ইতিহাস

ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল গণ পরিষদের হাতে। ১৯৫০ সালে দেশের সংবিধান প্রবর্তনের পর ১৯৫১ সালে তৈরি হয় জন প্রতিনিধিত্ব আইন। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের পরামর্শে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব সুকুমার সেনকে সদ্য গঠিত ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার প্রস্তাব দেন। ভারতের নির্বাচন কমিশন হল একটি স্বশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা যেটি ভারতের সকল নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। ব্যালটের মাধ্যমে ২১ বছর বয়স হলেই (বর্তমানে ১৮ বছর) ভোটাধিকার প্রয়োগ করে কেন্দ্রে ও রাজ্যে জন প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ এল আমজনতার হাতে। ১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর শুরু হয়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন (first Indian general election) অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৫১ সালের ১ জুলাই রাজনৈতিক দলগুলিকে নিয়ে দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন একটি সভা ডাকেন। নির্বাচনী প্রতীক ছিল এই সভায় আলোচনার মুখ্য বিষয়। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সুকুমার সেনের কাছে ছিল যথেষ্ট কঠিন একটি কাজ। কারণ ১৯৫১ সালে ভারতের ১৭.৬ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ ছিলেন নিরক্ষর। এই নিরক্ষর মানুষদের ভোট প্রদানের সুবিধার্থে প্রার্থীর নামের পাশে প্রতীক চিহ্ন ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশন ভাবতে শুরু করে যাতে তাঁদের পরিচিত প্রতীক দেখে তাঁরা কোন দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় সে বিষয়ে জ্ঞাত থাকে। তাই প্রতিটি দলকে বলা হয়েছিল তাদের নিজেদের পছন্দমতো প্রতীক নিয়ে সভায় আসতে। প্রস্তাবিত প্রতীক প্রথমে জমা নেওয়া হবে এবং তারপর স্থির করা হবে কাকে কোন প্রতীক দেওয়া যায়। কিন্তু সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দলগুলি প্রবল বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে কারণ প্রায় সিংহভাগ দলেরই পছন্দের প্রতীক ছিল লাঙল। যেহেতু সকল দলের একই প্রতীক হতে পারেনা তাই সুকুমার সেন ঠিক করলেন কাউকেই লাঙল চিহ্ন দেওয়া হবে না। এই সমস্যা সমাধানে প্রত্যেক দলকে তাদের দ্বিতীয় পছন্দের প্রতীক জমা দিতে বলা হল। আর সেইমতোই অবশেষে কংগ্রেস পেল দু’টি বলদ, সোস্যালিস্ট পার্টি পেল গাছ, হিন্দু মহাসভাকে দেওয়া হল ঘোড়ায় চড়া এক সওয়ারি, বি আর আম্বেদকেরর শিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন পার্টি প্রতীক পেল হাতি। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া নিয়েছিল কাস্তে ধানের শিষ। ভারতীয় জনসঙ্ঘ পরবর্তী সময়ে পায় প্রদীপ। ফরওয়ার্ড ব্লক (মার্কসিস্ট) পায় সিংহ। রাম রাজ্য পরিষদ পার্টির প্রতীক ছিল উদীয়মান সূর্য, রেভলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টি প্রতীক পেল মশাল, বলশেভিস্ট পার্টির পেল তারা।

ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচনী প্রতীকগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য প্রতীক ছিল একটি হাত। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক ‘হাত’ চিহ্নটি প্রথম লোকসভা নির্বাচনে ব্যবহার করেছিল ফরওয়ার্ড ব্লকের ভেঙে যাওয়া পৃথক গোষ্ঠীর একটি পার্টি। প্রথম নির্বাচনে এই পার্টি উল্লেখযোগ্য ফলাফল করতে না পারায় নির্বাচনের পর সেই দল প্রজা সোশ্যালিস্ট পার্টির সাথে মিশে যায় এবং ‘হাত’ চিহ্নটিও ক্রমে লুপ্ত হয়ে যায়। অনেক পরে ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে এই হাত চিহ্ন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে গন্য হয়। ভারতের প্রথম নির্বাচনএই নির্বাচনে নির্বাচনী প্রতীকগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য প্রতীক ছিল একটি হাত। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক ‘হাত’ চিহ্নটি প্রথম লোকসভা নির্বাচনে ব্যবহার করেছিল ফরওয়ার্ড ব্লকের ভেঙে যাওয়া পৃথক গোষ্ঠীর একটি পার্টি। প্রথম নির্বাচনে এই পার্টি উল্লেখযোগ্য ফলাফল করতে না পারায় নির্বাচনের পর সেই দল প্রজা সোশ্যালিস্ট পার্টির সাথে মিশে যায় এবং ‘হাত’ চিহ্নটিও ক্রমে লুপ্ত হয়ে যায়। অনেক পরে ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে এই হাত চিহ্ন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে গন্য হয়।

প্রথম সাধারণ নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার নির্বাচনী প্রচার শোনা যেত মস্কো রেডিওতে। কারণ, রাশিয়ার ধারণা হয়েছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকার দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। ফলত তাসখন্দের রেডিও স্টেশন থেকে মস্কো রেডিও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রচারে নেমেছিল।

প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মোট ৫৩ টি দলের ৫৩৩ জন প্রার্থী ৪৮৯টি লোকসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। লোকসভার সাথে চার হাজার বিধানসভা আসনেও নির্বাচন হয়। সব মিলিয়ে ২০ লক্ষ ব্যালট বক্স তৈরি হয়। ভোটার তালিকা তৈরি আর টাইপ করার জন্য ১,৬৫,০০জন্য ক্লার্ক নিয়োগ করা হয়ছিল। ৫৬ হাজার প্রিসাইডিং অফিসার, ২ লক্ষ ৮০ হাজার সহায়ক, প্রায় আড়াই লক্ষ পুলিশকর্মী এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

প্রথম সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচনটি ৬৮টি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। মোট ১৯৬০৮৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৭৫২৭টি বুথ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। হিমাচল প্রদেশ এবং জম্মু ও কাশ্মীর বাদে সমস্ত রাজ্য ১৯৫১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের মার্চের মধ্যে ভোট দিয়েছিল। ১৯৬৭ সালের আগে কাশ্মীরে লোকসভা আসনের জন্য কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রবল ঠাণ্ডা এবং যাতায়াতের দুর্গমতার কারণে সকল রাজ্যের থেকে প্রায় পাঁচ মাস আগে অক্টোবরে হিমাচল প্রদেশের চিনি তহসিলে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হয়েছিল। স্বাধীন ভারতে প্রথম ভোটটি দিয়েছিলেন শ্যামশরন নেগি।

প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ৪৮৯টি আসনের মধ্যে ৩৬৪টি আসন লাভ করে সরকার গঠন করে এবং পন্ডিত জওহরলাল নেহরু দেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। মোট ভোটারের ৪৫.৭% ভোটার ভোট দিয়েছিলেন।

বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা তৎকালীন কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্র (বর্তমানে কলকাতা উত্তর লোকসভা কেন্দ্র) থেকে দাঁড়িয়ে বাম সমর্থিত নির্দল প্রার্থী (বেলচা-কোদাল ছিল তাঁর প্রতীক)হিসেবে নির্বাচিত সাংসদ হন। তিনিই স্বাধীন ভারতের প্রথম বিজ্ঞানী যিনি রাজনীতিতে যোগদান করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বেশ কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি ধরা পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু কোনও দল বা নেতা সুকুমার সেনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ কিংবা অভিযোগ পেলেও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে কেউ অভিযোগ তোলেননি৷ এমনকি ওই সময় যারা ব্যালটের মাধ্যমে ভোট করার কথা শুনে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করেছিলেন তারাও স্বীকার করেছিলেন সেই সময় ভারতের গণতন্ত্রে সূচনাটা সফলই বলা চলে৷

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন