বর্তমান দুনিয়ায় পণ্য এবং পরিষেবার প্রচারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন কেবল ক্রেতাদের কাছে পণ্য বা পরিষেবার বিবরণ পেশ করে না, এটি তাদের মানসিকতাকেও প্রভাবিত করে এবং ক্রয় সিদ্ধান্তে উৎসাহ দেয়। সঠিক পরিকল্পনা ও উপস্থাপনার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধি করতে সহায়ক হয় এবং একটি ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিশ্চিত করতে পারে। তাই যথাযথভাবে পণ্য ও পরিষেবা সম্বন্ধে ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে প্রচার করে তাদের আকৃষ্ট করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে সফলতার সাথে ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার পিছনে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গোটা বিশ্বে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলির গুরুত্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিজ্ঞাপন জগতে গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে যে বাঙালি বিজ্ঞাপনী সংস্থা অন্যান্য বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে তার নাম কারুকৃৎ (Karukrit)। আর কারুকৃৎ সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন বাংলার বিজ্ঞাপনী জগতের পথিকৃৎ বীর বিপ্লবী দেশপ্রেমিকদের মধ্যে অন্যতম হেমন্ত কুমার সাহা (Hemant Kumar Saha) যিনি একইসাথে সৃজনশীল মানসিকতারও মানুষ ছিলেন।
১৯১২ সালের ২৯ নভেম্বর হেমন্ত কুমার সাহার জন্ম হয়। মাত্র আঠারো বছর বয়সে ১৯৩০ (মতান্তরে ১৯৩২) সালের মাঝামাঝি সময়ে হেমন্ত কুমার সাহা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর বিজ্ঞাপনী সংস্থা কারুকৃৎ। এই সংস্থাটিই হল কোন বাঙালি ব্যবসায়ী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা উদ্যোগ। কারুকৃৎ এই নামটি পাওয়া যায় পরশুরাম ছদ্মনামে পরিচিত কালজয়ী লেখক রাজশেখর বসুর লেখায়।
এই কারুকৃতের হাত ধরেই বাংলার বিজ্ঞাপনী জগতে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। বই, পত্রিকা ইত্যাদির বাইরে বেরিয়ে এসে ঘরের বাইরের প্রথম বিজ্ঞাপন প্রত্যক্ষ করে কলকাতা উনিশশো ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। কলকাতা শহরের প্রথম হোর্ডিংটি দেখা যায় ১০, চৌরঙ্গী রোডে যেটি তৈরি করেছিল কারুকৃৎ। সেই বিজ্ঞাপনী হোর্ডিংটির মাপ ছিল ১৬x৮ ফিট। অল্প সময়ের মধ্যেই শ্যামবাজার, চিৎপুর, শোভাবাজার এবং যশোর রোডের মত জনবহুল জায়গাগুলিতে বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল হোর্ডিং লাগানো হয়েছিল যা অতি সহজেই জনসাধারণকে আকৃষ্ট করেছিল।
হেমন্ত কুমার সাহা এই বিজ্ঞাপনী সংস্থা কারুকৃৎ -এর পাশাপাশি একটি স্টুডিও তৈরি করেছিলেন, যেখানে বিভিন্ন ধরনের সুন্দর এবং সৃজনশীল কাজ করা হত। এগুলির মধ্যে কয়েকটি হল, বিভিন্ন ধরনের সুন্দর ছবি আঁকা এবং সেইগুলির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা, নিত্যনতুন এবং অনন্য ডিজাইন ও স্টেজ তৈরি করা ইত্যাদি। সেই সময়ে, সোনালী ফয়েলে মোড়া কাঠের লেখায় (wooden typography wrapped in golden foil) কারুকৃৎ বিশেষ সুনাম এবং খ্যাতি অর্জন করেছিল।
অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব কারুকৃৎ -এর এই স্টুডিওতে কাজ করেছিলেন এবং সময়ে সময়ে তাঁরা হেমন্ত কুমার সাহার পরামর্শও নিতেন। বাংলা ও বাঙালি প্রাচীনকাল থেকেই তাঁদের প্রজ্ঞা এবং কৃষ্টির ছাপ রেখে চলেছে ভারতবর্ষ এবং সমগ্র বিশ্বে। একাধারে কালজয়ী লেখক, চিত্রনাট্যকার, স্বনামধন্য পরিচালক প্রভৃতি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন সত্যজিত রায়, ইনি কারুকৃৎ -এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অস্কার পুরষ্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ -র বিজ্ঞাপন করেছিল কারুকৃৎ। এছাড়াও বিখ্যাত কার্টুন শিল্পী কাফি খান, চিত্রশিল্পী যামিনী রায় এনারাও বাঙালীর প্রথম বিজ্ঞাপনী সংস্থার সাথে যুক্ত থেকে নিজেদের অবদান রেখেছেন। সেই সময়ে জনপ্রিয় দুই দৈনিক সংবাদপত্র যুগান্তর ও অমৃতবাজার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষ এবং সুকমল ঘোষ, ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অর্ধেন্দু কুমার গাঙ্গুলী (O.C. Ganguly), একাধারে লেখক, অঙ্কনশিল্পী ও চিত্রনির্মাতা পূর্ণেন্দু পাত্র (Purnendu Pattrea), শিল্পী রণেন দত্ত, চিত্রনির্মাতা অরুপ গুহঠাকুরতা, লেখক এবং অঙ্কনশিল্পী ধীরেন বল প্রমুখের মত আরও অনেক স্বনামধন্য প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব কারুকৃৎ -এর সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজেদের কৃতিত্বের ছাপ স্মরণীয়ভাবে রেখে গেছেন।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতালাভের পরবর্তীকালে, হেমন্ত কুমার সাহা কারুকৃৎ -এর অফিস চৌরঙ্গী রোড থেকে সরিয়ে নিয়ে যান বাগবাজার এলাকার ১৩এ, মদনমোহনতলা স্ট্রীটে। হেমন্ত কুমার সাহার উদ্দেশ্য ছিল খুবই সাধারণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ – সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ যাতে বিজ্ঞাপনের ক্ষমতাকে সফলভাবে কাজে লাগাতে পারে। ১৯৮০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হেমন্ত কুমার সাহার মৃত্যু হলেও কারুকৃৎ আজও সেই উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে কাজ করে চলেছে।
কারুকৃৎ অনেক সফল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করেছে, যেমন ইম্পিরিয়াল টোবাকো (ITC Ltd.), হিন্দুস্তান লিভার ইত্যাদি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড যেমন কোক, হাচিসন টেলকম, এয়ারটেল (Bharti) প্রভৃতির সাথেও এই সংস্থা সফলভাবে কাজ করেছে। বেশ কিছু সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান যেমন ব্রিটানিয়া, ফিলিপস্, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়া, টিসকো, নেসলে প্রভৃতি এরকমই আরও কিছু সংস্থা যাদের বিপণনের কাজ কারুকৃৎ করেছিল সফলতার সাথে যা থেকে প্রভূত ব্যবসায়িক লাভ হয়েছিল।
গত কয়েক দশক ধরে আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে একাধিক ক্ষেত্রে। বিশ্বায়নের এই যুগে পেপার ওয়ার্ক অনেকটাই কমে গেছে, তার পরিবর্তে ইন্টারনেটের মাধ্যমে হচ্ছে প্রায় সব কাজ ডিজিটাল উপায়ে হচ্ছে। যত সময় এগোচ্ছে, ডিজিটাল দুনিয়াও আরও পরিবর্তিত ও উন্নত হচ্ছে কারণ সেখানেও প্রতিনিয়ত খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে নিত্যনতুন প্রযুক্তির আগমন ঘটছে ধারাবাহিকভাবে। একই সাথে বিভিন্ন ধরনের শিল্পে নতুন নতুন পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় বিবর্তন হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পারিপার্শিক পরিবর্তনকে গ্রহণ করে যেকোন প্রতিষ্ঠানের সময়ের সাথে বিবর্তিত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। কারুকৃৎ তার কাজ করার ক্ষেত্রে এই সমস্ত বিষয়কে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে তার কাজ করার পদ্ধতিতে, যেমন পেন্টিং থেকে কম্পিউটার গ্রাফিক্স,ইউনি পোলস ( uni-poles), রোড গান্ট্রি (road gantry), ট্রাই ভিসন্ (tri-vision), গ্লো সাইন বোর্ডস (glow sign boards), নিয়ন সাইন (neon signs), পোল কিয়স্কস (pole kiosks), মোবাইল ডিসপ্লে ভ্যান (Mobile Display vans), এলইডি ডিসপ্লে বোর্ডস (LED Display Boards) ইত্যাদি।
নয় দশকেরও বেশি সময় ধরে কারুকৃৎ কাজ করে চলেছে আজও এবং সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আরও উন্নত ও পরিণত হয়েছে এবং বিস্তৃত হয়েছে আগের তুলনায়। বাঙালির ব্যবসার গর্ব এই বিজ্ঞাপনী সংস্থা কারুকৃৎ একই সঙ্গে ব্যবসা ও সৃজনশীলতার নিদর্শন হয়ে প্রায় এক শতাব্দী বিজ্ঞাপন জগতে রাজত্ব করে চলেছে।
বাঙালী উদ্যোগপতিদের তালিকায় হেমন্ত কুমার সাহা একটি চির উজ্জ্বল নাম, যিনি বহুমুখী একাধারে প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠা করা বাঙালীর প্রথম বিজ্ঞাপনী সংস্থা কারুকৃৎ সত্যই এক প্রশংসনীয় অনন্য উদ্যোগ। শুরু থেকে বর্তমান সময়েও, কারুকৃৎ যেভাবে নিষ্ঠার সাথে সফল্ভাবে কাজ করে চলেছে তা প্রকৃতই সকলের কাছে অনুপ্রেরণার বিষয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান