ইতিহাস

সুকুমার সেন

সুকুমার সেন (Sukumar Sen) একজন আই.এ.এস (IAS) অফিসার এবং বিশিষ্ট গণিতবিদ যিনি ভারতের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ভারতের প্রথম দুটি নির্বাচন আয়োজন করা হয়। এর পাশাপাশি তিনি সুদানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৮৯৮ সালের (মতান্তরে ১৮৯৯) ২ জানুয়ারি এক বাঙালি বৈদ্য ব্রাহ্মণ পরিবারে  সুকুমার সেনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা অক্ষয়চন্দ্র সেন ছিলেন একজন আইসিএস (ICS)। তাঁর এক ভাই অশোককুমার সেন একজন প্রখ্যাত ব্যারিস্টার ও ভারতের আইন মন্ত্রী এবং তাঁর আরেক ভাই অমিয়কুমার সেন একজন চিকিৎসক ছিলেন, যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও চিকিৎসা করেন। 

সুকুমার সেনের ছোটবেলা বর্ধমান জেলায় কাটে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলে। স্কুল শিক্ষা শেষ করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে পড়াশোনা করেন। ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে তাকে গণিত বিদ্যায় পারদর্শীতার জন্য স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।

১৯২১ সালে  মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল  সার্ভেন্ট (Indian Civil Servant) হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৪৭ সালের  মধ্যে তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্রের শীর্ষ স্থানে পৌঁছে যান। প্রথমে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলায় কাজ করে পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিবের পদে যোগ দেন। উনিশ বছর ধরে তিনি ডিস্ট্রিক্ট (district) এবং সেশন জাজ (session judge) ছিলেন। তিনি তাঁর কাজে খুবই দক্ষ ছিলেন। তাঁর কর্মদক্ষতার কথা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কানে গিয়ে পৌঁছালে তিনি বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়কে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করার জন্য একজন সৎ আই.এ.এস অফিসার চেয়ে চিঠি লেখেন। বিধান রায় সুকুমার সেনকে সেই দায়িত্ব নেওয়ার কথা বললে উনি রাজী হন। জওহরলাল নেহরু সুকুমার সেনকে ভারতের প্রথম নির্বাচন পরিচালনা করতে এরপর দিল্লী ডেকে পাঠান। ভারত স্বাধীন হওয়ার দুই বছর বাদে প্রথম নির্বাচন কমিশন তৈরি হয়।

স্বাধীন ভারতে প্রথম নির্বাচন আয়োজন করা খুবই কঠিন কাজ ছিল। ভোটার তালিকা তৈরি করতে এবং আরো অন্যান্য কাজের জন্য প্রচুর কর্মী নিয়োগ করতে হয়। এই নির্বাচনে ১৭ কোটি ৬০ লক্ষ ভারতীয় ভোট দেন। ৪৫০০ টি আসনে ভোট হয়েছিল। ২২৪০০০ টি ভোটদান কেন্দ্র তৈরি করা হয় এবং ৫৬০০০ প্রিসাইডিং অফিসার (presiding officer) ও ২৮০০০০ জন সহায়ক কর্মীর ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়াও কুড়ি লক্ষ ব্যালট বক্স তৈরি করা হয়েছিল এই নির্বাচন উপলক্ষে। সুকুমার সেন বুঝেছিলেন প্রথম নির্বাচনের আয়োজন করা খুবই কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ কাজ তাই তিনি জওহরলাল নেহেরুর থেকে বেশ কিছুটা সময় চেয়ে নেন। তারপর সব ঠিক হলে ১৯৫১ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অব্দি প্রায় তিন মাস ধরে ভারতের প্রথম নির্বাচন পরিচালনা করা হয়। প্রায় ৭৩ দিন ধরে ভোট গ্রহণ চলে।

ভোটার তালিকা তৈরি করার সময় সুকুমার সেনকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ভারতের অনেক মহিলাই ভোটার তালিকা প্রস্তুতের সময়ে নিজের নামের পরিবর্তে নিজের স্বামীর নামে বা সন্তানের নামে পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি সেই সব মহিলাদের প্রথম নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হন। এর ফলে ভারতের  আট কোটি মহিলার মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি মহিলাই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান। এই মহিলাদের মধ্যে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানের মহিলাই বেশি ছিলেন। সুকুমার সেন এরপর ঠিক করেন পরবর্তী নির্বাচনে এই কুসংস্কার ভাঙার চেষ্টা করবেন তিনি। নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি চলাকালীন তিনি প্রতিটি রাজ্যের অন্তত একটি করে পোলিং বুথে (polling booth) যান এবং সব বিষয়ে খুঁটিনাটি দেখাশোনা করেন। আকাশবাণী এবং বিভিন্ন তথ্যচিত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নির্বাচন সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করেন তিনি। যেহেতু তখন ভারতের সত্তর শতাংশ মানুষই পড়তে বা লিখতে পারত না সেই কারণে নির্বাচনের সময় প্রতিনিধি দলগুলির পরিচয়য়ের জন্য প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম নির্বাচন সফল ভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর তুরস্ক থেকে একজন সাংবাদিক ও সেই দেশের প্রতিনিধি দল সুকুমার সেনের সাথে দেখা করেন এবং তাঁর থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে ভালোভাবে অবহিত হন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম সুষ্ঠুভাবে স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য সুকুমার সেনকে অভিনন্দন জানায়।

ভারতের যখন প্রথম নির্বাচন হয় সেইসময় সুদানের নির্বাচন আসন্ন ছিল। সুদানের সরকার জওহরলাল  নেহেরুর কাছে সুকুমার সেনকে সেখানে কিছু মাসের জন্য পাঠানোর আর্জি জানায়।  সেই আর্জিতে সাড়া দিয়ে সুকুমার সেনকে সুদানে গিয়ে সেখানকার নির্বাচন পরিচালনা করার দায়িত্ব নিতে হয়। আন্তর্জাতিক  নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি  ১৯৫৩ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সুদানের নির্বাচন পরিচালনা করেন। তিনিই ছিলেন সুদানের প্রথম নির্বাচন কমিশনার। 

১৯৫৭ সালে  ভারতে দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাচন হয়। এটিও সুকুমার সেন পরিচালনা করেন। দুবারই শাসক দল বা বিরোধী দল কেউই নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেনি। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসাবে নির্বাচিত হন। তিনি পশ্চিমবঙ্গে হওয়া দণ্ডকারণ্য প্রকল্পের সাথেও যুক্ত ছিলেন। সুকুমার সেনের সাথে গৌরী সেনের বিবাহ হয়। তাঁদের চার সন্তান ।

তাঁর অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ১৯৫৪ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত করে। সুকুমার সেনের ১৯৬৩ সালের ১৩ মে মৃত্যু হয়। বর্ধমানে যে রাস্তাটি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড থেকে গোলাপবাগে যায় সেই রাস্তাটি তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া সুদানের একটি রাস্তাও তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়। 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন