিঞ্চিৎ উন্নতি ঘটায়।
কিন্তু বিশ শতক থেকে পুনরায় বড় শিখ সঙ্গত গুরুদ্বার চরম অব্যবস্থার সম্মুখীন হয়। ১৯১০ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে গুরুদ্বার ভবন ও সম্পত্তি চারবার বন্ধক রাখা হয়েছিল এবং প্রতিবারই খুবই বেশি পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে। ১৯২০ সালের এপ্রিল মাসে ১৬জন সদস্যের একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। সেই বছরই ডিসেম্বর মাসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে গুরুদ্বারের দায়িত্ব নবগঠিত শিরোমণি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটি, অমৃতসর-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে। ১৯২৩ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে সর্দার সুন্দর সিং মাজিথিয়া এবং ভাই মোহন সিং বৈদ স্থানীয় কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন কিন্তু গুরুদ্বারে আর্থিক উন্নতির কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত শিরোমণি কমিটিও গুরুদ্বার হাতে রাখতে অস্বীকার করে। এদিকে বন্ধকদাতা আদালতে যান এবং সেখানে ১৯২৯ সালের ১১ ডিসেম্বর সিদ্ধান্ত হয় যে, যদি ছয় মাসের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না করা হয় তবে বড় শিখ সঙ্গত গুরুদ্বারটি নিলামে তোলা হবে। অবশেষে ১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে সমস্ত বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া হয় এবং তারপর থেকে গুরুদ্বারটি সুস্থিরভাবে নির্ঝঞ্ঝাটে এগিয়ে চলেছে।
বড় শিখ সঙ্গত গুরুদ্বারের কাঠামোটি সুউচ্চ এবং শ্বেতশুভ্র। একেবারের শীর্ষে তিনটি সোনালি রঙের গম্বুজ দেখতে পাওয়া যায়, যার সঙ্গে ইসলামী স্থাপত্যের বেশ কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে এবং একই সঙ্গে যা অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে দৃশ্যমান গম্বুজগুলির কথা মনে করাতে পারে। বাইরে ভবনটির গায়ে অজস্র ছোট বড় কাচের সুদৃশ্য জানালা গুরুদ্বারটির নান্দনিক শোভা বৃদ্ধি করেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে ভবনের সম্মুখভাগ তিনটি লম্বালম্বি তিনটি অংশে বিভক্ত। দুই পাশের দুটি তথাকথিত সরু কলামের মাথায় দুটি ছোট সোনালি গম্বুজ এবং মাঝখানের প্রশস্ত অংশটির শীর্ষে বড় গম্বুজটির অবস্থান। প্রবেশদ্বারের মাথাতেও সাদা মার্বেলেরই তিনটি রাজস্থানী ঘরানার গম্বুজ-সংযুক্ত স্থাপত্য বর্তমান। গুরুদ্বারের ভিতরে প্রবেশ করলেই বিশাল এক কক্ষে এসে পৌঁছতে হয়। সেই বিরাট হলঘরের সোজাসুজি একেবারে প্রায় প্রান্তে রয়েছে শিখদের পবিত্র বেদী। বেদীটিকে ঘিরে ছাতার মতো চারপায়াবিশিষ্ট কারুকার্যশোভিত নান্দনিক ছাউনিটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এছাড়াও কক্ষের দেওয়ালে কাচের ওপরে শিখদের পবিত্র ধর্মীয় চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়।
বছরের বিশেষ বিশেষ উৎসবের দিন বড় শিখ সঙ্গত গুরুদ্বারে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়ে থাকে। বিশেষভাবে বলতে হয় শিখদের অন্যতম বিশিষ্ট দিন গুরু নানকের জন্মদিন বা গুরু নানক জয়ন্তীর কথা। এইদিন বড় শিখ সঙ্গত গুরুদ্বার থেকে বিরাট এক শোভাযাত্রা বের হয়। পাগড়ি পরা শিখদের সেই মিছিলের মতো শোভাযাত্রা দেখতে হাজার হাজার মানুষ পথের পাশে ভিড় করেন। শিখদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র যে ধর্মগ্রন্থ, তা ফুলদ্বারা সজ্জিত একটি ট্রেলারে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় সেই শোভাযাত্রায়৷ এছাড়াও গুরুদ্বারে সেদিন বিশেষ প্রার্থনারও আয়োজন হয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ গিয়ে সেখানে প্রার্থনায় অংশ নিতে পারেন। বিশেষ বিশেষ দিনগুলিতে প্রচুর মানুষ এই গুরুদ্বার পরিদর্শন করতে আসেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান