ধর্ম

লোহরি

লোহরি

ভারতে প্রচলিত শীতকালের একটি লোক উৎসব হল ‘ লোহরি ‘ (Lohri)। জনমত অনুসারে এই উৎসবটি শীতকালের শেষের সূচনা করে। লোহরির মাধ্যমে সূর্যের দক্ষিণায়নের শেষ এবং উত্তরায়নের সূচনাকে উদযাপিত করা হয়। এটি প্রধানত পাঞ্জাব প্রদেশে পালিত হলেও, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর ও দিল্লিতেও এই উৎসবের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা আছে।

লোহরি পালিত হয় মকর সংক্রান্তি বা ‘মাঘী’ উৎসবের আগের দিন রাত্রিতে। ইংরেজি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি প্রতি বছর ১৩ই জানুয়ারি পালিত হয়। সাধারণত পৌষ মাস লোহরি উৎসব পালনের মাস হিসেবে গণ্য হলেও পাঞ্জাবি সৌর-চান্দ্র ক্যালেন্ডারের সৌর অংশ অনুসারে এই উৎসব পালনের সঠিক দিনটি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ১৩ জানুয়ারি হয়ে থাকে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

লোহরি উৎসবের উৎপত্তির পিছনে লুকিয়ে আছে নানান প্রচলিত কাহিনী। কেউ কেউ মনে করেন এই উৎসবের উৎস হিমালয় অঞ্চলে যেখানে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় শীত বেশি। জমি থেকে রবি শস্য কেটে নেওয়ার কিছুদিন পরে চাষিরা একটি আগুনের চারপাশে জড়ো হয়ে তাড়াতাড়ি শীতকাল কাটিয়ে বসন্তকাল নিয়ে আসার জন্য সূর্যদেবের কাছে প্রার্থনা করত এবং বিগত শীতকালে তাদের উষ্ণতা প্রদান করার জন্য সূর্যদেব ও অগ্নিদেবকে ধন্যবাদ জানাত। মনে করা হয়, এই উৎসবই কালের নিয়মে পরিবর্তিত হয়ে আজকের ‘লোহরি উৎসব’-এ পরিণত হয়েছে।

শোনা যায়, মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে (মতান্তরে জাহাঙ্গীরের আমলে) দুল্লা ভাটি নামে এক মুসলমান দস্যু ছিল যিনি দস্যু হয়েও মহিলাদের সম্মান করত। জনশ্রুতি অনুসারে, দুল্লা নারী পাচারকারীদের হাত থেকে অনেক হিন্দু মহিলাকে রক্ষা করেছিল, যাদের জোর করে ক্রীতদাসী বানানোর জন্য বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছিল। উপযুক্ত হিন্দু যুবকদের সাথে সে সেই মহিলাদের বিয়েও দিয়েছিল দুল্লা ভাটি। এই বিয়ের সময় আগুন জ্বালানো হয়েছিল এবং নাচ-গান করে দর্শকরা আনন্দ প্রকাশ করেছিল। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, এইভাবেই সর্বপ্রথম লোহরি উৎসবের সূচনা হয়েছিল। নারী পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া এমন দুজন মহিলা ‘সুন্দ্রি’ ও ‘মুন্দ্রি। এই মহিলাদের নাম এবং দুল্লা ভাটির নাম এখনো লোহরি উৎসবের গানে পাওয়া যায়।

‘লোহ’ শব্দের অর্থ হল ‘আগুনের আলো এবং উষ্ণতা’। মনে করা হয় এখান থেকেই ‘লোহরি’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। মূলত এই উৎসব উৎসর্গ করা হয় অগ্নি ও সূর্য দেবতার উদ্দেশ্যে। এই উৎসবের মূল আকর্ষণ হল বড় করে আগুন জ্বালানো এবং তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচ-গান করা। উৎসবের দিন সকালে নারী-পুরুষ সবাই কাছাকাছি কোন নদীতে স্নান করে আসে। তারপর নতুন জামা কাপড় পরে সন্ধ্যাবেলার উৎসবের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গান গাইতে গাইতে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ঘুরতে থাকে। গ্রামবাসীরাও তাদের নানা খাবার ও অন্যান্য জিনিসপত্র দান করে। সব বাড়িতেই বিভিন্ন ঐতিহ্যগত খাবার-দাবার রান্না হয় এদিন। এর মধ্যে থাকে ‘সরর্ষো-দা-শাগ’ বা সর্ষের শাক, ‘মক্কি-কি-রোটি’ বা মকাই-এর রুটি, পুডিং, বিভিন্ন সুস্বাদু মিষ্টি ইত্যাদি। এছাড়াও এই উৎসবের জন্য বানানো হয় ‘ফুল্লি’ বা পপকর্ন, ‘গুনা’ বা আখ, ‘মুংফলি’ বা চিনাবাদাম, তিলের নাড়ু, তিলের বরফি, ক্ষীর, পাঞ্জিরি, পিন্নি, গোন্দ লাড্ডু এবং ‘গাজক’ নামে একটি মিষ্টি যেটি তৈরি হয় তিল, চিনাবাদাম এবং গুড় দিয়ে। যেহেতু পাঞ্জাবের একটি প্রধান ফসল হল আখ, তাই তা থেকে তৈরি চিনি এবং গুড় এই উৎসবের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে।

এই উৎসবের সবথেকে বড় আনন্দ হল পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলিত হওয়া। উৎসবের রাতের অগ্ন্যুৎসব এই আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কিছুদিন আগে থেকেই আগুন জ্বালানোর উপকরণ হিসেবে ছোট ছোট ডাল, কাঠ, গাছের শুকনো পাতা, ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো ইত্যাদি জোগাড় করে রাখা হয়। উৎসবের দিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর কোন ফাঁকা জায়গায় গ্রামবাসীরা সবাই জমা হয়ে বড় করে আগুন জ্বালানো হয় এবং সেই আগুনের চারদিকে ঘুরে ঘুরে সবাই নাচ-গান করে। নাচের মধ্যে প্রধানত থাকে পাঞ্জাবের ঐতিহ্যপূর্ণ নৃত্য ‘ভাংরা’ ও ‘গিদ্দা’। বিভিন্ন বিখ্যাত পাঞ্জাবী লোকসঙ্গীতের তালে তালে সবাই নাচতে থাকে।

এই উৎসব পাঞ্জাবী কৃষকদের কাছে নতুন বছরের আগমনের সূচনার জানান দেয়। এই দিনে তারা আগামী বছরের কৃষিকাজের জন্য অগ্নিদেবের কাছে প্রার্থনা করে, যাতে তিনি তাদের জমিকে আরও বেশি আশীর্বাদ করেন। আগুনের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে গানের সঙ্গে তারা একটি মন্ত্রও উচ্চারণ করে, সেটি হল, “আদর আয়ে দিলথার যায়ে”। পাঞ্জাবী ভাষায় এর অর্থ “সম্মান আসুক এবং দারিদ্র্য দূর হয়ে যাক”।

পাঞ্জাব প্রদেশের কোন কোন জায়গায় এইদিন কাদা-মাটি বা গোবর দিয়ে ‘লোহরি’ দেবীর ছোট্ট মূর্তি তৈরি করা হয়। তারপর আগুনে সেই মূর্তিটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। পাঞ্জাবীরা বিশ্বাস করে, এতে সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটে। এই আগুনে আখের টুকরো, মিষ্টি, চিনাবাদাম এবং চিঁড়ে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। মনে করা হয় এই সব খাবারগুলি আগুনের দেবতা বা অগ্নিদেবকে উৎসর্গ করা হল। পোড়া খাবারের অবশিষ্ট অংশ লোহরির প্রসাদ হিসেবে সবাই গ্রহণ করে।

বিবাহিতা নারীরা তাদের বিয়ের পর প্রথম লোহরি উৎসব বড় করে পালন করে। তাদের বাবার বাড়ির সদস্যদের শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ করা হয়। বাড়ির বউরা এদিন বিয়ের কনের মত গয়না সহঐতিহ্যপূর্ণ সাজপোশাক পরে ও হাতে মেহেন্দি দিয়ে নকশা আঁকে এবং চন্দনের প্রলেপ ও অন্যান্য সুগন্ধি ব্যবহার করে। তারপর স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে আগুনের ধারে উৎসবের কেন্দ্রস্থলে এসে বসে। আত্মীয়রা সবাই একে একে এসে তাদের আশীর্বাদ করে ও নতুন পোশাক, গয়না ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের উপহার দেয়। বাড়িতে নতুন শিশুর জন্ম হলেও এই উদ্দীপনা দেখা যায়। বাড়ির বড়রা সবাই শিশুটিকে ও তার বাবা-মাকে আশীর্বাদ করে ও বিভিন্ন উপহার দেয়।

লোহরির অগ্ন্যুৎসব সমস্ত প্রাচীন চিন্তাভাবনা ও ধ্যানধারণাকে ত্যাগ করে নতুনকে গ্রহণ করার আহ্বান জানায়। হিন্দুধর্ম অনুযায়ী, উষ্ণতার দুটি উৎস আগুন ও সূর্যদেব মানুষের জীবনে অতি পবিত্র ও প্রয়োজনীয় শক্তি। তাই ‘লোহরি উৎসব’ পালন করে মানুষ অগ্নিদেব ও সূর্যদেবকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন