নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা

নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা

ভারতে বহু সময় ধরেই দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধর্ষণের পরিসংখ্যান সূচক অনেকটাই উপরের দিকে রয়েছে। ফলে ভারতে ধর্ষণের মামলাও রুজু হয় অনেক, বেশিরভাগ খবরই চাপা থাকে নিত্যদিনের রোজনামচার ফাঁকে। কিন্তু ২০১২ সালে এরকমই এক ধর্ষণের মামলা গোটা ভারতের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ‘দ্য ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো’-র পরিসংখ্যানে সেই ২০১২ সালেই দিল্লির বুকে প্রায় ৭০৬টি ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে জানা যায়। ২০১২ সালে দিল্লির রাস্তায় ঘটে যাওয়া গণধর্ষণ এবং খুনের সেই ন্যক্কারজনক ঘটনার নাম ‘নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা’। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী ‘ফৌজদারি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০১৩’ নামে পূর্বেকার আইনের ধারায় অনেকগুলি সংশোধনী আনেন।

২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আলতামাস কবীর কর্তৃক সাকেত আদালতে গঠিত ধর্ষণ সংক্রান্ত প্রথম ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা শুরু হয়। মামলার প্রধান পাঁচজন অভিযুক্ত ছিলেন বাসচালক রাম সিংহ, তাঁর ভাই মুকেশ সিংহ, বিনয় শর্মা, পবন গুপ্ত এবং অক্ষয় ঠাকুর। এছাড়াও এই মামলায় জড়িত ছিল আরও এক নাবালক যার নাম মহম্মদ আফরোজ। ২০২০ সালের ২০ মার্চ চার প্রধান অভিযুক্ত মুকেশ সিংহ, বিনয় শর্মা, পবন গুপ্ত এবং অক্ষয় ঠাকুরের ফাঁসির মধ্য দিয়ে এই মামলার সমাপ্তি ঘটে। এই ঘটনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় ধর্ষিতা তরুণীর আসল নাম প্রকাশের বদলে তাঁকে ‘নির্ভয়া’ নামেই চিহ্নিত করা হয়।

২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে দক্ষিণ দিল্লির সাকেতে পিভিআর সিলেক্ট সিটি ওয়াক (PVR Select City Walk) নামের একটি প্রেক্ষাগৃহ থেকে ‘লাইফ অফ পাই’ নামের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একটি ছবি দেখে বেরোচ্ছিলেন ২২ বছর বয়সী এক তরুণী নির্ভয়া এবং তাঁর এক পুরুষ বন্ধু। রাত সাড়ে নয়টা নাগাদ দ্বারকার উদ্দেশ্যে তাঁরা মুনিরকা থেকে একটি বাসে ওঠেন। বাসে চালকসহ আরও ছয়জন উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন নাবালক পুরুষও ছিলেন। কিছুক্ষণ পরেই বাসটি তাঁর গন্তব্যের দিক থেকে রাস্তা বদলে অন্য রাস্তায় যেতে শুরু করে এবং বাসের দরজা বন্ধ করে দেয় বাসের অন্য পুরুষ যাত্রীরা। নির্ভয়ার পুরুষ বন্ধুটি বেগতিক বুঝে প্রতিবাদ করে। এই সময় বাসের অন্য ছয়জন পুরুষ যাত্রীর সঙ্গে তার হাতাহাতি হয়, ঐ যাত্রীরা তাকে লোহার রড দিয়ে মেরে অচেতন করে ফেলে। এর পরেই বাসের পিছনে গিয়ে নির্ভয়াকে তারা লোহার রড দিয়ে আঘাত করে এবং একে একে ছয়জনই তাঁকে ধর্ষণ করে। পরে একটি মেডিকেল রিপোর্টে জানা যায়, ধর্ষণের সময় অন্ত্র, উদর এবং যৌনাঙ্গে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন সেই তরুণী এবং এও বলা হয় যে একটি ভোঁতা লোহার রড জাতীয় কিছু তাঁর যৌনাঙ্গে ঢোকানো হয়েছিল। পরে পুলিশ বাস থেকে এইরকমই একটি রড খুঁজেও পায়। পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী নির্ভয়া আত্মরক্ষার জন্য আততায়ীদের গায়ে কামড় বসিয়েছিল যে দাগ আততায়ীদের গ্রেপ্তার হওয়ার সময়েই দেখা গেছে। আততায়ীকে ধর্ষণ এবং তার পুরুষ বন্ধুটিকে অচেতন করে দেওয়ার পরে চলন্ত বাস থেকে তাঁদের ফেলে দেওয়া হয়। আততায়ীদের একজন প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য বাসের ভিতরটা ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলে। রাত এগারোটার দিকে এক পথচারী তাদের দুজনের দেহ রাস্তায় দেখতে পেয়েই দিল্লি পুলিশকে খবর দেয় এবং তৎক্ষণাৎ দিল্লি পুলিশের তৎপরতায় নির্ভয়া এবং সেই পুরুষ বন্ধুটিকে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর সারা শরীরে অসংখ্য কামড়ের চিহ্ন, আঘাতের চিহ্ন এবং ক্ষতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৯০ সালের ১০ মে দিল্লিতে নির্ভয়ার জন্ম হয়েছিল। পরিবারে তিন সন্তানের মধ্যে তিনিই ছিলেন বড় এবং একমাত্র কন্যা। তাঁর বাবা-মায়েরা যদিও আগে উত্তরপ্রদেশের বালিয়া জেলায় থাকতেন। নির্ভয়ার পড়াশোনা চালানোর জন্য তাঁর বাবা পৈতৃক জমি বিক্রি করে ডবল শিফটে কাজ করে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করতেন। প্রাথমিকভাবে গণমাধ্যমে তাঁর আসল নাম প্রকাশ করা হয়নি, বরং তার বদলে জাগ্রুতি, জ্যোতি, আমানত, নির্ভয়া ইত্যাদি ছদ্মনামেই তাঁর পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে তাঁর পুরুষ বন্ধুটি পেশায় উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। এই ঘটনায় তিনি গুরুতর জখম হলেও বেঁচে গিয়েছিলেন। ‘মেইল টুডে’ নামের একটি দিল্লি-কেন্দ্রিক ট্যাবলয়েডে নির্ভয়ার আসল পরিচয় প্রকাশ করে দেওয়ায় দিল্লি পুলিশ সেই ট্যাবলয়েডের সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে দেয়, কারণ ভারতীয় দণ্ডবিধির ২২৮ (এ) ধারা অনুসারে এই ধরনের তথ্য প্রকাশ আইনত অপরাধ। তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শশী থারুর বলেছিলেন যে তাঁর বাবা-মায়ের অনুমতিসাপেক্ষে তাঁর পরিচয় প্রকাশ করা যেতে পারে। দিল্লির রাস্তায় ঐ ঘটনার দু দিন পরেই বাসচালক রাম সিংহ, তার ভাই মুকেশ সিংহ, বিনয় শর্মা ও পবন গুপ্ত গ্রেপ্তার হন এবং ঘটনার ৫ দিন পরে দিল্লির আনন্দবিহার বাস টার্মিনাস থেকে গ্রেপ্তার হয় নাবালক মহম্মদ আফরোজ। পরে ৬ ডিসেম্বর বিহারের আওরঙ্গাবাদ থেকে গ্রেপ্তার হন অক্ষয় ঠাকুর নামে আরেক অভিযুক্ত। ইতিমধ্যে সফদরজং হাসপাতালে নির্ভয়ার অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশ জুড়ে শুরু হয় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ এবং জমায়েত। সংসদের স্বরাষ্ট্র বিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে দিল্লির উচ্চ আদালত বর্মা কমিটির সুপারিশ মেনে পাঁচটি ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠনের নির্দেশ দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালেই মারা যান নির্ভয়া। এরপরে ২০১৩ সালে কেন্দ্র সরকার নারী সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নে তাঁর নামে তৈরি করেন ‘নির্ভয়া ফাণ্ড’ যেখানে সরকারের তরফে দেওয়া হয় ১০০০ কোটি টাকা। সেই সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর বদান্যতায় পাশ হয় ‘ফৌজদারি আইন অধ্যাদেশ’ (Criminal Law Ordinance) এবং মার্কিন বিদেশ দপ্তর সাহসিকতার জন্য নির্ভয়াকে মরণোত্তর ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অফ কারেজ’ পুরস্কারে ভূষিত করে।

২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আলতামাস কবীর সাকেত আদালতে গঠন করেন ভারতের ধর্ষণ সংক্রান্ত প্রথম ফাস্ট ট্র্যাক আদালত এবং ৩ জানুয়ারি পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, খুন, অপহরণ, প্রমাণ লোপাট সহ নির্ভয়ার পুরুষ বন্ধুটিকে হত্যার চেষ্টার বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করা হয় আদালতে। ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা শুরু হয় ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে। বিচার চলাকালীনই তিহার জেলে আত্মহত্যা করেন অভিযুক্ত রাম সিংহ। ঐ বছরই ৩১ আগস্ট নাবালক মহম্মদ আফরোজ এই মামলার অভিযুক্ত হিসেবে প্রথম দোষী সাব্যস্ত হন। কিন্তু তিনি নাবালক হওয়ার কারণে জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডে তাঁর বিচার চলে এবং বিচারে তাঁর তিন বছরের সাজা হিসেবে হোমে পাঠানো হয় তাঁকে। ঐ বছরই ১৩ সেপ্টেম্বর বাকি চারজন অভিযুক্তও দোষী প্রমাণিত হয়, বিচারপতি যোগেশ খান্না তাঁদের সকলের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। কিন্তু সেই চারজনই আদালতের রায়ের বিরোধিতা করে দিল্লি উচ্চ আদালতে সাজা কমানোর আর্জি জানায়। ২০১৪ সালের ১৩ মার্চ দিল্লি উচ্চ আদালতে বিচারপতি রেভা ক্ষেত্রপাল এবং প্রতিভা রানি নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখলেও ১৫ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট এই মৃত্যুদণ্ডে স্থগিতাদেশ জারি করে। পরের বছর ২০১৫ সালে নাবালক অভিযুক্ত মহম্মদ আফরোজ ছাড়া পান এবং তাঁকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন কিনে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার সুপরামর্শ দেওয়া হয়। ঠিক তার পরেই ২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর রাজ্যসভায় পাশ হওয়া জুভেনাইল জাস্টিস বিলে বলা হয় ১৬ বছরের উর্ধ্বে কোনও কিশোর ধর্ষণের মত অপরাধের জন্য অভিযুক্ত হলে তার বিচার হবে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গেই। ২০১৭ সালের ৫ মে দিল্লি উচ্চ আদালত অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখে এবং সে বছরই আবার অভিযুক্তরা সুপ্রিম কোর্টে রায় পুনর্বিবেচনার দাবি জানায়। ২০১৮ সালে দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারপতির বেঞ্চ ধর্ষক অভিযুক্তদের সাজা পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করেন। এদিকে পরের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে অক্ষয় ঠাকুর পুনরায় মৃত্যুদণ্ড পুনর্বিবেচনার আর্জি জানায় সুপ্রিম কোর্টে এবং শীর্ষ আদালতে এই আর্জির বিরোধিতা করেন নির্ভয়ার মা। ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি পাতিয়ালা হাউস কোর্ট ঘোষণা করে যে ঐ বছরই আগামী ২২ জানুয়ারি সকাল ৭টায় মুকেশ সিংহ, বিনয় শর্মা, পবন গুপ্ত এবং অক্ষয় ঠাকুরকে ফাঁসি দেওয়া হবে। অবশেষে ২০২০ সালের ২০ মার্চ ভোর সাড়ে ৫টায় এই চার অভিযুক্তের ফাঁসির মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা এই মামলা ভারতের ইতিহাসে এক নজির গড়েছিল।          

One comment

আপনার মতামত জানান