ইতিহাস

কাশীপ্রসাদ ঘোষ

কাশীপ্রসাদ ঘোষ

বাংলা সাহিত্যে মধুসূদন দত্তের আগে প্রথম ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করেছিলেন কাশীপ্রসাদ ঘোষ (kashiprasad Ghosh)। মাত্র সতেরো বছর বয়সে পরীক্ষার খাতায় মিলের ‘হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া’ বইয়ের একটি সমালোচনা লিখে এসেছিলেন তিনি যা পরে এশিয়াটিক জার্নালেও প্রকাশিত হয়েছিল। নিধুবাবুর টপ্পা সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা, ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরের অনুবাদ সবই তিনি করে গেছেন সুকৌশলী ইংরেজি ভাষায়। ‘দ্য হিন্দু ফেস্টিভ্যালস’, ‘দ্য শেয়ার অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস’, ‘অন বেঙ্গলি পোয়েট্রি’, ‘অন বেঙ্গলি ওয়ার্কস অ্যাণ্ড রাইটার্স’ ইত্যাদি তাঁর লেখা ইংরেজি ভাষায় বাঙালি সাহিত্যিক ও বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রামাণ্য গ্রন্থ। ১৮৪৫-৪৬ সাল নাগাদ ‘হিন্দু ইন্টেলিজেন্সার’ নামে তিনি একটি ইংরেজি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেছিলেন। কাশীপ্রসাদ ঘোষের লেখা ‘বোটমেন্স সং টু গঙ্গা’ বইয়ের ইংরেজি ভাষাশৈলী সেকালের বাঘা বাঘা ইংরেজদের তাক লাগিয়ে দিতে পেরেছিল। মধুসূদন দত্ত অনেকাংশেই কাশীপ্রসাদ ঘোষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চায় অগ্রণী হয়েছিলেন বলে জানা যায়। ১৮৪০ সালে রিচার্ডসন কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত ‘সিলেকশনস ফ্রম দ্য ব্রিটিশ পোয়েটস’ বইতে টেনিসন, চসার, ডিরোজিওর পাশাপাশি ভারতীয় হিসেবে স্থান পেয়েছিল কাশীপ্রসাদ ঘোষের লেখাও।

১৮০৯ সালের ৫ আগস্ট কলকাতার খিদিরপুরে মাতুলালয়ে কাশীপ্রসাদ ঘোষের জন্ম হয়। তাঁর বাবা শিবপ্রসাদ ঘোষের দুই স্ত্রীয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ স্ত্রীয়ের সন্তান ছিলেন কাশীপ্রসাদ ঘোষ। কাশীপ্রসাদের অন্যান্য ভাইয়েরা হলেন কালীপ্রসাদ, কৈলাসনাথ, তারকনাথ ও শম্ভুনাথ। কাশীপ্রসাদের দাদু রামনারায়ণ বসু সর্বাধিকারীর ঘরেই তাঁর জন্ম হয়েছিল। তাঁদের আদি নিবাস ছিল উত্তর কলকাতার হেদুয়ায়। তাঁর ঠাকুরদাদা তুলসীরাম ঘোষ পেশায় ছিলেন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একজন খাজাঞ্চি। অর্থের অভাব ছিল না তাঁদের সংসারে। অত্যন্ত নিষ্ঠাবান হিন্দু তুলসীরাম হেদুয়ায় এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। বারাণসীতে একটি শিবমন্দির এবং ঢাকায় একটি কালীমন্দির স্থাপন করেছিলেন।


বাংলায় শিখুন ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং ও আরও অনেক কিছু

ইন্টার্নশিপ

আগ্রহী হলে ছবিতে ক্লিক করে ফর্ম জমা করুন 


 

প্রাথমিক স্তরে স্থানীয় পাঠশালায় কাশীপ্রসাদ বাংলা, ইংরেজি ও ফারসি ভাষা শেখেন। সেই সময় ইংরেজি ভাষা শেখার বিশেষ আগ্রহ বা চল ছিল না। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে কাশীপ্রসাদ ১৮২১ সালের ৮ অক্টোবর এই কলেজের সপ্তম শ্রেণিতে অবৈতনিক ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন মূলত ইংরেজি শেখার জন্য। হিন্দু কলেজে ভর্তি করানোর জন্য তাঁর দাদু রামনারায়ণ তিনশো টাকা জমা করিয়েছিলেন কলেজের খাতায়। পড়াশোনায় বিশেষ মন ছিল না তাঁর, তার সঙ্গে ছিল অধিক দুরন্তপনা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেই পড়াশোনায় অমনোযোগী ছাত্র কাশীপ্রসাদ হিন্দু কলেজে একজন সেরা ছাত্র হয়ে ওঠেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যেই সর্বোচ্চ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন কাশীপ্রসাদ। ১৮২৮ সালের ১২ জানুয়ারি এই শ্রেণিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পাশ করেন কাশীপ্রসাদ। এছাড়া প্রতি বছর বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম পুরস্কার লাভ করতেন তিনি। ১৮২৭ সালে কলেজের পরিদর্শক হোরেস হেম্যান উইলসন হিন্দু কলেজে এসে ছাত্রদের ইংরেজিতে কবিতা লিখতে বললে সকল ছাত্রের মধ্যে কেবলমাত্র কাশীপ্রসাদ ঘোষই আস্ত একটা কবিতা ইংরেজিতে লিখে ফেলেন। ফলে এত অল্প বয়সে অসাধারণ একটি ইংরেজি কবিতা লিখে উইলসন সাহেবের স্নেহভাজন হয়েছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে পত্র-পত্রিকায় লেখা শুরু করেন তিনি। সবই ইংরেজি ভাষাতেই লিখতেন কাশীপ্রসাদ। কবিতা, গ্রন্থ-সমালোচনা সব ধরনের লেখায় কৃতিত্বের ছাপ রেখে যান তিনি। তাঁর লেখা প্রথম ইংরেজি কবিতা ‘দ্য ইয়ং পোয়েটস ফার্স্ট অ্যাটেমপ্ট’। এই কবিতাটি কোনো বইতে ছাপা না হলেও, ছাত্রবয়সে লেখা তাঁর আরেকটি কবিতা ‘হোপ’ প্রথম মুদ্রিত কবিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। কলেজে পড়াকালীন পরীক্ষার আগে একটি ইংরেজি বইয়ের সমালোচনা করতে বলা হলে কাশীপ্রসাদ ঘোষ মিলের ‘হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া’র প্রথম চারটি অধ্যায়ের একটি যুক্তিপূর্ণ, সুগভীর মননজাত সমালোচনা লিখেছিলেন। ১৮২৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বড়লাট বাহাদুরের প্রাসাদে পুরস্কার বিতরণের সভায় লর্ড আর্মহার্স্টের সামনে কাশীপ্রসাদের এই প্রবন্ধটি পাঠ করা হয় এবং কাশীপ্রসাদ সভায় উপস্থিত সকলের থেকে প্রভূত প্রশংসা লাভ করেন। ‘গভর্নমেন্ট গেজেট’ পত্রিকা এবং লণ্ডনে প্রকাশিত ‘এশিয়াটিক জার্নাল’-এও এই প্রবন্ধের খানিকটা ছাপা হয়েছিল। এই পুরস্কার বিতরণী সভায় কাশীপ্রসাদ শেক্সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’ নাটকে শাইলকের চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন বলে জানা যায়। কলেজের শিক্ষকদের প্রতি কাশীপ্রসাদের অপার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা জনশ্রুতিতে জানা যায়। তাঁকে ঘিরে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে যে একবার কলেজে যাবার পথে কলেজ বন্ধ শুনে কাশীপ্রসাদ জানতে পারেন কলেজের প্রিন্সিপাল সাহেব বিসূচিকা রোগে আক্রান্ত। অনেক খুঁজে তাঁর বাড়িতে চলে যান কাশীপ্রসাদ এবং সেই দিন ও সেই রাত তাঁর বাড়িতেই থেকে যথাসাধ্য প্রিন্সিপাল সাহেবের সেবাযত্ন করে তাঁকে সুস্থ করে তোলেন কাশীপ্রসাদ। শোনা যায় সেই সময় সাহেবের মল-মূত্রও বিনা দ্বিধায় নিজে হাতে পরিস্কার করেছিলেন তিনি। তারপর কাশীপ্রসাদের এই সেবাকর্মের কথা জানতে পেরে প্রিন্সিপাল সাহেব তাঁকে নিজের পুত্রসম ভালোবাসতে লাগলেন এবং কলেজ পাশ করার পরে বন্ধুবৎ সম্পর্ক রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। চেষ্টা করলে কাশীপ্রসাদ ঘোষ কোনো উচ্চপদে ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকরি করতেই পারতেন, কিন্তু সে পথে না গিয়ে সাহিত্যচর্চা আর দেশসেবায় নিয়োজিত হন তিনি।

‘বেঙ্গল হরকরা’, ‘জন বুল’, ‘লিটারারি গেজেট’, ‘বেঙ্গল অ্যানুয়াল’ প্রভৃতি ইংরেজি সাময়িক পত্রে তাঁর লেখা কবিতা প্রকাশিত হত সেই সময়। কিন্তু এখন আর তার সেই সব লেখা পাওয়া যায় না। ১৮৩৪ সালে মেমোয়ারস অফ ইণ্ডিয়ান ডায়ন্যাস্টি নামে একটি বইতে গোয়ালিয়রের সিন্ধ্রী বংশ, লক্ষ্ণৌয়ের নবাব বংশ, ইন্দোরের হোলকার বংশ, বরোদার গায়কোয়াড় বংশ, ভোপালের নবাব বংশের একটি ইতিহাস রচনা করেছিলেন কাশীপ্রসাদ ঘোষ যা বিদ্বজ্জনের মধ্যে খুবই সমাদৃত হয়েছিল। এই বইয়ের প্রবন্ধগুলি ডি. এল. রিচার্ডসনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘লিটারারি গেজেট’ পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল আগে। এছাড়া রণজিত সিংহ এবং অযোধ্যার নবাবদের নিয়েও ঐতিহাসিক নিবন্ধ লিখেছিলেন কাশীপ্রসাদ। ‘এ ট্রিটিস অন ফ্লাওয়ারস অ্যাণ্ড ফ্লাওয়ার গার্ডেনস’ নামে ডি. এল. রিচার্ডসনের একটি বইয়ের শেষে কাশীপ্রসাদ ঘোষ অনেকগুলি দেশীয় ফুলের তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলেন। ‘দ্য ভিশন’ নামে একটি উপন্যাসও লেখেন কাশীপ্রসাদ। এছাড়া ‘অন বেঙ্গলি পোয়েট্রি’ এবং ‘অন বেঙ্গলি ওয়ার্কস অ্যাণ্ড রাইটার্স’ বইতে নিধুবাবুর টপ্পা সঙ্গীত, ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাব্যের সমালোচনার পাশাপাশি বিদ্যাসুন্দরের একটি ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশ করেন তিনি। ১৮৩০ সালে কাশীপ্রসাদের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য শায়ের অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস’ প্রকাশিত হয়। লর্ড উইলিয়াম বেণ্টিঙ্ককে এই বইটি উৎসর্গ করেছিলেন কাশীপ্রসাদ ঘোষ। এই বইতে রয়েছে ‘শায়ের’, হিন্দু পর্বদিন বা ‘হিন্দু ফেস্টিভ্যালস’ নামের দুটি কাব্য এবং কতগুলি খণ্ড কবিতা। কাশীপ্রসাদ ঘোষের লেখা ‘বোটমেন্স সং টু গঙ্গা’ বইয়ের ইংরেজি ভাষাশৈলী সেকালের বাঘা বাঘা ইংরেজদের তাক লাগিয়ে দিতে পেরেছিল। মধুসূদন দত্ত অনেকাংশেই তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চায় অগ্রণী হয়েছিলেন বলে জানা যায়। ১৮৪০ সালে রিচার্ডসন কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত ‘সিলেকশনস ফ্রম দ্য ব্রিটিশ পোয়েটস’ বইতে টেনিসন, চসার, ডিরোজিওর পাশাপাশি ভারতীয় হিসেবে স্থান পেয়েছিল কাশীপ্রসাদ ঘোষের লেখাও।

১৮৬১ সালে শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদিত ‘মুখার্জীস ম্যাগাজিন’ পত্রিকায় তাঁর কয়েকটি কবিতা প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চাতেই নিবিষ্ট থাকেননি তিনি। বাংলাতেও কয়েকটি গান, দুটি ধর্মসঙ্গীত লিখেছেন কাশীপ্রসাদ। এই গানগুলিকে বাংলা গীতিধারায় লঘু সঙ্গীতের ঘরানায় ফেলা যায়। তাঁর সমস্ত গানগুলি ‘গীতাবলী’ নামে একটি বইতে সঙ্কলিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে কাশীপ্রসাদ ঘোষের চল্লিশ-পঞ্চাশটি লুপ্তপ্রায় গান সংগ্রহ করে ‘প্রীতি-গীতি’ নামে একটি বইতে সংকলন করেছিলেন অবিনাশচন্দ্র ঘোষ।

১৮৪৬ সালের নভেম্বর মাসে কাশীপ্রসাদ ঘোষের সম্পাদনায় হিন্দু ইন্টেলিজেন্সার নামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। ভারতীয়দের সম্পাদিত প্রথম বিশুদ্ধ ইংরেজি সংবাদপত্র ছিল এটিই। এই সংবাদপত্রে কাশীপ্রসাদের কিছু রচনা, কবিতার পাশাপাশি গিরিশচন্দ্র ঘোষ, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং কৃষ্ণদাস পালের লেখা প্রকাশ পেতো। কিন্তু অনেকে কাশীপ্রসাদ ঘোষের রক্ষণশীল মনোভাবের বিরোধিতা করেছিলেন। বেথুনের স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের কর্মসূচি, বহুবিবাহ রদ বা বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের কর্মসূচির বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন কাশীপ্রসাদ ঘোষ। রাধাকান্ত দেবের ধর্মসভার সদস্য ছিলেন তিনি। ১৮৫৭ সালে লর্ড ক্যানিং ‘গ্যাগিং অ্যাক্ট’ পাস করলে কাশীপ্রসাদ এই পত্রিকা প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৮৩৫ সালে ‘ফিশার্স ড্রয়িং রুম স্ক্র্যাপ বুক’ নামের একটি প্রসিদ্ধ ছবির বইতে ইংল্যাণ্ডের বিখ্যাত সাহেবদের সঙ্গে কাশীপ্রসাদ ঘোষের একটি সুন্দর চিত্রিত প্রতিকৃতি ছাপা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই ছবিটি বহু ইংরেজদের বসার ঘরে দেখা যেতো। সেখানে কাশীপ্রসাদকে ‘ইণ্ডিয়ান বার্ড’ বা ‘ভারতের কবি’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

১৮৭৩ সালের ১১ নভেম্বর কাশীপ্রসাদ ঘোষের মৃত্যু হয়।    

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু আজও এক ঘনীভূত রহস্য



সেই রহস্য নিয়ে বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন