ধর্ম

অর্জুনের পুত্র ইরাবান

তৃতীয় পাণ্ডব  অর্জুন এবং নাগকন্যা উলূপীর সন্তান ছিলেন ইরাবান। মতান্তরে আরাবন নামেও উল্লেখ করা হয় তাঁকে। তিনি পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে যোগ দেন এবং যুদ্ধের অষ্টম দিনে মারা যান। তামিলদের মহাভারতের অনুবাদ অনুযায়ী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় সুনিশ্চিত করতে নিজেকে উত্‍সর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন ইরাবান।

অর্জুনের বারো বছর বনবাসকালে একদিন স্নানের সময় তাঁকে দেখে মুগ্ধ উলূপী তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। প্রথমে রাজি না থাকলেও পরে উলূপীর কথায় ও যুক্তিতে রাজি হয়ে যান অর্জুন। তাদের দুজনের যে পুত্র জন্মায় সেই হল ইরাবান। ইরাবান তাঁর মায়ের কাছে নাগলোকে থেকেই মানুষ হন। পিতার সাহচর্য তাঁর পাওয়া হয়নি।

মহাভারতের সংস্কৃত অনুবাদ অনুযায়ী পরবর্তীকালে অর্জুন আর ইরাবানের দেখা হয়েছিল। অর্জুন যখন সুরলোকে অস্ত্রশিক্ষা করছিলেন, তখন ইরাবান তাঁর কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। অর্জুন তাঁকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের সাহায্য করার কথা বলেছিলেন। পিতাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী ইরাবান যুদ্ধের সময় উপস্থিত হন এবং পাণ্ডবদের হয়ে যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধের সময় শকুনির ছয় ভাই গজ, গবাক্ষ, বৃষক, চর্মবান, আর্জক এবং শুক  তাঁকে ঘিরে ধরেন। ইরাবানের সৈন্যরা গান্ধারসৈন্য ধ্বংস করতে করতে এগিয়ে চলে। এবং ইরাবানও শকুনির ছয় ভাইকে বধ করেন। ক্রুদ্ধ দুর্যোধন অলম্বুষ রাক্ষসকে নির্দেশ দেন যেন শীঘ্রই সে (অলম্বুষ ) ইরাবানকে হত্যা করে। অলম্বুষ হামলা করে ইরাবানের ওপর। দুজনের মধ্যে শুরু হয় মায়াযুদ্ধ। ইরাবান বিশাল সাপের মূর্তি ধারণ করলে অলম্বুষ গরুড়ের রূপ ধারণ করে। ইরাবান অলম্বুষের মায়ায় মোহগ্রস্ত হতেই অলম্বুষ তাঁকে হত্যা করে।

মহাভারতের তামিল অনুবাদে কালাপ্পালি নামে এক প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই প্রথা অনুসারে যুদ্ধে যদি কোনও বীরপুরুষ দেবী কালীর সামনে নিজেকে উৎসর্গ করেন, তো যুদ্ধে সেই পক্ষের জয় অবশ্যম্ভাবী। ইরাবান নিজেকে পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যুদ্ধের আগে পাণ্ডবদের জয়ের জন্য তিনি নিজেকে বলি দেন। তবে তার আগে শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে ইরাবান ৩টি বর লাভ করেন। একটি হল যুদ্ধে বীরের মৃত্যু বরণ করা, দ্বিতীয়টি হল ১৮ দিনের যুদ্ধ পুরোটা দেখার সৌভাগ্য লাভ করা এবং তৃতীয়টি হল মৃত্যুর পর তাঁকে যেন দাহ করা হয়। কিন্তু সেই সময়ের রীতি অনুযায়ী অবিবাহিতদের মৃত্যুর পর দাহ না করে কবর দেওয়া হত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত ইরাবান ছিলেন অবিবাহিত। যুদ্ধে তিনি নিজেকে দেবী কালীর কাছে উত্‍সর্গ করবেন, এটা জানার পর কোনও নারী তাঁকে বিয়ে করতে চাইছিলেন না। তাই শ্রীকৃষ্ণ নারী শরীর ধারণ করে মোহিনী নাম নিয়ে তাঁকে বিয়ে করেন এবং মৃত্য়ুর আগে তাঁরা এক রাত একসঙ্গে কাটান। আরাবনের মৃত্যুর পর নারীরূপী শ্রীকৃষ্ণ বৈধব্য বেশ ধারণ করে শোক পালন করেন। পরের দিন তিনি আবার নিজের আসল চেহারায় ফিরে আসেন।  তামিলনাড়ুতে ইরাবনের পুজো হয় এবং তাঁকে ঘিরে বড় উৎসব পালিত হয়।

তথ্যসূত্র


  1. "মহাভারত সারানুবাদ", দেবালয় লাইব্রেরী (প্রকাশক সৌরভ দে, তৃতীয় প্রকাশ) - রাজশেখর বসু, ভীষ্মপর্ব (১৪। ইরাবানের মৃত্যু  পৃষ্ঠাঃ ৩৬১-৩৬২)
  2. https://eisamay.indiatimes.com/daily-horoscope/horoscope-special/this-unnoticed-transgender-from-maharabharat-was-arjunas-son/
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Iravan
  4. https://www.templepurohit.com/sacrifice-iravan-mahabharata/

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!