বিবিধ

ল্যাকমে ও লক্ষ্মীর সম্পর্ক

কসমেটিক্স ও মেক-আপের দুনিয়ায় ‘ল্যাকমে’ (Lakme) একটি বিখ্যাত নাম। প্রায় সকল ভারতীয় মহিলাই এই ব্র্যাণ্ড সম্পর্কে পরিচিত এবং নিশ্চিতভাবে অনেকেই এই ব্র্যাণ্ডের নিত্য-নতুন প্রোডাক্ট সংগ্রহে রাখতে ভালোবাসেন। সৌন্দর্যই নারীর ভূষণ আর নারীর এই সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে ভারতের স্বাধীনতার পরে একমাত্র জনপ্রিয় ব্র্যাণ্ড হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে ‘ল্যাকমে’। পশ্চিমি দুনিয়ার প্রসাধনী সামগ্রীর বহুল প্রচারের পাশে ‘ল্যাকমে’ একটি স্বদেশি প্রয়াস হয়েও মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল। গুণমানে, বিপণনে এবং ব্র্যাণ্ডভ্যালুতে ল্যাকমে আজও অদ্বিতীয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ল্যাকমের যাত্রাপথ এগিয়েছে। ‘ল্যাকমে’-র নামকরণের ইতিহাস সত্যই আশ্চর্যকর।

১৯৫০-এর দশকে একটি অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা যায় ভারতীয় মহিলারা বহুল পরিমাণে বিদেশি কসমেটিক্সের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েছেন। বিদেশী পণ্যের এই বাড়বাড়ন্তে সদ্য প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন জওহরলাল নেহরু খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। এর ফলে ভারতের বিদেশী মুদ্রা বিনিময় সংরক্ষণ নীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ভারতীয় অর্থনীতি তখনো তার ভূমিষ্ঠ দশায়। তাই বিদেশী মুদ্রা বিনিময় সংরক্ষণ নীতিকে সঠিক মাত্রায় রাখা তখন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঠিক এই সময়েই নেহরুর মনে হয় যে ভারতীয় মহিলারা যদি দেশীয় কোনো ব্রাণ্ডের কসমেটিক্স ব্যবহার করতে শুরু করেন, তাহলে এই সংরক্ষণের মাত্রা ঠিক রাখা সম্ভব। গণতান্ত্রিক দেশে এক ঝটকায় বিদেশি ব্র্যাণ্ডগুলিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সম্ভব ছিল না। তাই এর বিকল্প হিসেবে একমাত্র ভারতীয় একটি কসমেটিক্স কোম্পানি গড়ে তোলাই উপায় ছিল নেহেরুর কাছে।

ভারতীয় মহিলাদের ত্বকের যথাযথ চাহিদা পূরণ করতে এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজের ব্যবহৃত নামী দামী বিদেশি কসমেটিক্সের বিকল্প হিসেবে দেশীয় কসমেটিক্স কোম্পানিকে দাঁড় করাতে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা সামনে আসে। নেহরু জানতেন একমাত্র জে আর ডি টাটাই নিজের উদ্যোক্তা মনোভাবের সাহায্যে এই প্রতিবন্ধকতা কাটাতে সক্ষম হবেন। তাই নেহেরু ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে অনুরোধ করেন যার ফলে বাজার সমীক্ষা করে বিউটি-ইণ্ডাস্ট্রি থেকে বাঘা বাঘা দক্ষ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে তিনি শুরু করেন ভারতের প্রথম ও বৃহৎ কসমেটিক্স কোম্পানি ‘ল্যাকমে’। এই ব্র্যাণ্ডটিকে সকলের কাছে জনপ্রিয় করে তোলাটাই সবথেকে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল তাঁর কাছে। জে.আর.ডি টাটা একটি ফরাসী অপেরার নামে এই ব্র্যাণ্ডের নাম দেন ‘ল্যাকমে’। তাঁর এই নামটি নির্বাচন করার পিছনে প্রথম কারণ ছিল ফরাসী এই নামের পিছনে লুকিয়ে ছিল সংস্কৃত ‘লক্ষ্মী’ নামটি। ‘লক্ষ্মী’-র ফরাসী অনুকৃত উচ্চারণ হল ‘ল্যাকমে’। ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে দেবী লক্ষ্মী সম্পদ ও সৌন্দর্যের প্রতীক। এই নামটি কোম্পানির জন্য একেবারে সুপ্রযুক্ত ছিল। কারণ একদিকে ‘ল্যাকমে’ কোম্পানি বিদেশী মুদ্রা বিনিময় সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিতে সম্পদ আনয়ন করছিল অন্যদিকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যে সৌন্দর্য-সহায়ক প্রসাধনী হিসেবে এর গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছিল। তাঁর মনে হয়েছিল মূলগতভাবে ‘লক্ষ্মী’ নামটি রাখলে তার মধ্যে সাধারণ মধ্যবিত্ত ভারতীয় গন্ধ লেগে থাকে। আবার প্রসাধনী পণ্যের ক্ষেত্রে লক্ষ্মী লিপস্টিক না লক্ষ্মী কাজল কথাগুলি বিদেশী পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ত ভারতীয় মহিলাদের হয়ত সেভাবে আকৃষ্ট করবে না। তাই লক্ষ্মীর ফরাসী প্রতিশব্দ ‘ল্যাকমে’ ব্যবহারের মাধ্যমে একইসঙ্গে একটি বিদেশি অনুষঙ্গ জুড়ে যায় কোম্পানির নামে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৫২ সালে শুরু হয় ‘ল্যাকমে’ কোম্পানি। টাটা অয়েল মিলের ১০০ শতাংশ সম্পূরক হিসেবে কোম্পানি চালু করেন জে.আর.ডি টাটা। ১৯৬০-এর দশকে সিমোন নাভাল টাটা নিজের কাঁধে এই কোম্পানির সমস্ত পণ্য বিপণনের গুরুদায়িত্ব নেন। তিনি নিজে মেক-আপ করার সমস্ত খুঁটিনাটি শিখেছেন। বিপণনের ক্ষেত্রে প্রথমেই মাসকারা, ফেস পাউডার, লিপস্টিক, ফাউণ্ডেশন ক্রিম, কম্প্যাক্টস, নেল এনামেলস ইত্যাদি পণ্য তৈরি করতে শুরু করে ল্যাকমে। সাধ্যের মধ্যে দাম যেমন ছিল, তেমনই আগ্রাসী বিপণন কৌশলের কারণে খুব কম সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ল্যাকমে। প্রথমে এই কোম্পানির মডেল হিসেবে কাজ করেন ’৮০-র দশকে জনপ্রিয় নায়িকা শ্যামলী ভার্মা। তারপরে রেখা, ঐশ্বর্য রাই এবং বর্তমানে করিনা কাপুর এই ব্র্যাণ্ডের মডেল হিসেবে কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৬ সালে রতন টাটা ল্যাকমের সকল স্টেক হিন্দুস্তান ইউনিলিভার সংস্থাকে বিক্রি করে দেয়। কারণ রতন টাটার মনে হয়েছিল হিন্দুস্তান ইউনিলিভার ‘ল্যাকমে’-কে আরো উচ্চমানে পৌঁছে দিতে পারবে। সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ভারতের সবথেকে বিশ্বাসযোগ্য পঞ্চাশটি কোম্পানির মধ্যে ল্যাকমে অন্যতম। শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের প্রায় সত্তরটি দেশে এই ল্যাকমে কোম্পানি ছড়িয়ে পড়েছে আজ।

ভারতীয় পৌরাণিক দেবী লক্ষ্মীর নামের সঙ্গে অনুষঙ্গ বজায় রেখে দেশীয় কসমেটিক্স কোম্পানি ‘ল্যাকমে’র পথ চলা শুরু হয়েছিল। দেবী লক্ষ্মী যেমন সম্পদ, সৌভাগ্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক, ঠিক সেভাবেই এই ভারতীয় কোম্পানিটিও নিজস্ব ব্র্যাণ্ড ভ্যালুতে আজ প্রভূত সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠেছে। এই ছিল ল্যাকমের সঙ্গে লক্ষ্মীর সুপ্ত সম্পর্কের গুপ্ত কাহিনী।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য